অঞ্জন দত্তের জীবনবোধ
বাংলা সংগীত, সিনেমা ও অভিনয়ের এক প্রবাদ প্রতীম ও বহুমাত্রিক নাম অঞ্জন দত্ত। ৭৩ বছর বয়সেও নির্মাতা, প্রযোজক, অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী-প্রতিটি পরিচয়েই সমানভাবে সক্রিয় তিনি। সম্প্রতি নিজের প্রযোজনা ও অভিনীত নতুন সিনেমা প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, সন্তান ও শিল্পচর্চা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এই শিল্পী। এই আলাপেই অঞ্জন দত্ত বললেন তাঁকে দেখার আশায় সন্তানকে বড় করেননি তিনি।
ছেলের উপর প্রত্যাশা
অঞ্জন দত্ত সম্প্রতি তাঁর প্রযোজনা ও অভিনীত সিনেমা ‘প্রত্যাবর্তন’ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে ছেলে নীল দত্তকে নিয়ে কথা বলেছেন। ছেলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘আমি কোনো দিন এই আশায় নীলকে বড় করিনি যে বুড়ো বয়সে ও আমাকে দেখবে। এই আশা কখনো আমি করি না। আমি যেসব মানুষের সঙ্গে মিশেছি, তাঁদের থেকেও এই ধরনের কোনো মন্তব্য শুনিনি।’ তার এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে এক ভিন্ন জীবনদর্শন-যেখানে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা আছে, কিন্তু প্রত্যাশার বোঝা নেই।

গত বছর মুক্তি পাওয়া ‘এই রাত তোমার আমার’-এর পর এক বছরের ব্যবধানে ‘প্রত্যাবর্তন’-এ আবারও প্রধান চরিত্রে দেখা যাবে অঞ্জনকে। গল্পের প্রেক্ষাপট আমাদের চেনা জীবনের বিষয়গুলো নিয়েই। কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত সংকট আর সম্পর্কের ভেতরের বোঝাপড়ার গল্প। তবে জীবনকে ভারসাম্যের চোখেই দেখেন অঞ্জন। তাঁর ভাষায়, ‘কর্মব্যস্ত জীবন ও পারিবারিক জীবনের সমন্বয় খুব কঠিন কিছু নয়। দুই দিক ব্যালেন্স করে চলা যে কঠিন, এটা ভুল কথা। প্রচুর এমন মানুষ দেখেছি। আসলে কে কীভাবে নিজের জীবনে বাঁচছে তার ওপরে অনেকটা নির্ভর করে। কিছু কিছু মানুষের এটা হয়ে যায়। আমার চরিত্রটা এই ছবিতে অবশ্য পয়সার অন্য পিঠ।’
অঞ্জনের চরিত্র
প্রত্যাবর্তন-এ অঞ্জনের চরিত্রও তার ব্যক্তিত্বের একেবারেই বিপরীত। সিনেমায় তিনি পুরুলিয়া গ্রামের এক স্কুলশিক্ষক। চরিত্রটি নিয়ে আগ্রহের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরিচালক সমর্পণ সেনগুপ্ত যখন এই চরিত্র নিয়ে আসে তখন বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পুরুলিয়ার গ্রামের স্কুলের মাস্টার। আমার ব্যক্তিত্বের থেকে একেবারে আলাদা।’

চরিত্রের সাফল্য কতটা, সেই বিচার অবশ্য দর্শকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। সন্তান ও বাবা-মায়ের সম্পর্ক নিয়েও অকপট অঞ্জন। বাস্তবতার নিরিখে তিনি মনে করেন, সন্তান বড় হলে তার নিজের জীবন থাকবে, নিজের সিদ্ধান্ত থাকবে। তাই প্রত্যাশার শিকলে সম্পর্ককে বেঁধে রাখতে চান না। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেক মা-বাবা রয়েছেন, তাঁরা মনে করেন সারা জীবন ছেলেমেয়েরা তাঁদের সঙ্গে থাকবেন। এটা তো ভেবে নেওয়াও ভুল। আমি এমনই মনে করি। বিশ্বাস করি, যত দিন আছি নিজের মতো থাকব। নীল তার পরে যা করবে, সেটা ওর ব্যাপার। নীল বড় হয়ে আমাকে দেখবে, এটা আমি জীবনে কোনো দিন ভাবতে পারিনি।’
সমসাময়িক নির্মাতা ও বাদল সরকার
সমসাময়িক বাংলা সিনেমা নিয়েও আশাবাদী এই শিল্পী। বর্তমান সময়ের নির্মাতাদের মধ্যে সৃজিত মুখোপাধ্যায় ও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কাজ তার ভালো লাগে বলেও জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন বাংলা পথনাট্যের প্রবাদপুরুষ ও প্রবর্তক বাদল সরকারের কথা। নিজের অর্থায়নে নির্মিত নতুন একটি চলচ্চিত্রের কথাও জানান, যা বাদল সরকারের প্রতি তার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার্ঘ্য। অঞ্জনের কথায়, ‘নিজের টাকায় একটা ছবি (প্রত্যাবর্তন) তৈরি করেছি। বাদল সরকার আমাকে অভিনয় করতে শিখিয়েছিলেন, তখন আমার ১৯ বছর বয়স। এক বছর তাঁর কাছে শিখেছিলাম অভিনয়। তাঁর ওপরে একটি ছবি তৈরি করেছি। যেখানে বাদল সরকার আর অঞ্জন দত্তের চরিত্র দর্শক দেখবেন। লাভের আশা করছি না। এই ছবির মাধ্যমেই বাদল সরকারকে আমার শ্রদ্ধা।’
শিল্পী অঞ্জন দত্তের এই জীবনবোধ ও গুরুভক্তি-কৃতজ্ঞতা প্রকাশ মনে করিয়ে দেয় জীবন হোক, সম্পর্ক হোক কিংবা শিল্প-সবকিছুর কেন্দ্রে থাকা উচিত স্বাধীনতা, সততা আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ইচ্ছে। এছাড়া জীবনের চলার পথের সকল শিক্ষককেই স্মরণ করা আরেক মহান কাজ।


