পাঁচ দশকেরও বেশি অভিনয়জীবনে শতাধিক সিনেমা, ৬০০ কোটি রুপির বেশি আয় করা একাধিক ছবি, আবার বড় বাজেটের কিছু সিনেমায় ব্যবসায়িক ব্যর্থতা, সবমিলিয়ে রজনীকান্ত এর ক্যারিয়ার জুড়ে রয়েছে সাফল্য ও ব্যর্থতার নানা হিসাব।
একসময় বাসে যাত্রীদের টিকিট দিতেন, আর স্বপ্ন বুনতেন মঞ্চে অভিনয়ের। সেই স্বপ্নই তাঁকে নিয়ে গেছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের শীর্ষে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় করে আজও রজনীকান্ত অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন। বয়স বাড়লেও পর্দায় তাঁর উপস্থিতি, অ্যাকশন দৃশ্যে অভিনয়ের ধরন এবং নিজস্ব স্টাইল দর্শকের আগ্রহ ধরে রেখেছে। তবে আগের মতো সব শারীরিক কসরত নিজে করেন কি না, তা সিনেমাভেদে আলাদা; অ্যাকশন দৃশ্যে শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি কোরিওগ্রাফি ও প্রযুক্তিরও ভূমিকা থাকে।
ভারতের তামিল চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় অভিনেতার জীবন তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে দীর্ঘদিন দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখারও ইতিহাস।
১৯৫০ সালের ১২ ডিসেম্বর বেঙ্গালুরুতে জন্ম নেওয়া রজনীকান্তের আসল নাম শিবাজি রাও গায়কোয়াড়। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বাবা ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল। ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যে বড় হন তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে অফিসের কর্মী, কাঠমিস্ত্রি ও মালামাল বহনের মতো বিভিন্ন কাজ করেছেন। পরে বেঙ্গালুরু ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসে বাস কন্ডাক্টরের চাকরি পান।
কিন্তু অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তাঁকে অন্য পথে নিয়ে যায়। ১৯৭৩ সালে মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে অভিনয় শেখা শুরু করেন। সেখানে তাঁর অভিনয় দেখে তামিল পরিচালক কে. বালাচন্দর তাঁকে সিনেমায় সুযোগ দেন। ১৯৭৫ সালে ‘অপূর্ব রাগাঙ্গাল’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। বালাচন্দরই তাঁকে ‘রজনীকান্ত’ নাম দেন।

খলনায়ক থেকে প্রধান চরিত্র
অভিষেকের পরপরই নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাননি রজনীকান্ত। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে তাঁকে খলনায়ক ও নেতিবাচক চরিত্রে বেশি দেখা যেত। তবে পর্দায় তাঁর উপস্থিতি, সংলাপ বলার ধরন, সিগারেট ছোড়া কিংবা সানগ্লাস পরার অভিনব কৌশল ধীরে ধীরে দর্শকের নজর কাড়ে।
১৯৭৮ সালের ‘মুল্লুম মালারুম’ তাঁকে প্রধান চরিত্রে আলাদা পরিচিতি দেয়। ১৯৮০ সালের ‘বিল্লা’ তাঁর বাণিজ্যিক সাফল্যের পথ আরও প্রশস্ত করে। পরে ‘বাশা’, ‘পদায়াপ্পা’, ‘মুথু, শিবাজি: দ্য বস’, ‘এনথিরান ‘ ও ‘২.০’ তাঁকে তামিল সিনেমার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়।
১৯৯৫ সালের ‘মুথু’ জাপানে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। ছবিটি সেখানে দীর্ঘ সময় প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল এবং রজনীকান্তের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ‘শিবাজি: দ্য বস’ তামিল সিনেমার ১০০ কোটি রুপি আয়ের মাইলফলক অতিক্রম করা প্রথম ছবি হিসেবে পরিচিতি পায় বলে বিভিন্ন চলচ্চিত্রবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাফল্যের পরিসংখ্যান কোথায় দাঁড়িয়ে?
