চোখের সামনে যা দেখা যায়, সত্য কি সব সময় তা-ই? কখনো কখনো সবচেয়ে বড় জাদু লুকিয়ে থাকে চোখের আড়ালে। আর সেই রহস্য খুঁজতে গিয়েই মানুষ হারিয়ে ফেলে নিজের সবকিছু। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য প্রেস্টিজ’ ঠিক এমনই এক গল্প। মুক্তির ২০ বছর পূর্তিতে সিনেমাটি আবার ফিরছে বড় পর্দায়। এবার প্রথমবারের মতো ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্সে দেখার সুযোগ পাবেন দর্শকেরা।
একটি মঞ্চ। চারপাশে অন্ধকার। দর্শকের চোখ মঞ্চের দিকে স্থির। জাদুকর এমন কিছু করে দেখালেন, যা দেখে বিস্মিত সবাই। কীভাবে ঘটল ঘটনাটি? কোথায় লুকিয়ে ছিল রহস্য? উত্তর জানার আগেই জাদুকর হাসলেন। দর্শকের মনে জন্ম নিল নতুন প্রশ্ন।
জাদুর আসল সৌন্দর্য কি রহস্যে, নাকি সেই রহস্য ভেদ করার চেষ্টায়? ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য প্রেস্টিজ’ দর্শককে ঠিক এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তবে এটি শুধু মঞ্চজাদুর গল্প নয়। এর ভেতরে আছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিশোধ, ঈর্ষা ও আত্মত্যাগ। দুই জাদুকরের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সিনেমাটি দেখিয়েছে, কাউকে হারানোর ইচ্ছা কখনো কখনো মানুষকে নিজের কাছেই পরাজিত করে। দুই দশক পর সেই গল্পই আবার ফিরছে সিনেমা হলে।
দুই জাদুকর, দুই পথ
উনিশ শতকের লন্ডনে মঞ্চজাদু ছিল দর্শকদের বিস্মিত করার জনপ্রিয় এক মাধ্যম। এই জগতের দুই জাদুকর রবার্ট অ্যাঞ্জিয়ার ও আলফ্রেড বোর্ডেন। তাঁদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন হিউ জ্যাকম্যান ও ক্রিশ্চিয়ান বেল।
শুরুতে তাঁদের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক থাকলেও একটি দুর্ঘটনার পর জন্ম নেয় সন্দেহ ও শত্রুতা। একসময় জাদু আর দর্শককে আনন্দ দেওয়ার শিল্প থাকে না, হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষকে হারানোর অস্ত্র।

অ্যাঞ্জিয়ার চান দর্শকের বিস্ময় ও প্রশংসা অর্জন করতে। অন্যদিকে বোর্ডেন মনোযোগ দেন জাদুর কৌশল নিখুঁত করার দিকে। দুজনের লক্ষ্য আলাদা হলেও একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের একই প্রতিযোগিতায় আটকে ফেলে।
প্রতিপক্ষের রহস্য জানতে এবং নিজেদের কৌশল গোপন রাখতে গিয়ে তাঁরা এমন সব সিদ্ধান্ত নেন, যার মূল্য দিতে হয় ব্যক্তিগত জীবন দিয়ে।
জাদুর আড়ালে লুকানো রহস্য
‘দ্য প্রেস্টিজ’ এর আকর্ষণ শুধু জাদুর কৌশলে নয়, বরং গল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রহস্যে। একটি জাদুর কৌশল কীভাবে সম্ভব হলো? প্রতিপক্ষের সাফল্যের পেছনে কী রয়েছে? আর সেই রহস্য জানতে একজন মানুষ কত দূর যেতে পারেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দুই জাদুকর জড়িয়ে পড়েন বিপজ্জনক এক খেলায়। তাঁরা একে অপরের কৌশল বুঝতে চান, গোপন পরিকল্পনা জানতে চান। কিন্তু প্রতিটি উত্তর যেন নতুন কোনো প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সিনেমায় জাদুর কৌশলকে তিনটি ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রথমে পরিচিত কিছু দেখানো হয়, এরপর সেটিকে অস্বাভাবিক করে তোলা হয়। সবশেষে আসে এমন এক বিস্ময়, যা দর্শককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

এই ধারণার সঙ্গে মিল রেখেই নোলান সাজিয়েছেন সিনেমার গল্প। অতীত, বর্তমান ও ব্যক্তিগত নথির মধ্য দিয়ে কাহিনি এগিয়ে যায়। ফলে দর্শককে শুধু ঘটনা দেখতে হয় না, প্রতিটি ঘটনার মধ্যে যোগসূত্রও খুঁজতে হয়।
