পুরোনো বাংলা গান কেন এখনো আকৃষ্ট করে নতুন প্রজন্মকে ? কিছু গান আছে, যেগুলো শুনলে মনে হয়, সময় বুঝি একটু থেমে গেছে। পুরোনো রেডিওর শব্দ, ক্যাসেট প্লেয়ারের ঘুরতে থাকা চাকা, বিকেলের বারান্দা কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় দেখা কোনো পরিচিত মুখ সবকিছুই যেন ফিরে পুরনো কিছু গানের সুরে সুরে।
যে গান শুনতে একসময় পরিবারের সবাই মিলে জড়ো হত, সেই গানই আজকের তরুণদের কাছে নতুন আবিষ্কার বলে মনে হয়। কেউ ইউটিউবের সাজেশন থেকে খুঁজে পায়, কেউ ফেসবুক রিলসে কয়েক সেকেন্ড শুনে পুরো গানটি খুঁজতে শুরু করে। আবার কেউ বাবা-মায়ের প্লেলিস্টে হঠাৎ শুনে ফেলে এমন এক সুর, যার সঙ্গে তার নিজের কোনো স্মৃতি নেই, অথচ অদ্ভুতভাবে গানটি তার মন ছুঁয়ে যায়।
গানটির বয়স হয়তো ত্রিশ কিংবা চল্লিশ বছর। কিন্তু সেই গানের সাথে জুড়ে থাকা অনুভূতি যেন তার নিজের কাছে অনেক চেনা। বাংলা গানের জগতে এমন অনেক গান ছড়িয়ে আছে, যেগুলো একসময় চলচ্চিত্র, টেলিভিশন নাটক, ব্যান্ডের অ্যালবাম কিংবা অডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছেছিল। সময়ের সঙ্গে বদলেছে গান শোনার মাধ্যম, বদলেছে শ্রোতার অভ্যাস। কিন্তু কিছু সুর হারিয়ে যায়নি। বরং পুরোনো প্রজন্মের স্মৃতি পেরিয়ে সেগুলো জায়গা করে নিচ্ছে নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টে।
প্রশ্ন হলো, যে গান একসময় ছিল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী, সেই গানই আজ অন্য প্রজন্মের কাছে নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে কীভাবে?
পর্দা পেরিয়ে যে গান বেঁচে থাকে
বাংলা চলচ্চিত্রের গান মানেই শুধু সুর আর কথা নয়। অনেক সময় একটি গান হয়ে ওঠে পুরো সিনেমার সবচেয়ে মনে রাখার মতো অংশ। সিনেমার গল্প ভুলে গেলেও গানটি থেকে যায়। নায়ক-নায়িকার মুখ মনে না থাকলেও কানে বাজতে থাকে পরিচিত সুর।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে এমন অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আর সেই স্মৃতির বড় অংশজুড়ে রয়েছেন এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা ও কনকচাঁপা এর মতো শিল্পীরা।
১৯৭৭ সালে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাক গানের জগতে যাত্রা শুরু করেন এন্ড্রু কিশোর। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি হাজার হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটি আজও শ্রোতাদের মনে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত ‘তোমাকে চাই’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে গানটির স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে।

একইভাবে, পুরোনো চলচ্চিত্রের গান শুনলে অনেকের মনে পড়ে যায় শৈশবের ঈদ, পরিবারের সঙ্গে সিনেমা দেখা কিংবা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার দিনগুলো।
আজকের তরুণ শ্রোতারা হয়তো সেই সময়ের সিনেমা হলে যাননি। তাঁদের কাছে পুরোনো চলচ্চিত্রের অনেক গল্পও অজানা। তবু গানের আবেগ তাঁদের কাছে অপরিচিত নয়। কারণ, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা কিংবা প্রিয় মানুষকে হারানোর কষ্ট এসব অনুভূতির বয়স হয় না। একটি পুরোনো গান তাই নতুন শ্রোতার কাছে শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; নিজের জীবনের অনুভূতি বোঝারও একটি মাধ্যম।
ক্যাসেটের ফিতা থেকে ডিজিটাল প্লেলিস্ট
একসময় গান শোনার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হতো। প্রিয় শিল্পীর নতুন অ্যালবাম বের হলে ক্যাসেট কেনার আনন্দ ছিল আলাদা। পছন্দের গান বারবার শুনতে ক্যাসেটের ফিতা পেছনে ঘুরিয়ে নিতে হতো। রেডিওতে প্রিয় গান প্রচারের সময় মিস হয়ে গেলে আবার কখন শোনা যাবে, সেই অপেক্ষাও ছিল।