রজনীকান্তের জনপ্রিয়তার বড় প্রমাণ তাঁর সাম্প্রতিক সিনেমাগুলোর আয়। বিভিন্ন বক্স অফিস ট্র্যাকার ও বাণিজ্যিক প্রতিবেদনের হিসাবে, তাঁর কয়েকটি ছবি বিশ্বব্যাপী ৬০০ কোটি রুপির বেশি আয় করেছে। তবে ছবির মোট আয় নিয়ে উৎসভেদে পার্থক্য রয়েছে। তাই নিচের অঙ্কগুলো আনুমানিক হিসাব হিসেবে দেখা উচিত।
BOX OFFICE COLLECTION
রজনীকান্তের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা
বিশ্বব্যাপী আনুমানিক বক্স অফিস আয়ের তালিকা
| ক্রম | সিনেমা | বছর | বিশ্বব্যাপী আয় |
|---|---|---|---|
| 01 | ২.০ | ২০১৮ | ৬৯১–৭২৩ কোটি রুপি |
| 02 | জেলার | ২০২৩ | ৬০৫–৬৩০ কোটি রুপি |
| 03 | কুলি | ২০২৫ | প্রায় ৫১৮ কোটি রুপি |
| 04 | কাবালি | ২০১৬ | প্রায় ২৯৫–৪৯৯ কোটি রুপি |
| 05 | এনথিরান | ২০১০ | প্রায় ২৯০ কোটি রুপি |
দ্রষ্টব্য: বক্স অফিসের পরিসংখ্যান বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন হতে পারে।
‘কাবালি’ র ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎসে আয়ের হিসাবে বড় পার্থক্য থাকায় এর অবস্থান নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একইভাবে, ‘২.০’, ‘জেলার ‘ও ‘কুলি’ এর চূড়ান্ত আয়ও উৎসভেদে কিছুটা আলাদা।
এই তালিকায় ২’.০’ ও ‘জেলার’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি রজনীকান্তের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিনির্ভর বড় বাজেটের সিনেমা, আর দ্বিতীয়টি অ্যাকশন ও কমেডির মিশেলে তৈরি ছবি। দুটি সিনেমাই তাঁকে বড় পরিসরের বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দেয়।
তবে শুধু মোট আয় দিয়ে কোনো সিনেমাকে লাভজনক বলা যায় না। নির্মাণব্যয়, প্রচার, পরিবেশনা স্বত্বের দাম এবং প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে আয়ের ভাগাভাগিও হিসাবের অংশ।
‘জেলার’ বনাম ‘জেলার ২’: চার দিনের হিসাবেই বড় ব্যবধান
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জেলার’ রজনীকান্তের ক্যারিয়ারে অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য। নেলসন দিলীপকুমার পরিচালিত ছবিটিতে তিনি অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষী মুথুভেল পান্ডিয়ানের চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৬০৫–৬৩০ কোটি রুপি আয় করে।


এর সিক্যুয়েল ‘জেলার ২’ মুক্তি পেয়েছে ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর। একই পরিচালক ও প্রধান অভিনেতাকে নিয়ে তৈরি ছবিটি মুক্তির প্রথম চার দিনেই বড় অঙ্কের আয় করেছে।
চলচ্চিত্রের আয় পর্যবেক্ষণকারী স্যাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ছবিটির হিসাব ছিল:
BOX OFFICE COMPARISON
জেলার বনাম জেলার ২
দুই সিনেমার বক্স অফিস আয়ের তুলনামূলক চিত্র
| পরিসংখ্যান | জেলার (২০২৩) | জেলার ২ (২০২৬) |
|---|---|---|
| মুক্তির পর হিসাবের সময় | পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ যাত্রা | প্রথম ৪ দিন |
| বিশ্বব্যাপী মোট আয় | ৬০৫–৬৩০ কোটি রুপি | ৪২৪.২৫ কোটি রুপি |
| ভারতের নিট আয় | এখানে তুলনাযোগ্য চূড়ান্ত অঙ্ক উল্লেখ করা হয়নি | ১৯৯.৯০ কোটি রুপি |
| ভারতের মোট আয় | এখানে তুলনাযোগ্য চূড়ান্ত অঙ্ক উল্লেখ করা হয়নি | ২৩৪.২৫ কোটি রুপি |
| বিদেশের মোট আয় | এখানে তুলনাযোগ্য চূড়ান্ত অঙ্ক উল্লেখ করা হয়নি | ১৯০ কোটি রুপি |
দ্রষ্টব্য: দুই সিনেমার আয়ের হিসাবের সময়কাল আলাদা। জেলার ২-এর পরিসংখ্যান প্রথম চার দিনের, তাই সরাসরি চূড়ান্ত আয়ের তুলনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এই হিসাবে ‘জেলার ২’ মাত্র চার দিনে প্রথম ছবিটির আনুমানিক চূড়ান্ত আয়ের প্রায় ৬৭–৭০ শতাংশের সমান আয় করেছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ বক্স অফিস তুলনা নয়। একটির হিসাব সম্পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ যাত্রার, অন্যটি চলমান প্রদর্শনীর প্রথম চার দিনের।
মুক্তির প্রথম দিনেই ‘জেলার ২’ বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১২৫.২৫ কোটি রুপি আয় করে। এর মধ্যে ভারতের নিট আয় ছিল ৫৯.৭০ কোটি রুপি। চতুর্থ দিনে ভারতে ছবিটির নিট আয় দাঁড়ায় ৫৫.৮৫ কোটি রুপি। অর্থাৎ প্রথম দিনের পরও ছবিটির দর্শক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য ছিল।