কোনটি সত্য, কোনটি অসম্পূর্ণ আর কোনটি বিভ্রান্ত করার কৌশল এই প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত দর্শককে ভাবিয়ে রাখে। সিনেমাটি তাই শুধু পর্দায় জাদু দেখায় না, দর্শকের মনেও তৈরি করে রহস্যের এক জগৎ।
অভিনয়ে দ্বন্দ্বের গভীরতা
হিউ জ্যাকম্যান ও ক্রিশ্চিয়ান বেলের অভিনয় দুই জাদুকরের দ্বন্দ্বকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। তাঁদের চরিত্রে যেমন রয়েছে সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা, তেমনি আছে ঈর্ষা ও প্রতিশোধের তাড়না। সময়ের সঙ্গে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও স্বাভাবিক জীবনকে গ্রাস করে।
মাইকেল কেইন অভিনয় করেছেন কাটার চরিত্রে। জাদুর সরঞ্জাম ও কৌশল সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ছাড়া সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন স্কারলেট জোহানসন, রেবেকা হল, অ্যান্ডি সার্কিস ও ডেভিড বোয়ি।
প্রতিটি চরিত্রই মূল দ্বন্দ্বের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। ফলে দুই জাদুকরের লড়াই শুধু মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে তাঁদের কাছের মানুষদের জীবনেও।
নোলানের নির্মাণশৈলীর বিশেষত্ব
ক্রিস্টোফার নোলান এমন একজন নির্মাতা, যিনি গল্প বলার সময় দর্শকের কৌতূহলকে গুরুত্ব দেন। তাঁর সিনেমায় সময়, স্মৃতি, পরিচয় ও বাস্তবতার ধারণা বারবার ফিরে আসে। ‘মেমেন্টো’তে স্মৃতির জটিলতা, ‘ইনসেপশন’ এ স্বপ্নের স্তর, ‘ইন্টারস্টেলার’ এ সময় ও মহাকাশ কিংবা ‘ওপেনহাইমার’ এ একজন বিজ্ঞানীর জীবন; প্রতিটি সিনেমাতেই তিনি পরিচিত বিষয়কে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করেছেন।
‘দ্য প্রেস্টিজ’এ তাঁর খেলার জায়গা মানুষের চোখ ও মন। দর্শক যা দেখছেন, তার সবটুকুই কি সত্য? নাকি তাঁকে এমন কিছু দেখানো হচ্ছে, যা তাঁকে ভুল পথে পরিচালিত করবে? ভাই জোনাথন নোলানের সঙ্গে যৌথভাবে সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন ক্রিস্টোফার নোলান। প্রযোজনায় ছিলেন এমা থমাস ও অ্যারন রাইডার।
প্রায় চার কোটি ডলার বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী আয় করেছিল প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। পাশাপাশি এটি দুটি বিভাগে অস্কার মনোনয়ন অর্জন করে। গল্পের বিন্যাস ও রহস্যময় আবহ সিনেমাটিকে নোলানের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
২০ বছর পর আইম্যাক্সে ফিরছে ‘দ্য প্রেস্টিজ’
মুক্তির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০২৭ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রেক্ষাগৃহে ফিরছে ‘দ্য প্রেস্টিজ’। ডিজনির ঘোষণা অনুযায়ী, এবার প্রথমবারের মতো ৭০ মিলিমিটার আইম্যাক্স পর্দায় দেখা যাবে ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমাটি। বিশেষ এই ফরম্যাটে সিনেমাটি দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নোলানও।
দুই জাদুকরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রহস্য আর আত্মত্যাগের গল্পটি দুই দশক পরও দর্শকদের নতুন করে ভাবায়। কারণ, সিনেমার শেষ দৃশ্যের পরও প্রশ্ন থেকে যায়; জয়ের নেশায় মানুষ কতটা ত্যাগ করতে পারে? আর চোখের সামনে যা দেখা যায়, সেটাই কি পুরো সত্য? বিস্ময় শেষ হলেও এমন প্রশ্নই ‘দ্য প্রেস্টিজ’ এর জাদুকে বাঁচিয়ে রাখে।









