দুর্গাপূজা মানেই নতুন পোশাক, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরাঘুরি, পরিবারের সঙ্গে আড্ডা আর প্রিয় খাবারের স্বাদ। শৈশবে উৎসবের দিনগুলো ছিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে উদ্যাপনের ধরন, বেড়েছে ব্যস্ততা। তারকাদের জীবনেও ব্যতিক্রম নয়। অভিনেত্রী পূজা চেরি, অপু বিশ্বাস ও বিদ্যা সিনহা মিমের কাছে দুর্গোৎসব মানে শৈশবের আনন্দ, পরিবারের সান্নিধ্য আর হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তের গল্প।

মাকে ছাড়া পূজার আনন্দ অপূর্ণ: পূজা চেরি
দুর্গাপূজা এসেছে, চারদিকে উৎসবের আমেজ। কিন্তু এই আনন্দের সময়েও মা নেই অভিনেত্রী পূজা চেরির পাশে। তাই উৎসবের দিনগুলোয় মায়ের অভাব আরও গভীরভাবে অনুভব করছেন তিনি।
পূজা চেরি বলেন, ‘পূজা এলো, অথচ মা নেই। তাঁকে ভীষণ মিস করি, বিশেষ করে এই আনন্দময় মুহূর্তে বেশি মনে পড়ছে। মা থাকলে পূজার আনন্দটা সত্যি অন্য রকম হতো।’
খুলনায় গ্রামের বাড়ি হলেও পূজার বেড়ে ওঠা রাজধানীর হাজারীবাগে। শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার অলিগলি ও মন্দির ঘিরে। ছোটবেলায় নানা রঙের পোশাক পরে পূজা দেখতে বের হতেন তিনি। উৎসব উপলক্ষে উপহার পাওয়ার আনন্দও ছিল আলাদা।
তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াতেন পূজা। দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে ফিরতেন বাড়িতে। পূজা উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনেরাও আসতেন। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া, গল্প আর আনন্দে কাটত সময়।

মহালয়া থেকে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি দিনেই থাকত উৎসবের ছোঁয়া। নতুন পোশাক, উপহার, মন্দিরে ঘোরাঘুরি আর প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে শৈশবের পূজা হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের বিশেষ এক অধ্যায়। সেই দিনগুলোর স্মৃতি এখনো অমলিন, তবে বর্তমানের উৎসবের আনন্দে মায়ের অনুপস্থিতি তাঁকে বারবার আবেগপ্রবণ করে তোলে।
মাত্র আট বছর বয়সে জাজ মাল্টিমিডিয়ার ‘ভালোবাসার রং’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিনোদনজগতে যাত্রা শুরু পূজা চেরির। শিশুশিল্পী হিসেবে বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্রে কাজ করার পর ‘পোড়ামন-২’ সিনেমায় নায়িকা হিসেবে নজর কাড়েন তিনি। এরপর ‘দহন’, ‘নূরজাহান’সহ বিভিন্ন সিনেমায় অভিনয় করেছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘দম’, যেখানে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো।
বগুড়ার পূজার দিনগুলো আজও মনে পড়ে: অপু বিশ্বাস
ঢালিউড অভিনেত্রী অপু বিশ্বাসের কাছে দুর্গাপূজা মানেই শৈশবের উচ্ছ্বাস আর পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন সময়। সময়ের সঙ্গে উৎসব উদ্যাপনের ধরন বদলেছে, কিন্তু পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো এখনো তাঁর মনে উজ্জ্বল।

অপু বিশ্বাস বলেন, ‘পূজা মানেই আনন্দ। সময়ের সঙ্গে সেই আনন্দ-উদ্যাপনের ধরন কিছুটা বদলেছে, কিন্তু নিঃশেষ হয়নি। এখন দুর্গাপূজায় ষষ্ঠী থেকে দশমীর দিনগুলোয় বগুড়ার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। কী যে এক উচ্ছ্বাস, উল্লাসের ছিল সেই দিনগুলো, তা বলে শেষ করা যাবে না।’
বগুড়ায় কেটেছে অপুর শৈশব। পূজার সময় বাবা-মা, কাকা-কাকিসহ পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে তাঁদের বাড়ি হয়ে উঠত উৎসবমুখর। নতুন জামা পরে সকালে প্রতিমা দেখতে যাওয়া, মায়ের হাতে তৈরি ভোগের খাবার খাওয়া আর সবার সঙ্গে হইহুল্লোড়ে মেতে ওঠা ছিল সেই সময়ের নিয়মিত আনন্দ।
বিশেষ করে মহাষ্টমীর ভোগের স্মৃতি এখনো তাঁর কাছে মধুর। খিচুড়ি, লাবড়া ও নানা পদের ভাজা ছিল পছন্দের তালিকায়। খাবারের স্বাদের পাশাপাশি পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়ার আনন্দও ছিল সেই উদ্যাপনের বড় অংশ। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও দুর্গাপূজা এলে বগুড়ার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তাঁর।

