Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬

সত্যজিৎ রায়ের জীবনী ও সিনেমা যাত্রা

সত্যজিৎ রায়ের জীবনী ও সিনেমা
সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায়

২ মে, ১৯২১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। তার পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে মহকুমার (বর্তমানে বাংলাদেশ) কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে। সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক ইতিহাস বেশ  শিল্প-সাহিত্য সমৃদ্ধ। যার প্রভাব ছিলো সত্যজিৎ রায়ের উপরেও। সত্যজিৎ রায়ের দাদা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি শিশুসাহিত্যিক। তবে সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীত, চিত্রশিল্প, জ্যোতির্বিদ্যাসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি আগ্রহী ছিলেন। ১৯১৩ সালে শিশু কিশোরদের জন্য উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী প্রকাশ করা শুরু করলেন কিশোর পত্রিকা ‘সন্দেশ’। তিনিই হন এটির প্রথম সম্পাদক। এর দুই বছর পর ১৯১৫ সালে মারা গেলেন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর পর সন্দেশের সম্পাদকের দায়িত্ব নেন তাঁরই পুত্র সুকুমার রায়। এই সুকুমার রায় ছিলেন ননসেন্স ঘরানার লেখক ও শিশুসাহিত্যের আরেক প্রবাদপ্রতীম লেখক। যার ‘আবোল-তাবোল, হ-য-ব-র-ল’ ‘পাগলা দাশু’ -এর মত কালজয়ী সাহিত্য আজও মুগ্ধ করে কিশোর থেকে বড়দেরও। কবি সুকুমার রায়ের ঘরেই ১৯২১ সালে জন্ম নেন বাংলা সিনেমা ও ভারতবর্ষের কিংবদন্তী নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। বাংলা সিনেমার বটবৃক্ষ। বাবা-দাদা সাহিত্যিক হলেও সত্যজিৎ রায় পুরোদস্তুর সাহিত্যিক হননি। ভিন্ন পথে হেঁটেছেন তিনি। কিভাবে সত্যজিৎ রায় সিনেমা নির্মাতা হয়ে উঠলেন? সত্যজিৎ রায়ের জীবনী ও সিনেমা যাত্রা নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন। বলা ভালো আজ তাঁর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি রইলো অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

সত্যজিৎ- এর শৈশব ও স্নাতক

পুত্র সত্যজিৎ রায়ের জন্মের মাত্র তিন বছরের মাথায়, ১৯২৩ সালে অকালে মৃত্যুবরণ করেন বাবা সুকুমার রায়। ফলে মা সুপ্রভা দেবীকে একাই কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ছেলেকে বড় করে তুলতে হয়। পিতৃহীন এই সন্তানের লালন-পালন তার জন্য সহজ ছিল না।

সত্যজিৎ রায়ের জীবনী ও সিনেমা
৪ বছর বয়সে সত্যজিৎ | ছবি: Childhood Days – A book by Satyjit ray

১৯৩৬ সালে সত্যজিৎকে পাঠানো হয় প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে স্নাতক পড়ার জন্য। তবে ক্রমে তিনি পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বইপত্র সরিয়ে রেখে দিন-রাত ঘরে বসে সিনেমা দেখা আর ধ্রুপদি সঙ্গীত শোনায় ডুবে থাকতেন। সিনেমা দেখতে দেখতে একসময় তিনি বুঝতে পারেন, অভিনেতা-অভিনেত্রী নয়, বরং তাকে টানে পরিচালকদের কাজ। তার চিন্তায় জায়গা করে নেয় বিশ্বখ্যাত নির্মাতা যেমন আর্নস্ট লুবিচ, জন ফোর্ড, ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপরা এবং উইলিয়াম ওয়াইলার।

এর পাশাপাশি চিত্রকলার প্রতিও তার গভীর আগ্রহ জন্মায়। এই শিল্পীসত্তাই পরবর্তীতে তার কর্মজীবনের প্রথম চাকরির পথ খুলে দেয়।

শান্তিনিকেতনে যাত্রা

তবে পুঁথিগত পড়াশোনার প্রতি টান না থাকলেও ১৯৪০ সালে সত্যজিৎ রায় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করেন। এরপর তিনি আর পুঁথিগত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান না বলে জানালেন মা সুপ্রভা দেবীকে। তাঁর মা হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “পড়াশোনা না করলে খাবি কী?” সত্যজিৎ শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “সবাই যেভাবে খায়, আমিও সেভাবেই খাবো। চাকরি করব, সেই বেতনে চলব।” মা আবার প্রশ্ন করলেন, “এখন তোকে কে চাকরি দেবে?”

