কল্পনা করুন, বরফে ঢাকা পাহাড়। চারদিকে সাদা তুষার, আর তার মাঝখানে এক তরুণের বাঁধনহারা ছুটে চলা। এলোমেলো চুল, মুখভরা হাসি, নাচের তালে শরীরী ভঙ্গি আর হঠাৎই তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসে ‘ইয়াহু!’। পর্দার সেই উচ্ছ্বাস যেন ছড়িয়ে পড়ে দর্শকের মধ্যেও। তরুণটির নাম শাম্মী কাপুর। হিন্দি সিনেমার পর্দায় যিনি শুধু নায়ক হয়ে আসেননি, বদলে দিয়েছিলেন নায়কের চেনা ছবিটাই।
আজ ২১ অক্টোবর, শাম্মী কাপুরের জন্মদিন। ১৯৩১ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া অভিনেতা ২০১১ সালে পৃথিবী ছেড়ে গেলেও তাঁর অভিনয়, নাচ আর প্রাণবন্ত উপস্থিতি এখনো ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে আলাদা জায়গা ধরে রেখেছে। একসময় যাঁকে বলা হতো ‘ভারতের এলভিস প্রিসলি’, সেই শাম্মীর জীবন ছিল সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতা, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ ও নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প।
শাম্মী কাপুরের আসল নাম শমশের রাজ কাপুর। তাঁর জন্ম তৎকালীন বোম্বেতে, বর্তমান মুম্বাইয়ে। বাবা পৃথ্বীরাজ কাপুর ছিলেন ভারতীয় থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের পরিচিত ব্যক্তিত্ব। বড় ভাই রাজ কাপুর এবং ছোট ভাই শশী কাপুরও পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ তারকা হয়ে ওঠেন।
এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠায় অভিনয় তাঁর কাছে অপরিচিত কোনো জগৎ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের পরিবেশ দেখেছেন তিনি। পড়াশোনার পর বাবার প্রতিষ্ঠিত পৃথ্বী থিয়েটার্সে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে সেখানে জুনিয়র শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন। মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৫০ রুপি।
থিয়েটারের সেই দিনগুলো তাঁকে অভিনয়ের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু বিখ্যাত পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না। বড় ভাই রাজ কাপুর তত দিনে প্রতিষ্ঠিত তারকা। শাম্মীকে খুঁজে নিতে হচ্ছিল নিজের পথ।
ব্যর্থতা থেকে নতুন পরিচয়
১৯৫৩ সালে ‘জীবন জ্যোতি’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় শাম্মী কাপুরের। এরপর ‘রেল কা ডিব্বা’, ‘লায়লা মজনু’, ‘ঠোকর’সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। কিন্তু শুরুতে সাফল্য তাঁর কাছে ধরা দেয়নি। একের পর এক ছবি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে ভাবতে হয়েছিল, কীভাবে অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠা যায়।

সেই সময় হিন্দি সিনেমায় রোমান্টিক নায়কের পরিচিত ধরন ছিল। দিলীপ কুমারের গম্ভীর অভিনয়, দেব আনন্দের আধুনিক ব্যক্তিত্ব আর রাজ কাপুরের আবেগঘন উপস্থিতির মধ্যে শাম্মীর প্রয়োজন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা একটি পরিচয়।
১৯৫৭ সালে ‘তুমসা নেহি দেখা’ ছবিতে সেই পরিবর্তনের শুরু। নিজের চেহারায় পরিবর্তন আনেন তিনি। গোঁফ কামিয়ে ফেলেন, চুলের ধরন বদলান। অভিনয়ে যোগ করেন দুষ্টুমি, আত্মবিশ্বাস, দ্রুত শরীরী ভঙ্গি এবং প্রাণখোলা হাসি। প্রচলিত রোমান্টিক নায়কের বদলে দর্শক পেল এক স্বাধীনচেতা, চঞ্চল তরুণকে।

ছবিটি তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৫৯ সালের ‘দিল দেকে দেখো’ ছবিও তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ায়। শাম্মী বুঝতে পারেন, অন্য কারও মতো হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের স্বভাব ও অভিনয়শৈলীই হতে পারে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
‘জংলি’ আর সেই বিখ্যাত ‘ইয়াহু!’
১৯৬১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জংলি’ শাম্মী কাপুরের ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় যোগ করে। সায়রা বানুর বিপরীতে অভিনীত ছবিটিতে তাঁর চরিত্র ছিল প্রাণবন্ত ও স্বাধীনচেতা। বরফে ঢাকা পাহাড়ে তাঁর নাচ আর সেই বিখ্যাত ‘ইয়াহু!’ চিৎকার দর্শকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

শাম্মীর অভিনয়ে পশ্চিমা রক অ্যান্ড রোল সংগীত ও নাচের প্রভাব থাকলেও তিনি কেবল অনুকরণ করেননি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের গান, প্রেম ও আবেগের সঙ্গে নিজের স্বতন্ত্র ভঙ্গি মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন আলাদা একটি পরিচয়।
এরপর ‘প্রফেসর’ (১৯৬২), ‘চায়না টাউন’ (১৯৬২), ‘কাশ্মীর কি কলি’ (১৯৬৪), ‘রাজকুমার’ (১৯৬৪) ও ‘জানওয়ার’ (১৯৬৫) এর মতো ছবিতে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে।
১৯৬৬ সালের ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছিল তাঁর অভিনয়জীবনের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়। আশা পারেখের বিপরীতে অভিনীত ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেন রাহুল দেব বর্মন। ‘আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা’ ও ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’ গানে শাম্মীর নাচ, অভিব্যক্তি ও ছন্দময় উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করে। তাঁর কাছে নাচ শুধু গানের সঙ্গে তাল মেলানো ছিল না; চরিত্রের প্রেম, দুষ্টুমি ও আবেগ প্রকাশেরও মাধ্যম ছিল।