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের জনপ্রিয়তা এই ক্যাসেট সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। সোলস, মাইলস, ফিডব্যাক, এলআরবি ও নগর বাউলের মতো ব্যান্ড বাংলা গানের জগতে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে। তাদের গান শুধু অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও কনসার্টের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
সোলসের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’, ফিডব্যাকের ‘মেলা যায় রে’, মাইলসের ‘ফিরিয়ে দাও’ কিংবা এলআরবির ‘সেই তুমি’ এমন গান একসময় অসংখ্য শ্রোতার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। এই সময়ের ব্যান্ড সংগীতকে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আইয়ুব বাচ্চু। এলআরবির প্রতিষ্ঠাতা ও লিড গিটারিস্ট হিসেবে তিনি নিজের অনন্য গিটার বাজানোর ধরন, আবেগঘন কণ্ঠ এবং সুরের বৈশিষ্ট্যে শ্রোতাদের মনে বিশেষ জায়গা করে নেন। ‘সেই তুমি’, ‘রূপালী গিটার’ ও ‘চলো বদলে যাই’ এর মতো গান আজও বাংলা ব্যান্ড সংগীতের স্মরণীয় সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। তাঁর সংগীতচর্চা পরবর্তী প্রজন্মের বহু শিল্পীকেও অনুপ্রাণিত করেছে।

আজ ঘরে ঘরে ক্যাসেট প্লেয়ার নেই, অ্যালবাম কিনে গান শোনার অভ্যাসও কমেছে। তবু ইউটিউব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পুরোনো গান সহজেই খুঁজে পাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। বদলেছে গান শোনার মাধ্যম, কিন্তু সময় পেরিয়েও হারিয়ে যায়নি সেই সুরের আবেদন।
নতুন সময়ে পুরোনো স্মৃতির গান
শুধু চলচ্চিত্র কিংবা ব্যান্ডের গান নয়, বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের গানও বয়ে আনে ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। কোনো সুর ফিরিয়ে আনে পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশন দেখার সন্ধ্যা, স্কুল থেকে ফিরে প্রিয় নাটকের অপেক্ষা কিংবা গল্পের আবেগে বড়দের চোখে জল আসার মুহূর্ত। গল্পের অনেক কিছু ভুলে গেলেও থেকে যায় সেই সুর, সেই অনুভূতি।
নতুন প্রজন্ম হয়তো নাটকটি দেখেনি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের গান শুনেই শুরু হতে পারে তার খোঁজ, কোন নাটকের, কার কণ্ঠে, কোথায় পাওয়া যাবে পুরো গানটি? ইউটিউব ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই মুহূর্তেই খোঁজ নতুন প্রজন্মের জন্য সহজ করেছে।
স্মৃতি ধরে রাখেন যাঁরা
পুরোনো গানকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত সংগ্রাহক ও তরুণ সংগীতশিল্পীদের অবদান রয়েছে। গানের মূল রেকর্ডিং, প্রকাশের ইতিহাস এবং স্রষ্টাদের পরিচয় সংরক্ষণ করাও জরুরি। এতে গান টিকে থাকার পাশাপাশি আড়ালে থাকা মানুষগুলোর অবদানও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়।
একসময় যে গান ছিল একটি প্রজন্মের স্মৃতি, সেটিই পরের প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠতে পারে নতুন আবিষ্কার। কখনো বাবা-মায়ের সংগ্রহে থাকা ক্যাসেটে, কখনো বন্ধুর পাঠানো ভিডিওতে, আবার কখনো হেডফোনে ভেসে আসা পরিচিত কোনো সুরে ফিরে আসে সেই গান। সময় বদলায়, শোনার মাধ্যম বদলায়, কিন্তু কিছু সুর মানুষের মনে জায়গা করে নেয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম।