তখন সত্যজিৎ তার অসাধারণ চিত্রকলার কিছু কাজ মাকে দেখালেন। ছেলের প্রতিভায় মুগ্ধ হলেও সুপ্রভা দেবী তাকে সঙ্গে সঙ্গে চাকরিতে যেতে দিতে রাজি হলেন না। বরং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে পাঠিয়ে দিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে। সেখানে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৪০-১৯৪১-এই সময়কালটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের শান্তিনিকেতন অধ্যায়। এখানেই তার সামনে উন্মোচিত হয় প্রাচ্য শিল্পের বিশাল জগৎ। তিনি শিল্পের গভীরে প্রবেশের সুযোগ পান এবং শান্তিনিকেতনের সৃজনশীল পরিবেশ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেখানে তার শিক্ষক ছিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী বিনোদ বিহারি মুখার্জি, যার শিল্পীসত্তার ছাপ সত্যজিতের জীবনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রভাবের অন্যতম প্রমাণ ১৯৭২ সালে নির্মিত তার প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ইনার আই’।

শান্তিনিকেতনে থাকার সময় আরও দুটি বিষয় তার ভবিষ্যৎ পরিচালক জীবনের ভিত গড়ে দেয়। প্রথমত, এক ইংরেজি অধ্যাপকের সংগ্রহ থেকে তিনি নিয়মিত পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সংগীত শুনতেন। দ্বিতীয়ত, লাইব্রেরিতে বসে সিনেমার তত্ত্ব নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করতেন-যা পরবর্তীতে তার চলচ্চিত্র ভাষা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সত্যজিৎ রায়ের জীবনী ও সিনেমা
সত্যজিৎ রায়ের হাতে আঁকা ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার সভাকবি |ছবি: সংগৃহিত

প্রথম চাকরি

১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে সত্যজিৎ শান্তিনিকেতন থেকে পুনরায় কলকাতায় ফিরলেন। সেদিন প্রথমবারের মতো কলকাতা জাপানিদের দ্বারা বোমা হামলার শিকার হয়েছিল। ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে সত্যজিৎ রায় ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমারে মাত্র ৮০ টাকা বেতনের বিনিময়ে জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার হিসেবে যোগ দেন। সে সময় সত্যজিৎ অসাধারণ টাইপোগ্রাফির কাজ করতে পারতেন। ইতোমধ্যে তার সিনিয়র কলিগ ডি. কে. গুপ্ত সিগনেট প্রেস নামে পাবলিশিং হাউস খুললেন। সত্যজিৎ চলে গেলেন সিগনেট প্রেসে। সেখানে সত্যজিতের কাজ ছিল বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন করা। তিনি তার শৈল্পিক দক্ষতা দিয়ে স্বাধীনভাবে একের পর এক বইয়ের ডিজাইন করতে থাকলেন।   

‘সিগনেট প্রেস’-এ থাকাকালীন তিনি অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। এর মধ্যে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ ও ‘রূপসী বাংলা’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’, জিম করবেটের ‘ম্যানইটার্স অব কুমায়ুন ‘ এবং জওহরলাল নেহেরুর ‘ডিসকভারি অফ ইণ্ডিয়া’র মতো বইও।

প্রথম সিনেমা বুনিয়াদ

একদিন ডি. কে. গুপ্ত  সত্যজিৎ-এর হাতে একটি বাংলা ক্লাসিক দিয়ে বললেন, এই বইটির নাম পথের পাঁচালী, আমরা এর একটি শিশুতোষ সংস্করণ বের করব। নাম হবে ‘আম আঁটির ভেপু’, আপনি খুব সুন্দর করে প্রচ্ছদ করবেন। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের সেই ‘পথের পাঁচালী’ বইটি সত্যজিৎ এর ভালো লেগে গেল। কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না, তার নির্মিত প্রথম সিনেমাটি হবে এই বইটিকে নিয়েই। যা পরে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতবে।

১৯৪৭ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ। এই সময় সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাসগুপ্তসহ কয়েকজন মিলে গড়লেন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি। এই সময় সত্যজিৎ নিয়মিত চলচ্চিত্র নিয়ে লেখা ও সমালোচনা শুরু করেন এবং চিত্রনাট্যের প্রতি গভীর আগ্রহ গড়ে ওঠে। তিনি গল্প পড়ে নিজেই চিত্রনাট্য লিখে তা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন।

