সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে
২৩ এপ্রিল এলেই বাংলা সংস্কৃতির ভেতরে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে। ১৯৯২ সালের এই দিনে সত্যজিৎ রায় চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর তৈরি করা চরিত্রগুলো, ফেলুদা, গুপী-বাঘা, আর সত্যজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কু কোথাও যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে।
প্রফেসর শঙ্কু সেইরকমই এক চরিত্র, যাকে পড়তে পড়তে মনে হয়, তিনি কোথাও আছেন। হয়তো গিরিডিহর কোনো পুরনো বাড়িতে, অগোছালো ল্যাবরেটরির মাঝে বসে নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন।
ডায়েরির পাতায় এক বিজ্ঞানীর জন্ম
১৯৬১ সাল। সত্যজিৎ রায়ের সম্পাদনায় নতুনভাবে প্রকাশিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলো একটি গল্প “ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি”। এখান থেকেই শুরু। সেই সময় মহাকাশযাত্রা নিয়ে পৃথিবীজুড়ে উত্তেজনা, আর ঠিক তখনই সত্যজিৎ রায় এক বাঙালি বিজ্ঞানীকে মহাশূন্যে পাঠালেন, ডায়েরির ভাষায়।

এই ডায়েরির টোনটাই শঙ্কুকে আলাদা করে দেয়। গল্প নয়, যেন নিজের কাছে লেখা ব্যক্তিগত নোট। ফলে পাঠক খুব সহজেই তাঁর ভেতরের মানুষটাকে দেখতে পায়।
এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ………
- “প্রফেসর শঙ্কু ও হার” (১৯৬১),
- “মহাকাশের দূত” (১৯৬৪),
- “আশ্চর্য পুতুল” (১৯৬৫),
- “গোলক রহস্য” (১৯৬৮),
- “চি-চিং” (১৯৭০),
- “মাকাও” (১৯৭২),
- “এল ডোরাডো” (১৯৭৪),
- “বাগদাদের বাক্স” (১৯৭৫),
- “রোবু” (১৯৭৬),
- “কোচাবাম্বার গুহা” (১৯৭৭)।
প্রথমে পত্রিকায়, পরে বই, মূলত আনন্দ পাবলিশার্স থেকে। পরে “প্রফেসর শঙ্কু সমগ্র” হিসেবে সব গল্প একসঙ্গে পাওয়া যায়।

কল্পবিজ্ঞান – কিন্তু মানুষের গল্প
শঙ্কুর ল্যাবরেটরিতে আছে অদ্ভুত সব আবিষ্কার, রোবট, ভাষা অনুবাদ যন্ত্র, অজানা ওষুধ, এমনকি সময় নিয়ে পরীক্ষাও। আজকের দিনে AI, রোবোটিক্স বা স্পেস টেকনোলজি নিয়ে আমরা যেভাবে ভাবছি, তার অনেক ইঙ্গিত এই গল্পগুলোতে ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শঙ্কুর গল্প কখনো ‘বিজ্ঞান শেখানোর’ গল্প হয়ে ওঠে না। বরং বিজ্ঞানটা গল্পের ভেতরেই মিশে থাকে।
আর একটা জিনিস চোখে পড়ে, একাকীত্ব। এত বড় মাপের বিজ্ঞানী, কিন্তু তাঁর পৃথিবীটা খুব ছোট। প্রহ্লাদ আর নিউটন, এই দুই সঙ্গী নিয়েই তাঁর জীবন। এই মানবিক দিকটাই শঙ্কুকে শুধু ‘চরিত্র’ নয়, একজন ‘মানুষ’ করে তোলে।
পর্দায় শঙ্কু – স্বপ্ন, চেষ্টা আর অপূর্ণতা
বছরের পর বছর ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়িয়েছে, শঙ্কুকে কি বড় পর্দায় দেখা যাবে?
এই চেষ্টাটা বাস্তব রূপ পায় ২০১৯ সালে।
“প্রফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো” (২০১৯)
- পরিচালক : সন্দীপ রায় (সত্যজিৎ রায়ের ছেলে)
- প্রধান চরিত্র (প্রফেসর শঙ্কু) : ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়
এই সিনেমায় শঙ্কুকে দেখা যায় এক অভিযানে, হারানো সোনার শহর এল ডোরাডোর খোঁজে। বিদেশি লোকেশন, রহস্য আর অ্যাডভেঞ্চারের মিশেল ছিল ছবিটিতে।

