Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
রবিবার, মার্চ ২৯, ২০২৬

নারী কিসে আটকায়?

নারী কিসে আটকায়?
নারী কিসে আটকায়?

রাক্ষস সিনেমা

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের প্রেক্ষাগৃহে অনেকগুলো সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। তাঁর মধ্যে অন্যতম সিনেমা হল সিয়াম আহমেদ অভিনীত ‘রাক্ষস’। এই সিনেমায় অভিনেতা সিয়াম একটি প্রশ্ন তুলেছেন যা বেশ গুরুত্বপূর্ণ আকারে হাজির হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কাছে। সিনেমাটি যারা এখনো দেখেন নি তারাও ট্রেলারের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। প্রশ্নটি হচ্ছে নারী কিসে আটকায়?

প্রশ্নটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে এমনকি একাডেমিক অঙ্গনেও। আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটি সহজ হলেও প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। প্রথমত, এখানে “আটকায়” শব্দটি কী অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। যদি এর অর্থ হয় কাউকে নিয়ন্ত্রণ করা বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধরে রাখা, বা এমন একটি জাল বিছিয়ে রাখা যার মাধ্যমে পাখি শিকারের মতো করে আটকাবে তবে প্রশ্নটি নৈতিকভাবে সমস্যাজনক। কিন্তু যদি এটি বোঝায়-কোন কোন কারণে একজন নারী স্বেচ্ছায় কোনো সম্পর্ক বা অবস্থানে থাকতে আগ্রহী হন-তাহলে এটি একটি বৈধ এবং গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাযোগ্য প্রশ্ন।  

প্রথমত, দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে স্বায়ত্তশাসিত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয় প্রায় সবগুলো প্রধান দার্শনিক ধারাতেই। ইচ্ছার স্বাধীনতা যেখানে অন্যতম আলোচনার বিষয়। এই ইচ্ছার স্বাধীনতা তত্ত্বের অন্যতম এক ধারা হচ্ছে উদার ইচ্ছাবাদ বা লিবার্টারিয়ানিজম। এখানে বলা হয়, মানুষ সত্যিকারের স্বাধীন এবং কিছু সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তার নিজের। তাহলে নারী কিসে আটকায় এটা নির্ভর করবে কেবল নারীর স্বাধীন ইচ্ছা-পছন্দের উপরেই। বা আদতে আটকাবে কিনা সেই প্রশ্নও।  

অস্তিত্ববাদী ধারা

অস্তিত্ববাদী চিন্তায় বলা হয়, মানুষ তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও পছন্দের মাধ্যমে জীবনকে গড়ে তোলে। যেমন জ্যা পল সাত্র অনুযায়ী মানুষ এমন সত্তা যা নিজেকে ক্রমাগত তৈরি করে এবং নিজের পরিচয় গড়ে তোলে। তাঁর মতে, মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য। সে চাক বা না চাক, তাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে, এবং সেই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ দায় তাঁর ওপরই থাকবে। ফলে একজন নারী কোনো সম্পর্ক বা অবস্থানে থাকবেন কি না, সেটি তার স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন হওয়া উচিত, কোনো বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের ফল নয়। যেমনটা আমরা দেখেছি অভিনেতা সিয়াম বলে দিচ্ছেন নারী আটকায় লোভে। অর্থাৎ এখানে নারীর স্বাধীন সত্তাকে লোভের সাথে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। যা বেশ বিতর্কিত মন্তব্য ও স্বাধীন চিন্তা ও হয়ে উঠার পরিপন্থী।

সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত অনেক সময় সামাজিক কাঠামো দ্বারা প্রভাবিত হয়। পরিবার, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক প্রত্যাশা নারীর আচরণ ও পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অনেক সমাজে নারীরা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না, কারণ সামাজিক চাপ, লজ্জা বা নিরাপত্তাহীনতা তাদেরকে বাধা দেয়। আবার আধুনিক সমাজে শিক্ষা, নগরায়ণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় নারীর সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে “আটকে থাকা” অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত ইচ্ছার চেয়ে সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন হয়ে ওঠে।

বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ

এছাড়া, বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করা হয় জৈবিক প্রবণতা এবং অভিযোজনের মাধ্যমে। ইতিহাসগতভাবে নারীরা এমন সঙ্গীকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যারা নিরাপত্তা, সম্পদ এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করতে সক্ষম। কারণ সন্তান ধারণ ও লালন-পালনে নারীর বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি, ফলে তাদের জন্য নির্ভরযোগ্য সঙ্গী নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনগত কৌশল হিসেবে দেখা হয়। তবে আধুনিক সমাজে এই প্রবণতা অনেকাংশে পরিবর্তিত হয়েছে, এবং সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত বৈচিত্র্যের কারণে এটি আর একমাত্র নির্ধারক হিসেবে কাজ করে না। ফলে, বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যখন আমরা দেখবো তখন সিয়ামের উল্লেখিত নারীর লোভকে আসলে লোভ বলা চলে না, এটি তাঁর জৈবিক প্রবণতা, অভিযোজন, নিরাপত্তা এমনকি তাঁর ও তাঁর থেকে উদ্ভব হওয়া পরবর্তী বংশের সার্বিক উন্নতি ও বেছে থাকার এক কৌশল হিসেবে সামনে আসে যা তাঁর জন্য খুবই দরকারী।   

