আফরান নিশোর নতুন সিনেমা দম নিয়ে বাড়ছে আগ্রহ
আফরান নিশোর নতুন চমক ‘দম’ নিয়ে আগ্রহ এখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কারণ সুড়ঙ্গ মুক্তির পর থেকেই দর্শকদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরছিল, বড় পর্দায় নিশোর পরের কাজ কোনটি হতে যাচ্ছে। সেই জিজ্ঞাসার উত্তর হিসেবে সামনে এসেছে দম। নির্মাতা রেদওয়ান রনির পরিচালনায় তৈরি এই সিনেমা ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে সিনেমাটির গল্প, অভিনয়শিল্পীদের নির্বাচন, ভিজ্যুয়াল নির্মাণ এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র শাহজাহান ইসলাম নূরকে ঘিরে যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তা একে সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক মুক্তির বাইরে নিয়ে গেছে।
বাস্তব ঘটনার ছোঁয়ায় দম সিনেমার গল্প
এই সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর গল্পের ভেতরে বাস্তবতার ছাপ থাকার দাবি। নির্মাতা জানিয়েছেন, এটি সত্য ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি। বাংলা সিনেমায় এমন গল্প দর্শকদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পায়, কারণ মানুষ এখন শুধু বিনোদন নয়, অনুভব করতে পারে এমন গল্পও খোঁজে। দম সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে শুরু থেকেই কৌতূহল তৈরি করেছে। শাহজাহান ইসলাম নূর নামের চরিত্রটি কোনো অতিমানব নয়, বরং সংগ্রামী একজন মানুষ। তার জীবন, তার বেঁচে থাকা, তার ক্লান্তি, তার ক্ষুধা, তার লড়াইই যেন এই সিনেমার কেন্দ্রে। এ ধরনের চরিত্র দর্শকের কাছে দ্রুত পৌঁছে যায়, কারণ এতে জীবনের গন্ধ থাকে।

শাহজাহান ইসলাম নূর চরিত্রে নিশোর রূপান্তর
আফরান নিশোকে ট্রেলার ও প্রচারণামূলক উপকরণে যে রূপে দেখা গেছে, তা নিঃসন্দেহে আলোচনার দাবি রাখে। তার শারীরিক উপস্থিতি, মুখের ক্লান্তি, চোখের ভাষা এবং পুরো গেটআপ দেখে বোঝা যায়, তিনি চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে গড়ার চেষ্টা করেছেন। একজন অভিনেতার জন্য এমন রূপান্তর সহজ নয়। আর ঠিক এই কারণেই শাহজাহান ইসলাম নূর চরিত্রটি দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নিতে পারে। বড় পর্দায় যখন কোনো তারকা নিজেকে আড়াল করে চরিত্রকে সামনে আনেন, তখন সেই অভিনয় নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ে। নিশোর ক্ষেত্রেও তেমনটাই হচ্ছে।

নিশো ও চঞ্চল চৌধুরীর প্রথম বড়পর্দার মেলবন্ধন
সিনেমাটির আরেকটি বড় শক্তি এর অভিনয়শিল্পীদের সমন্বয়। প্রথমবারের মতো আফরান নিশো ও চঞ্চল চৌধুরী একসঙ্গে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। বর্তমান সময়ের দুই শক্তিশালী অভিনেতাকে একই সিনেমায় পাওয়া দর্শকদের জন্য নিঃসন্দেহে বিশেষ ঘটনা। দুজনের অভিনয়ের ধরন আলাদা, কিন্তু দুজনেই চরিত্রের গভীরে যেতে পারেন। ফলে পর্দায় তাদের উপস্থিতি সিনেমাটিকে অভিনয়ের দিক থেকে আরও শক্ত ভিত দিতে পারে। দর্শকরা সাধারণত এমন জুটিকে নিয়ে বাড়তি আগ্রহ দেখান, কারণ এতে নতুন রসায়নের সম্ভাবনা থাকে।

রহস্যময় চরিত্রে পূজা চেরির উপস্থিতি
নারী চরিত্রের জায়গাতেও দম আলাদা মনোযোগ কাড়ছে। পূজা চেরি এখানে রানী নামের একটি রহস্যঘেরা চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। তার চরিত্রটি গল্পে কীভাবে যুক্ত, সেটি নিয়েই এখন অনেকের আগ্রহ। একটি শক্তিশালী পুরুষকেন্দ্রিক গল্পে নারী চরিত্র যদি রহস্য, আবেগ এবং মোড় ঘোরানোর ক্ষমতা নিয়ে আসে, তাহলে পুরো সিনেমার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। পূজা চেরির উপস্থিতি সেই সম্ভাবনাকেই আরও উসকে দিচ্ছে।