চতুর্থ দিন শেষে বিশ্বব্যাপী ৪২৪.২৫ কোটি রুপির আয় নিয়ে জেলার ২ তখন ৫০০ কোটি রুপির মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছিল। তবে এই গতি বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে পরবর্তী দিনের দর্শক উপস্থিতি, নতুন মুক্তি পাওয়া সিনেমার প্রতিযোগিতা এবং প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনীর ওপর।
সব সিনেমা কি হিট? ব্যর্থতার হিসাবও আছে
রজনীকান্তের ক্যারিয়ারে বড় সাফল্যের পাশাপাশি কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক ব্যর্থতাও রয়েছে। তাঁর মতো জনপ্রিয় অভিনেতার সিনেমায় প্রত্যাশা বেশি থাকে। ফলে কয়েক শ’কোটি রুপি আয় করলেও নির্মাণব্যয় ও পরিবেশনা স্বত্বের দাম তুলতে না পারলে কোনো ছবি সংশ্লিষ্ট পরিবেশকদের জন্য লোকসানের কারণ হতে পারে।
২০০২ সালের ‘বাবা’ এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। রজনীকান্ত নিজেই ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক বিষয়বস্তু নিয়ে তৈরি ছবিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী দর্শক টানতে পারেনি। পরে তেলুগু পরিবেশক এনভি প্রসাদের বর্ণনা অনুযায়ী, রজনীকান্ত তাঁর পরিবেশনা-সংক্রান্ত ১.৬ কোটি রুপির লোকসান ফেরত দেন এবং অতিরিক্ত এক লাখ রুপি দেন। ২০২২ সালে ছবিটির পুনর্মুক্তি অবশ্য নতুন করে দর্শকের আগ্রহ পায়।
২০১৪ সালের ‘লিঙ্গাও’ ব্যবসায়িক চাপের মুখে পড়ে। প্রায় ১০০ কোটি রুপি বাজেটে নির্মিত ছবিটির পরিবেশনা স্বত্বের দাম বেশি হওয়ায় পরিবেশকদের বিনিয়োগ তুলে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পরিবেশকদের মোট লোকসান প্রায় ৫৪ কোটি রুপি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে রজনীকান্ত পরিবেশকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

২০২০ সালের ‘দরবার’ নিয়েও একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়। ছবিটি বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্য আয় করলেও উচ্চ বাজেট ও পরিবেশনা স্বত্বের দাম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কয়েকটি অঞ্চলের পরিবেশক লোকসানের অভিযোগ করেন। অর্থাৎ বড় অঙ্কের মোট আয় সব সময় প্রত্যেক অংশীদারের লাভ নিশ্চিত করে না।
এ ছাড়া ‘কুসেলান (২০০৮)’, ‘কোচাডাইয়ান (২০১৪)’, ‘আন্নাত্থে (২০২১)’ ও ‘লাল সালাম (২০২৪)’ প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল বাণিজ্যিক ফলের কারণে আলোচনায় এসেছে। তবে সব ছবির ক্ষেত্রেই একই ধরনের ব্যর্থতা ঘটেনি; কোথাও দর্শকের প্রতিক্রিয়া, কোথাও নির্মাণের ধরন, আবার কোথাও ব্যয় ও আয়ের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৫০ বছরের ক্যারিয়ারে অর্জন
রজনীকান্তের সাফল্য শুধু বক্স অফিসের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০০ সালে তিনি পদ্মভূষণ এবং ২০১৬ সালে পদ্মবিভূষণ পান। ২০১৯ সালের জন্য ঘোষিত দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি তুলনামূলকভাবে সাধারণ জীবনযাপনের জন্য পরিচিত। স্ত্রী লতা রঙ্গাচারি এবং দুই মেয়ে ঐশ্বরিয়া ও সৌন্দর্যাকে নিয়ে তাঁর পরিবার। অভিনয়ের বাইরে আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ এবং হিমালয়ে যাওয়ার অভ্যাসও তাঁর পরিচিত জীবনের অংশ।
রজনীকান্তের সাম্প্রতিক বক্স অফিস যাত্রার দিকে তাকালে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, তাঁর পুরোনো জনপ্রিয়তা এখনো বড় বাজেটের সিনেমার উদ্বোধনী আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। দ্বিতীয়ত, জেলার ২ এর মতো সিক্যুয়েল অল্প সময়ে বড় অঙ্কের আয় করলেও শেষ পর্যন্ত সেটি প্রথম ছবির রেকর্ড ছাড়াবে কি না, তা জানতে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ যাত্রার হিসাব প্রয়োজন।
বাস কন্ডাক্টরের চাকরি থেকে চলচ্চিত্রের প্রধান তারকা হয়ে ওঠা রজনীকান্তের জীবন এক দীর্ঘ পরিবর্তনের গল্প। তাঁর ক্যারিয়ারে ৬০০ কোটি রুপির বেশি আয় করা ছবি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পরিবেশকদের লোকসান ও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ সিনেমাও। এই দুই দিক মিলিয়েই বোঝা যায়, একজন সুপারস্টারের জনপ্রিয়তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি সিনেমার ব্যবসায়িক ফল নির্ভর করে আলাদা হিসাবের ওপর।