১৯৪৯ সালে তিনি তার আত্মীয়া ও দীর্ঘদিনের সঙ্গী বিজয়া রায়কে বিয়ে করেন; পরে তাদের ছেলে সন্দীপ রায়ের জন্ম হয়। একই বছর ফরাসি পরিচালক জঁ রেনোয়া কলকাতায় এলে সত্যজিৎ তার সঙ্গে কাজের সুযোগ পান। কোন এক দিন বাংলার দারিদ্র্য ও সৌন্দর্য সম্পর্কে বর্ণনা করতে যেয়ে পথের পাঁচালীর প্রসঙ্গ তোলেন সত্যজিৎ। তাঁর বর্ণনা শুনে রেনোয়া সত্যজিৎকে বললেন, মিস্টার রায়, পথের পাঁচালী গল্পটা অসাধারণ, আর তার চেয়েও অসাধারণ ব্যাপার হবে যদি আপনি পরিচালক হয়ে পথের পাঁচালীকে ছবির ফ্রেমে বন্দি করতে পারেন।” রেনোয়ার কথা সত্যজিৎ রায়ের  মনে গেঁথে গেল।

লন্ডনযাত্রা ও বাইসাইকেল থিভস

১৯৫০ সালে চাকরিসূত্রে সত্যজিৎ রায় লন্ডনে যান, সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী বিজয়া রায়। সেখানে ছয় মাস অবস্থানকালে তিনি বিশ্বখ্যাত পরিচালকদের প্রায় ৯৯ টির মত সিনেমা দেখেন। তবে তাঁকে  বিশেষভাবে নাড়া দেয় ভিট্টোরিও ডি সিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’।  

পরে নিজের প্রবন্ধসংকলন ‘আওয়ার ফিল্মস, দেয়ার ফিল্মস’-এর ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন যে, লন্ডনে থাকাকালীন ‘বাইসাইকেল থিভস’ এবং নব্য-বাস্তবধর্মী সিনেমা তার চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এই অভিজ্ঞতা তাকে বিশ্বাস করায়-অভিজ্ঞতাহীন অভিনেতা এবং সাধারণ লোকেশন দিয়েও বাস্তবঘন অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব।

লন্ডনেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, কলকাতায় ফিরে ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণ করবেন। সেই সময় থেকেই তিনি নোটবুকে ছবিটির পরিকল্পনা ও খুঁটিনাটি লেখা শুরু করেন।

এ নিয়ে কলকাতায় সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপিকা ও চলচ্চিত্র সমালোচক সুনেত্রা ঘটক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “তখন তিনি জাহাজে করে বিদেশ যাচ্ছেন। যাওয়ার সময় ডি.জে.কিমার ও সিগনেট প্রেসের ‘আম আঁটির ভেঁপু’ বইটির প্রচ্ছদ ও ইলাসট্রেশনের কাজটা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। ওটা যখন করছেন, তখনই, আমার যেটা মনে হয়, ওঁনার ছবি করার একটা কথা মাথায় এসে থাকতে পারে। তখন তিনি পাতায় পাতায় ছবি আঁকছেন। ভিস্যুয়ালগুলো ভাবছেন।”

প্রথম শুটিং ও কান স্বীকৃতি

লন্ডন থেকে সেবছরেই ফিরে আসেন সত্যজিৎ। ১৯৫০ সালেই তিনি শুরু করেন ‘পথের পাঁচালী’-র শুটিং। অত্যন্ত সাধারণ যন্ত্রপাতি, সীমিত আয়োজন এবং প্রায় অনভিজ্ঞ অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন। এই সিনেমাযাত্রা সহজ ছিল না। মাঝপথে তিনি বড় অর্থসংকটে পড়েন। তখন বাধ্য হয়ে স্ত্রী বিজয়া রায়ের গয়না থেকে শুরু করে নিজের সংগ্রহের বইপত্র পর্যন্ত বিক্রি করে তিনি ছবির কাজ শেষ করেন।

১৯৫৫ সালে কলকাতার বসুশ্রী সিনেমা হলে মুক্তি পায় ‘পথের পাঁচালী’। শুরুতে ধীরগতির সাড়া পেলেও তৃতীয় সপ্তাহে এসে এটি বক্স অফিসে সাফল্য পায়। এরপর ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানো হয়। ১৯৫৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে এটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি অর্জন করে। পরে দেশ-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার জিতে নেয় সত্যজিৎ-এর এই কালজয়ী ছবি।