কাজাখস্তানের দুর্গম লোকেশনে শুটিং
নির্মাণের জায়গা থেকেও দম আলাদা মনোযোগ পাওয়ার মতো। সিনেমাটির বড় অংশের শুটিং হয়েছে কাজাখস্তানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে। এ ধরনের লোকেশনে কাজ করা শুধু দৃশ্যের সৌন্দর্যের জন্য নয়, গল্পের আবহকে সত্যি করে তোলার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কঠিন প্রকৃতি, তীব্র ঠান্ডা এবং এক ধরনের নির্জনতা মিলে যে পরিবেশ তৈরি হয়, তা টিকে থাকার গল্পকে আরও বাস্তব করে তোলে। যদি শাহজাহান ইসলাম নূরের সংগ্রামকে এই প্রাকৃতিক পটভূমির সঙ্গে গভীরভাবে মিলিয়ে দেখানো যায়, তাহলে দর্শক শুধু গল্প দেখবেন না, বরং চরিত্রের কষ্টও অনুভব করতে পারবেন।
প্রযোজনা ও নির্মাণ মানে আন্তর্জাতিক ছোঁয়া
এই সিনেমা নিয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতিও লক্ষণীয়। এসভিএফ আলফা আই এন্টারটেইনমেন্ট এবং চরকির যৌথ সম্পৃক্ততা প্রজেক্টটিকে বড় পরিসরে ভাবার ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে দর্শক শুধু গল্পেই সন্তুষ্ট থাকেন না, তারা উপস্থাপন, ভিজ্যুয়াল মান, সাউন্ড এবং সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেন। সেই বিবেচনায় দম একটি যত্ন নিয়ে তৈরি সিনেমা হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সেন্সর ছাড়পত্র ও মুক্তির পরিকল্পনা
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, সিনেমাটি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড থেকে আনকাট ইউ সার্টিফিকেট পেয়েছে। এর অর্থ, এটি পরিবারসহ উপভোগ করার মতো উপযোগী বলে বিবেচিত হয়েছে। মুক্তির পরিকল্পনাও করা হয়েছে ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে। ঈদের সময় বাংলা সিনেমার বাজার সবচেয়ে বড় হয়, তাই এই সময় মুক্তি পাওয়া মানেই দর্শকের বড় অংশের সামনে যাওয়ার সুযোগ। শুরুতে মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তির পরিকল্পনা প্রযোজকদের বাণিজ্যিক চিন্তারও পরিচয় দেয়। এতে একদিকে ভালো প্রদর্শন পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, অন্যদিকে পাইরেসির ঝুঁকিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
দম কি হতে যাচ্ছে নিশোর ক্যারিয়ারের বড় মোড় ?
সব মিলিয়ে দম এখন শুধু আরেকটি নতুন সিনেমা নয়, বরং এটি আফরান নিশোর ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলেই মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি রেদওয়ান রনির প্রত্যাবর্তনের সিনেমা, চঞ্চল চৌধুরী ও নিশোর প্রথম বড়পর্দার মেলবন্ধন, এবং একজন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। শাহজাহান ইসলাম নূর চরিত্রটি তাই কেবল গল্পের একটি নাম নয়, এটি সম্ভবত এমন এক মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করবে, যার ভেতরে দর্শক নিজেদের সময়, কষ্ট এবং বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে পাবেন। এখন দেখার বিষয়, মুক্তির পর দম দর্শকের আবেগ ও প্রত্যাশার কতটা সার্থক উত্তর দিতে পারে।
শেষ কথা
বাংলা সিনেমা এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দর্শক শুধু বিনোদন নয়, বাস্তবতা আর অনুভূতির মিশেল খুঁজছেন। সেই জায়গা থেকে দম একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে হচ্ছে। আফরান নিশোর চরিত্র নির্বাচন, নির্মাতার গল্প বলার ধরন এবং শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এটি শুধুই একটি সিনেমা নয়, বরং একটি অভিজ্ঞতা হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এখন সবকিছু নির্ভর করছে এর উপস্থাপনা ও দর্শকের সঙ্গে সংযোগের ওপর। যদি সিনেমাটি তার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে, তবে দম নিঃসন্দেহে ঢালিউডে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।