অন্য এক অভিনেতা
শাম্মী কাপুরকে শুধু নাচ ও রোমান্টিক অভিনয়ের তারকা হিসেবে দেখলে তাঁর ক্যারিয়ারের বড় একটি অংশ অজানা থেকে যায়। ১৯৬৮ সালের ‘ব্রহ্মচারী’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন এমন এক ব্যক্তির চরিত্রে, যিনি নিজে অনাথ হয়েও অসহায় শিশুদের আশ্রয় দেন।
হাস্যরস ও আবেগের মিশেলে অভিনয় করে এই ছবির জন্য ১৯৬৯ সালে ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান তিনি। এতে প্রমাণিত হয়, তাঁর প্রতিভা শুধু পর্দার উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ ছিল না।

ব্যক্তিগত জীবনেও তখন চলছিল নানা পরিবর্তন। ১৯৫৫ সালে অভিনেত্রী গীতা বালিকে বিয়ে করেন শাম্মী। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই সন্তান, আদিত্য রাজ কাপুর ও কাঞ্চন। কিন্তু ১৯৬৫ সালে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা যান গীতা বালি। স্ত্রীর মৃত্যু শাম্মীর জীবনে গভীর শোক নিয়ে আসে।
পরে ১৯৬৯ সালে নীলা দেবীকে বিয়ে করেন তিনি। নীলা দেবী তাঁর দুই সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো বড় করে তোলেন। ব্যক্তিগত জীবনের এই কঠিন সময় পেরিয়েও শাম্মী ধীরে ধীরে অভিনয়ে ফিরে আসেন।
নায়ক থেকে চরিত্রাভিনেতা
সত্তরের দশকে হিন্দি সিনেমার ধরন বদলাতে শুরু করে। নতুন প্রজন্মের নায়কেরা জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন। শাম্মী কাপুরও সময়ের সঙ্গে নিজের অভিনয়ের ধরন বদলান। ‘আন্দাজ’ (১৯৭১) এর মতো ছবিতে তাঁকে তুলনামূলক সংযত চরিত্রে দেখা যায়।

অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনায়ও আগ্রহী হন তিনি। ১৯৭৪ সালে পরিচালনা করেন ‘মনোরঞ্জন’, এরপর ১৯৭৬ সালে ‘বুন্ডলবাজ’। যদিও ছবি দুটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি, তবু তাঁর সৃজনশীল আগ্রহের পরিচয় পাওয়া যায় এসব কাজে।
পরবর্তী সময়ে ‘প্রেম রোগ’, ‘বিদাতা’, ‘বেতাব’ ও ‘হিরো’র মতো ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৮২ সালের ‘বিদাতা’ ছবির জন্য ১৯৮৩ সালে ফিল্মফেয়ার সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান। একসময় যিনি ছিলেন পর্দার রোমান্টিক নায়ক, তিনিই পরে চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন।
চলচ্চিত্রের বাইরেও প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। ইন্টারনেট ইউজার্স কমিউনিটি অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং অনলাইনে ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। নতুন সময়ের প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার এই আগ্রহ তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক তুলে ধরে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননাসহ একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন শাম্মী কাপুর। তাঁর অবদান শুধু জনপ্রিয় সিনেমার সংখ্যায় নয়, হিন্দি চলচ্চিত্রে নায়ককে উপস্থাপনের ধরন বদলে দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে।
অমলিন স্মৃতি
জীবনের শেষ দিকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন শাম্মী। নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিতে হতো তাঁকে। ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট, ৭৯ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর শেষদিকের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিগুলোর একটি ছিল ইমতিয়াজ আলী পরিচালিত ‘রকস্টার’ ছবিতে। রণবীর কাপুরের সঙ্গে তাঁর এই সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি কাপুর পরিবারের দুই প্রজন্মের শিল্পীকে একই পর্দায় নিয়ে আসে। ছবিটি মুক্তি পায় তাঁর মৃত্যুর পর।
শাম্মী কাপুরের জীবন তাই শুধু একজন তারকার সাফল্যের গল্প নয়। এটি ব্যর্থতা থেকে উঠে দাঁড়ানো, নিজের পরিচয় তৈরি করা, ব্যক্তিগত শোক সামলে কাজে ফেরা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার গল্প।
আজ তাঁর জন্মদিনে সেই ‘ইয়াহু!’ ডাক আবারও মনে করিয়ে দেয়, কিছু শিল্পী সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যান না। তাঁদের অভিনয়ের ভঙ্গি, হাসি আর পর্দার মুহূর্তগুলো থেকে যায় দর্শকের স্মৃতিতে। শাম্মী কাপুরও তেমনই এক নাম যাঁর উচ্ছ্বাস থেমে গেছে, কিন্তু যাঁর তৈরি করা আনন্দের প্রতিধ্বনি আজও ভারতীয় সিনেমায় বেঁচে আছে।