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সংযুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ এমন সম্পর্কেই থাকতে আগ্রহী হয় যেখানে সে নিরাপত্তা, ভালোবাসা এবং মানসিক সমর্থন অনুভব করে। একজন নারী যদি কোনো সম্পর্কে নিজেকে মূল্যবান, সম্মানিত বলে অনুভব করেন, তবে সেই সম্পর্ক তার কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে। বিপরীতভাবে, অবহেলা, অসম্মান বা মানসিক চাপ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। তাই “আটকে থাকা” অনেক সময় আসলে গভীর আবেগিক সংযোগের প্রতিফলন। যেখানে সে এসকল কিছুর নিরাপত্তা পাবে না বলে সেখান থেকে তাঁর সরে আসার পরিস্থিতি তৈরি হয় যাকে কিনা নায়ক সিয়ামের মতো করে অনেকেই লোভ হিসেবে আখ্যায়িত করতে চায়।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ

এছাড়াও আছে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ। এ দিকটি থেকে সম্পর্ককে অনেক সময় লাভ-ক্ষতির সমীকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। একজন ব্যক্তি তখনই কোনো সম্পর্কে থাকে, যখন সে মনে করে এই সম্পর্ক থেকে প্রাপ্ত সুবিধা তার ক্ষতির চেয়ে বেশি। এই সুবিধা শুধু আর্থিক নয়, আবেগিক ও সামাজিকও হতে পারে। তবে যেখানে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কম, সেখানে সম্পর্ক ত্যাগ করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর নারীরা সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিক স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, ফলে সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে পারস্পরিক পছন্দ ও সম্মান। ফলে, এখানেও নারী তাঁর পছন্দমত না আটকে থাকতে পারে।

নারীবাদী দৃষ্টিকোণ

তবে রাক্ষস সিনেমার এই ডায়ালগটি নারীবাদী দৃষ্টিকোণ সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে। সাধারণ নারীবাদী দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী  “নারী কিসে আটকায়” প্রশ্নটি অনেক সময় এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, যেখানে নারীকে একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য সত্তা হিসেবে দেখা হয়। নারীবাদ এই ধারণার বিরোধিতা করে এবং জোর দেয় নারীর এজেন্সি বা নিজস্ব সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতার ওপর। এই দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-নারীকে কীভাবে “আটকানো” যায় তা নয়, বরং কীভাবে তার স্বাধীনতা, পছন্দ এবং ক্ষমতাকে সম্মান করা যায়।   

সব দৃষ্টিকোণ একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে, এই প্রশ্নের কোনো একক বা সরল উত্তর নেই। একজন নারী কোনো একক কারণে কোনো সম্পর্কে থাকেন না। তার সিদ্ধান্ত গড়ে ওঠে ব্যক্তিগত অনুভূতি, সামাজিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সম্মিলিত প্রভাবে। তাই প্রশ্নটি যদি নিয়ন্ত্রণের অর্থে করা হয়, তবে তা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু যদি এটি বোঝার উদ্দেশ্যে করা হয়-কোন কারণে একজন নারী স্বেচ্ছায় কোনো সম্পর্কে থাকতে চান-তাহলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ অনুসন্ধানমূলক প্রশ্ন। যদিও সিনেমায় এর এক ধরনের উত্তর আমরা নায়কের কাছ থেকে পেয়েছি যা বলছে নারী লোভে আটকায়।

সিনেমা কেন বাস্তবের মাঠে?

তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন যে সিনেমার কল্প-কাহিনীর একটি ডায়ালগকে কেন্দ্র করে বাস্তবের দুনিয়ায় এতো বিশ্লেষণ করা কতটা যৌক্তিক। সেই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, সিনেমা বাস্তবের চেয়েও অধিক বাস্তব। সিনেমা হচ্ছে সেই শিল্প মাধ্যম যা কিনা দর্শক মনে সরাসরি প্রভাব ফেলে, চিন্তা জাগায়, ফ্যান্টাসি জাগায় এবং সেই চিন্তা-কল্পনা আবার বাস্তবে রূপ দিতেও চায়। মানে এটি একটি আন্তঃজগত যেখানে সিনেমা আসে কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে আবার সেই কল্পনা ও সিনেমার দৃশ্যকে মানুষ বাস্তবে রূপান্তরিত করতে চায়। তাইতো সিনেমা নিয়ে বিখ্যাত নির্মাতা মার্টিন স্কোরসেজ বলেছিলেন, ‘সিনেমা হলো ফ্রেমে কী আছে আর কী নেই, তারই বিষয়।” অর্থাৎ স্বপ্ন ও বাস্তব উভয়ই সিনেমার বিষয়।

লেখকঃ জাকির হোসেন

জাকির হোসেন
+ posts
Share this article
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read next

সিনেমা ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ ওপেনিংয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে

প্রজেক্ট হেইল মেরি ২০২৬ সালের ৯ মার্চ লন্ডনে জাঁকজমক প্রিমিয়ারের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’।…
সিনেমা ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ ওপেনিংয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ২ কোটি আয় করলো আট দিনেই

বনলতা এক্সপ্রেস ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে দারুণ আলোচনায় রয়েছে তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’…
'বনলতা এক্সপ্রেস' ২ কোটি

শাকিবের ‘রকস্টার’ সিনেমায় পান্থ কানাই যে চমক দেখাবেন

‘রকস্টার’ সিনেমায় পান্থ কানাই পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের প্রেক্ষাগৃহে চলছে শাকিব খানের সিনেমা ‘প্রিন্স:…
শাকিবের ‘রকস্টার’ সিনেমায় পান্থ কানাই

ওয়ারফেজের কমল ফ্রি প্যালেস্টাইন লেখায় আমেরিকা যেতে পারেননি

ওয়ারফেজ রক-মেটাল ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’ তাদের পথচলার চার দশক পূর্তি উপলক্ষে ২০২৪ সালে ‘ফোরটি ইয়ার্স লিগ্যাসি…
ওয়ারফেজের কমল ফ্রি প্যালেস্টাইন
0
Share