‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’
সম্প্রতি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’ সিনেমা, যা প্রজেক্ট হেইল মেরি ও মাইকেল-এর মতো সিনেমাকে পেছনে ফেলে হলিউডের বক্স অফিসের শীর্ষে উঠে এসেছে। কী আছে এই ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’ সিনেমায়?
এটি মূলত ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’-এর সিক্যুয়েল। ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’ প্রথম মুক্তি পায় ২০০৬ সালে। এটি লরেন ওয়েইজবার্গার-এর উপন্যাস ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’ অবলম্বনে নির্মিত। এটিকে হাস্যরসাত্মক-নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, যার মূল বিষয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ফ্যাশন জগৎ এবং আত্ম-উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত বিকাশ।
২০০৬ এর ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যান্ডি স্যাকস তথা অ্যান হ্যাথাওয়ে, যিনি সদ্য কলেজ শেষ করা এক তরুণী। তিনি রানওয়ে নামের একটি প্রভাবশালী ফ্যাশন ম্যাগাজিনে সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পান। এই ম্যাগাজিনের সম্পাদক মিরান্ডা প্রিস্টলি, তথা মেরিল স্ট্রিপ-অত্যন্ত ক্ষমতাবান, কঠোর এবং ভীতিপ্রদ এক ব্যক্তিত্ব। ফ্যাশনের প্রতি অ্যান্ডির কোনো আগ্রহ নেই; তবে সাংবাদিকতায় নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পথে এটি বড় সুযোগ হতে পারে ভেবেই তিনি চাকরিটি গ্রহণ করেন।
শুরুতে অ্যান্ডির জন্য কাজটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। মিরান্ডা অত্যধিক খুঁতখুঁতে, কঠোর সমালোচক এবং সবকিছুতে নিখুঁত হওয়াই তাঁর লক্ষ্য। অন্যদিকে অ্যান্ডি সারাক্ষণ কাজের চাপে বিপর্যস্ত থাকে, আর ফ্যাশন সম্পর্কে তার অজ্ঞতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তবে সময়ের সঙ্গে, স্টাইলিশ সহকর্মী নাইজেল-এর সহায়তায় অ্যান্ডির পরিবর্তন আসে এবং ধীরে ধীরে তিনি নিজের কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন।

কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্ডির ভেতরেও পরিবর্তন শুরু হয়। তিনি নিজের বন্ধু, প্রেমিক এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধের চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিতে থাকেন। ফ্যাশন জগতের চাকচিক্যময় অথচ নির্মম বাস্তবতায় তিনি এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে, মিরান্ডাকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে নিজের নৈতিক অবস্থান ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও আপস করতে শুরু করেন।
গল্পের মোড় ঘুরে যায় যখন অ্যান্ডি উপলব্ধি করেন, এই চাকরি কতটা বিষাক্ত এবং সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। তিনি দেখেন, নিজের অবস্থান ধরে রাখতে মিরান্ডা কীভাবে মানুষকে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করেন, এবং একই সঙ্গে বুঝতে পারেন-তিনি ধীরে ধীরে এমন একজন মানুষে পরিণত হচ্ছেন, যা কখনো হতে চাননি।
শেষ পর্যন্ত অ্যান্ডি চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি মর্যাদা, প্রভাব ও বাহ্যিক সাফল্যের চেয়ে নিজের মূল্যবোধ, আত্মসম্মান এবং ব্যক্তিগত সুখকে বেছে নেন। পরে মিরান্ডাও নীরবে অ্যান্ডির সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেন। কিন্তু অ্যান্ডি নিজের প্রকৃত সত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক নতুন পথেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’
এই সিনেমার ২০ বছর পরে মুক্তি পেল এর সিক্যুয়েল দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২। তবে এই সিনেমার গল্পটি একটু ভিন্নই।
দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা এবং এর সিক্যুয়েলকে একসঙ্গে দেখলে এটি কেবল ফ্যাশন দুনিয়ার গল্প নয়; বরং ক্ষমতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পরিচয়ের সংকট, এবং সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান-বিশেষ করে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান-ও ব্যক্তির অনিবার্য পরিবর্তনের গল্প হিসেবে হাজির হয়।

সিক্যুয়েল এই সিনেমার গল্পকে আরও গভীর এবং সময়োপযোগী জায়গায় নিয়ে এসেছে। বহু বছর পর দেখা যায়, একসময়কার প্রভাবশালী রানওয়ে আর আগের অবস্থানে নেই। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অ্যালগরিদমনির্ভর সংস্কৃতি, দ্রুত বদলে যাওয়া প্রবণতা, করপোরেট একীভূতকরণ এবং গণমাধ্যমের পুনর্গঠনের চাপে ম্যাগাজিনটির ঐতিহ্যবাহী প্রভাব ক্রমশ কমে এসেছে।
এই বাস্তবতায় মিরান্ডা প্রিস্টলি আর কেবল অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার প্রতীক নন; বরং তিনি এমন এক চরিত্র, যিনি উপলব্ধি করছেন-ক্ষমতা কখনও চিরস্থায়ী নয়, এবং যে ব্যবস্থাকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন, সময় এখন সেই ব্যবস্থাকেই আমূল বদলে দিয়েছে। অন্যদিকে অ্যান্ডি, যিনি নিজস্ব পরিচয় ও ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছিলেন, তিনিও করপোরেট পুনর্গঠন ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখে আবার রানওয়ে-এর জগতে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
মানুষ ও জগতের স্থিতি কোথায়?
এখানে গল্পটি ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে গিয়ে এক বৃহত্তর প্রশ্ন তোলে-যে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে, কর্মক্ষেত্র বদলে যায়, এবং প্রাসঙ্গিকতা মুহূর্তে হারিয়ে যেতে পারে-সেখানে মানুষ ও জগতের স্থিতি কোথায়?
দার্শনিকভাবে, প্রাডা এবং এর সিক্যুয়েল আধুনিক সভ্যতার এক গভীর বাস্তবতাকে সামনে তুলে ধরেছে। প্রথম চলচ্চিত্র যেখানে দেখায় সাফল্যের জন্য মানুষ কতদূর যেতে প্রস্তুত, সিক্যুয়েল সেখানে দেখায় সেই সাফল্যও কতটা ভঙ্গুর। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-প্রতিষ্ঠান, মর্যাদা, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক অবস্থান-সবই সময়ের কাছে নশ্বর। স্থায়ী কিছু থাকলে তা হলো চরিত্র, অভিযোজনের ক্ষমতা, এবং নিজের মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধতা।
মিরান্ডার চরিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি বলে, কর্তৃত্ব একদিন ক্ষয় হয়; অ্যান্ডির মাধ্যমে বলে, অর্জন কখনও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়; আর রানওয়ে-এর পতনের মধ্য দিয়ে সিনেমাটি বলছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় সংস্কৃতি নির্ধারণ করত, তারাও ইতিহাসের পরিবর্তনের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য।
বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
সব মিলিয়ে, দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ও এর সিক্যুয়েলের মূল বার্তা অত্যন্ত মানবিক ও গভীর: জীবনে ক্ষমতা, খ্যাতি বা সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেগুলো কখনোই চূড়ান্ত নয়। চূড়ান্ত হলো-পরিবর্তনের ভেতরেও নিজের নৈতিক বোধ, আত্মপরিচয় এবং মানবিকতাকে কতটা অটুট রাখা যায়।
একইসঙ্গে মুদ্রিত গণমাধ্যমের সর্বময় কর্তৃত্ব যে হুমকির মুখে, সেটিও খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ফলে সিনেমাটি অতীতের ফ্যাশন ম্যাগাজিন কিংবা গণমাধ্যমের ক্ষমতা ও জনমত নির্মাণের সামর্থ্য দেখানোর পাশাপাশি এবার সেই সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রের অস্তিত্বগত সংকট দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যে দ্রুত পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সেই পরিবর্তন ঠিক কোন দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে-সেখানেও সিনেমাটি রেখে গেছে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।