১৯৮৯ সালের ১১ অক্টোবর বগুড়ায় জন্ম অপু বিশ্বাসের। নাচের প্রতি আগ্রহ থেকে ধীরে ধীরে অভিনয়ে আসেন তিনি। ২০০৫ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কাল সকালে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। পরের বছর এফ আই মানিকের ‘কোটি টাকার কাবিন’ সিনেমায় অভিনয় করে পরিচিতি পান। শাকিব খানের সঙ্গে জুটি বেঁধে একাধিক ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।
‘চাচ্চু’, ‘দাদীমা’, ‘আমার জান আমার প্রাণ’, ‘মনে প্রাণে আছো তুমি’ ও ‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’সহ বেশ কিছু সিনেমায় দেখা গেছে অপুকে। অভিনয়ের পাশাপাশি ‘লাল শাড়ি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রযোজনাতেও যুক্ত হন এই অভিনেত্রী।
শৈশবের পূজাই ছিল সবচেয়ে আনন্দের: মিম
ছোটবেলার পূজা মানেই নতুন জামা, পরিবারের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর পছন্দের খাবার খাওয়া। সময়ের সঙ্গে জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে, বদলেছে উদ্যাপনের ধরনও। তবে বিদ্যা সিনহা মিমের কাছে শৈশব ও কৈশোরের পূজার দিনগুলো এখনো বিশেষ এক আবেগের নাম।

মিম বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতিই যেন সবচেয়ে বেশি মধুর। ছোটবেলায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নতুন পোশাক পরে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, দেবী দুর্গার কাছে সবার মঙ্গল কামনা, পছন্দের খাবার খাওয়া আর বন্ধুদের সঙ্গে নাচ-গানে মেতে ওঠা, সব মিলিয়ে পূজা ছিল আনন্দের এক অন্য রকম উপলক্ষ।’
শৈশবের সেই উচ্ছ্বাস এখন স্মৃতির অংশ হলেও পূজার দিনগুলোতে নতুন সাজে বের হওয়ার আনন্দ ধরে রেখেছেন মিম। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত উৎসবের প্রতিটি দিনে পুরোনো দিনের আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। দেবীর কাছে তাঁর প্রার্থনা, সবার মঙ্গল হোক, আগামীর দিনগুলো হয়ে উঠুক আরও সুন্দর।
এবারও পূজা উপলক্ষে সাজপোশাক ও পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ভাগ করে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, উৎসবের আমেজ আর হাসিমুখের ছবিতে ধরা পড়েছে তাঁর আনন্দঘন সময়। কাজের ব্যস্ততার বাইরে পরিবারের সঙ্গে এমন সময় কাটানোই যেন উৎসবের আনন্দকে আরও পূর্ণতা দেয়।

বিদ্যা সিনহা মিমের বিনোদনজগতে যাত্রা শুরু ২০০৭ সালে ‘লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে। হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে ২০২২ সালের শুরুতে ব্যবসায়ী সনি পোদ্দারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন মিম।
তিন অভিনেত্রীর স্মৃতিতে দুর্গাপূজার আনন্দের রং আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনের হিসাব; কিন্তু পরিবারের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, শৈশবের উচ্ছ্বাস আর প্রিয়জনদের সান্নিধ্যের স্মৃতি আজও তাঁদের কাছে অমূল্য। পূজার আলোয় তাই আনন্দের পাশাপাশি ফিরে আসে নস্টালজিয়া, ভালোবাসা আর হারিয়ে যাওয়া সময়কে আরেকবার ফিরে পাওয়ার আকুলতা।