তবে অনেক দর্শকের মনে একটা আক্ষেপ রয়ে গেছে। কারণ, বইয়ের শঙ্কুর যে গভীরতা, তার চিন্তা, নিঃসঙ্গতা, কৌতূহল, সেটা পুরোপুরি পর্দায় ধরা পড়েনি বলে মনে হয়েছে অনেকের।
কেন শঙ্কু ‘কঠিন’ চরিত্র?
সমস্যাটা আসলে গল্পের ভেতরেই।
- ডায়েরির ভাষা , খুব ব্যক্তিগত
- ঘটনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই ভাবনাও
- বিজ্ঞান আর কল্পনার সূক্ষ্ম ভারসাম্য
এই সবকিছু মিলিয়ে শঙ্কুকে সিনেমায় তুলে ধরা সহজ নয়। শুধু প্রযুক্তি বা ভিএফএক্স দিয়ে কাজটা হয় না, দরকার এক ধরনের অনুভূতি, যেটা সত্যজিৎ রায়ের লেখায় ছিল খুব স্বাভাবিকভাবে।
আজকের দিনে শঙ্কু কেন প্রাসঙ্গিক
আজ আমরা AI, মহাকাশ গবেষণা, জিন প্রযুক্তি, এসব নিয়ে কথা বলি। কিন্তু শঙ্কুর গল্পে এইসব প্রশ্ন অনেক আগেই উঠে এসেছে, মানুষ কতদূর যাবে? বিজ্ঞানের সীমা কোথায়?
এই জায়গা থেকেই শঙ্কু আজও নতুন লাগে। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি শুধু গল্পের চরিত্র না, এক ধরনের চিন্তার দরজা খুলে দেন।
প্রফেসর শঙ্কু সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| স্রষ্টা | সত্যজিৎ রায় |
| চরিত্রের নাম | প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু |
| প্রথম প্রকাশ | ১৯৬১ |
| প্রথম গল্প | ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি |
| প্রকাশ মাধ্যম | সন্দেশ পত্রিকা |
| প্রধান ধরণ | কল্পবিজ্ঞান (Science Fiction) |
| উল্লেখযোগ্য উপাদান | ডায়েরি ফরম্যাট, বিজ্ঞান, রহস্য |
| সহকারী চরিত্র | প্রহ্লাদ, নিউটন (বিড়াল) |
| প্রকাশনা | আনন্দ পাবলিশার্স |
| সিনেমা | প্রফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো (২০১৯) |
| পরিচালক (সিনেমা) | সন্দীপ রায় |
| বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা | AI, মহাকাশ গবেষণা, প্রযুক্তি |
ডায়েরি থেকেই শুরু, সেখানেই ফিরে যাওয়া
সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে মনে করার অনেক উপায় আছে। কিন্তু সবচেয়ে সহজ আর গভীর উপায় হয়তো একটা, আবার একটা শঙ্কুর গল্প খুলে বসা।
কারণ, সব সিনেমা, সব পরিকল্পনা, সব আলোচনা, শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় সেই ডায়েরির পাতায়।
সেখানেই শঙ্কু সবচেয়ে সত্যি।
সেখানেই তিনি এখনও বেঁচে আছেন ………………
FAQ (প্রফেসর শঙ্কু )
প্রফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু হলেন সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি এক কাল্পনিক বিজ্ঞানী, যিনি গিরিডিহে বসবাস করেন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও অভিযানের মাধ্যমে পরিচিত।
প্রথম গল্প “ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি” ১৯৬১ সালে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
এই গল্পগুলো ডায়েরি আকারে লেখা, যেখানে বিজ্ঞান, রহস্য, কল্পনা এবং মানবিকতা একসাথে মিশে থাকে।
হ্যাঁ, ২০১৯ সালে “প্রফেসর শঙ্কু ও এল ডোরাডো” সিনেমাটি মুক্তি পায়, পরিচালনা করেন সন্দীপ রায়।
কারণ গল্পের বড় অংশই ডায়েরিভিত্তিক এবং চরিত্রের ভেতরের চিন্তা ও অনুভূতি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
AI, মহাকাশ গবেষণা, রোবোটিক্স, এসব আধুনিক ধারণার ইঙ্গিত শঙ্কুর গল্পে আগে থেকেই ছিল।