পথের পাঁচালী সিনেমার একটি দৃশ্যে অপু, দুর্গা ও দুর্গার মা (ডান থেকে) | ছবি: satyajitray.org

পথের পাঁচালী’ ছিল ‘অপু ট্রিলজি’-র প্রথম পর্ব। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র অপুকে কেন্দ্র করে বানানো সত্যজিতের তিনটি সিনেমাকে একসাথে ‘অপু ট্রিলজি/ত্রয়ী’ বলা হয়। যার প্রথম পর্ব ‘পথের পাঁচালী’-তে অপু ও তার দিদি দুর্গার শৈশব, দ্বিতীয় পর্বে ‘অপরাজিত’-তে অপুর কৈশোর এবং তৃতীয় পর্বে ‘অপুর সংসার’-এ অপুর বড়বেলা, বিয়ে ও সংসার জীবন তুলে ধরা হয়েছে।

সত্যজিৎ-এর ‘পথের পাঁচালী’ সিনেমাটি ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে যার মধ্যে ১৯৫৬ সালের কান চলচ্চিত্র পুরস্কারও অন্তর্ভূক্ত। এছাড়া বিবিসির সর্বকালের সেরা ১০০ বিদেশি ভাষার সিনেমার তালিকাতেও ‘পথের পাঁচালী’ নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

এদিকে, অপু ট্রিলজির দ্বিতীয় ছবি অপরাজিতা ‘ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এ জিতে নেয় গোল্ডেন লায়ন পুরস্কার। আর ট্রিলজির শেষ ছবি অপুর সংসার লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে জিতে নেয় শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার।

ববিতা ও সত্যজিৎ রায়

অপু ট্রিলজি ছাড়াও বিভূতিভুষণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘অশণি সংকেত’ উপন্যাসটিকেও একই নামে তিনি চলচ্চিত্রে রূপ দান করেন। সিনেমাটি ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় এবং বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে। বলা ভালো, ‘অশনি সংকেত’ সত্যজিৎ রায় পরিচালিত প্রথম রঙিন ছায়াছবি। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিভাবে বাংলা অঞ্চলে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল তা দেখানো হয়েছিলো ‘অশণি সংকেত’ উপন্যাসে। ১৯৪৩-৪৪ সালে বৃহত্তর বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যাকে ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তর’ নামে ডাকা হয়। সেই ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তর’ ছিলো তৎকালীন গ্রামীণ বাংলার মানুষের জীবনে এক ভয়াবহ দুর্বিষহের নাম। উপন্যাসের এই বিষয়টি সত্যজিৎকে প্রভাবিত করেছিল। সেই কথাই তিনি বলেছিলেন ১৯৭৩ সালে বার্লিন উৎসব থেকে ফেরার সময় লন্ডনে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে। তিনি বলেন, “যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, এমন একটা জায়গায় এমন কতগুলো লোকের উপর, যারা সেই যুদ্ধের থেকে বহু দূরে রয়েছে এবং তার (যুদ্ধের) কারণ কিছু বুঝতেও পারছে না, অথচ তারা (যুদ্ধের প্রভাব) দেখছে….এই জিনিসটাই আমার কাছে বেশ আশ্চর্য লেগেছিল।”

সত্যজিৎ রায়ের জীবনী ও সিনেমা
সত্যজিৎ রায়ের সাথে ববিতা | ছবি: ফেসবুক

‘অশণি সংকেত’ সিনেমার অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা। সিনেমাতে তাঁকে নেওয়ার বিষয়ে সত্যজিৎ রায় বলেন বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন,’আমি নতুন মেয়ে সবসময় খুঁজি,নতুন ছেলে সবসময় খুঁজি। এবং এটাতে আমার মনে হয়েছিলো অনঙ্গ বউয়ের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য আমার একটি নতুন মেয়ে প্রয়োজন হবে। তারপর যখন বাংলাদেশ এবং আমাদের পশ্চিম বাংলার যে দেয়ালটা ছিলো, সেটা যখন উঠে গেলো তখন ভাবলাম যে ওখানে দেখা যাক না কেন! এবং সত্যি বলতে আমার ইচ্ছে ছিলো ওখানে গিয়ে শুটিং টা করবো…… মেয়ে একটা পাওয়া যায়। তিনি জানান সেইসময় চিত্রালী নামক এক বাংলাদেশী চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকায় ববিতার ছবি দেখেন তিনি যা তাঁর কাছে পাঠানো হত তো এরপর ববিতাকে ডাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন,“তখন আমার মনে হলে হয়তো একে একবার দেখা চলতে পারে।….তারপর স্ক্রিন টেস্টে তিনি উৎরে গেলেন…পাটটা তাকে দিয়ে দিলাম এবং তিনি খুব ভালো অভিনয় করেছেন বলেই আমার বিশ্বাস।”

সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাগুলো:

অপু ট্রিলজি (Apu Trilogy)

  • পথের পাঁচালী (১৯৫৫)
  • অপরাজিত (১৯৫৬)
  • অপুর সংসার (১৯৫৯)

অন্যান্য পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র

  • পরশ পাথর (১৯৫৮)
  • জলসাঘর (১৯৫৮)
  • দেবী (১৯৬০)
  • তিন কন্যা (১৯৬১)
  • কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২)
  • মহানগর (১৯৬৩)
  • চারুলতা (১৯৬৪)
  • নায়ক (১৯৬৬)
  • চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)
  • গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯)
  • প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০)
  • সীমাবদ্ধ (১৯৭১)
  • অশনি সংকেত (১৯৭৩)
  • সোনার কেল্লা (১৯৭৪)
  • জন অরণ্য (১৯৭৬)
  • শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭)
  • জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯)
  • হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)
  • ঘরে বাইরে (১৯৮৪)
  • গণশত্রু (১৯৮৯)
  • শাখা প্রশাখা (১৯৯০)
  • আগন্তুক (১৯৯১)

ডকুমেন্টারি ও শর্ট ফিল্ম (উল্লেখযোগ্য)

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১)
  • সুকুমার রায় (১৯৮৭)
  • দ্য ইনার আই (১৯৭২)
  • পিকুর ডায়েরি (১৯৮১, শর্ট ফিল্ম)

পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা

পথের পাঁচালী (১৯৫৫)

  • কান চলচ্চিত্র উৎসব: শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল (১৯৫৬)
  • বহু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার

অপরাজিত (১৯৫৬)

  • ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব: গোল্ডেন লায়ন (প্রধান পুরস্কার)

অপুর সংসার (১৯৫৯)

  • একাধিক আন্তর্জাতিক উৎসবে পুরস্কার ও স্বীকৃতি

অন্যান্য পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র

জলসাঘর (১৯৫৮)

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (ভারত)

দেবী (১৯৬০)

  • আন্তর্জাতিক সমালোচকদের প্রশংসা ও পুরস্কার

মহানগর (১৯৬৩)

  • বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার

চারুলতা (১৯৬৪)

  • বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব: রূপার ভাল্লুক পুরস্কার

গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯)

  • জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার

প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০)

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

অশনি সংকেত (১৯৭৩)

  • বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব: স্বর্ণ ভাল্লুক পুরস্কার

সোনার কেল্লা (১৯৭৪)

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)

  • সরকারি ও জাতীয় স্বীকৃতি

ঘরে বাইরে (১৯৮৪)

  • আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা

আগন্তুক (১৯৯১)

  • ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব: আন্তর্জাতিক সমালোচক সমিতির পুরস্কার

লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’

সত্যজিৎ রায়কে ১৯৯২ সালে ‘অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস’ তথা অস্কার কর্তৃপক্ষ তাঁর বিপুলা কর্মজীবন ও বিশ্ব সিনেমায় অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘অস্কার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত করেন। তখন তিনি হাস্পাতালে চিকিৎসাধীন। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন ভারতরত্ন ও পদ্মভূষণ সম্মাননা। দীর্ঘ ও অমর এক সিনেমা সাধনা শেষে ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল এই মহারথী নির্মাতা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

+ posts
Share this article
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read next

‘সুরাইয়া’ সিনেমায় শ্যামল মাওলা-নাজিফা তুষি   

‘সুরাইয়া’ সিনেমা লেখক শিবব্রত বর্মনের ছোটগল্প ‘সুরাইয়া’ অবলম্বনে একই নামে সিনেমা নির্মাণ করছেন রবিউল আলম রবি।…
‘সুরাইয়া’ সিনেমায় শ্যামল মাওলা-নাজিফা তুষি

সকল অস্কারজয়ী অভিনেত্রীর তালিকা- ১৯২৯ থেকে ২০২৬

অস্কারজয়ী অভিনেত্রীরা সম্প্রতি ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস (অস্কার) প্রধান সম্পন্ন হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৮১ জন…
সকল অস্কারজয়ী অভিনেত্রীর তালিকা
0
Share