অনির্বাণ ভট্টাচার্য
বর্তমান সময়ের পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম অনির্বাণ ভট্টাচার্য। থিয়েটার, সিনেমা ও সংগীত-সব ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র উপস্থিতি তৈরি করেছেন তিনি। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি সমাজ, রাজনীতি ও ভাষা নিয়ে স্পষ্ট মতামতের কারণেও প্রায়ই আলোচনায় থাকেন এই অভিনেতা। এছাড়াও অনির্বাণ ভট্টাচার্য বাংলাদেশে কাজ করতে চান বলেও ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশে কাজ করার আগ্রহ নিয়ে কথা বলেন অনির্বাণ।
সাক্ষাৎকারে বাংলা ভাষা ও দেশপ্রেমের বিষয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে বাঙালি সমাজের একটি অংশ মাতৃভাষা নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভুগছে। বাংলা ভাষা ব্যবহার করতেও অনেকে সংকোচবোধ করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দেশপ্রেম মানে উন্মাদনা নয়
দেশপ্রেমের প্রচলিত ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর উপন্যাস ‘ঘরে বাইরে’–এর প্রসঙ্গ টানেন অনির্বাণ। তাঁর ভাষায়, যাদের কেবল তীব্র উত্তেজনা বা সম্মোহনের প্রয়োজন হয়, তাদের ভালোবাসা আসলে দেশের প্রতি নয়, বরং এক ধরনের অন্ধ আবেগের প্রতি। প্রকৃত দেশপ্রেম মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়, উন্মাদনা নয়।
২০০৪ সালে মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় পাড়ি জমান অনির্বাণ। সেই সময়ের সমাজব্যবস্থা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখেন তিনি। তাঁর মতে, তখনকার সময়ে তথ্য ও মতামতের এত প্রবল চাপ ছিল না; সমাজ ছিল তুলনামূলক শান্ত ও সরল।
ভোগবাদে বাঙ্গালী
শৈশবে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁরও। তবে নিজের ভাষায়, মাঠে কোনো “এক্সট্রা-অর্ডিনারি” দক্ষতা তাঁর ছিল না। ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, নব্বই–পরবর্তী সময়ে বাঙালি সমাজে ভোগবাদ ও পণ্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে শুরু করে। বন্ধুদের দেখাদেখি বাইক কেনা কিংবা দেখনদারির প্রবণতাকে সেই সামাজিক পরিবর্তনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
অভিযাত্রী অনির্বাণ
নিজের শিল্পীসত্তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনির্বাণ বলেন, “আমি নিজেকে একজন ‘ট্রেকার’ বা অভিযাত্রী হিসেবেই দেখতে পছন্দ করি। কোনো ‘সামিট’ বা পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আমার কোনোদিনই ছিল না।”
তিনি জানান, অভিনয়, গান কিংবা পরিচালনা-যা কিছু করেছেন, তা কোনো প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য নয়; বরং ভালোবাসা থেকেই। বাংলা ভাষা ও থিয়েটারকেই তিনি নিজের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম বলে মনে করেন।
বর্তমানে বাংলা ভাষার সঙ্গে হিন্দি ও ইংরেজির মিশ্রণ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে বিচলিত না হলেও এর পেছনের সামাজিক কারণগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনির্বাণ। তাঁর মতে, সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং ইংরেজি–হিন্দির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এর অন্যতম কারণ।
শহর নয় গ্রাম
শহুরে বুদ্ধিজীবী সমাজ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। অনির্বাণের মতে, “শহরকেন্দ্রিক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের চেয়ে গ্রামীণ প্রান্তিক বা নিম্নবিত্ত মানুষেরাই বাংলা ভাষাকে অনেক বেশি আন্তরিকতার সাথে আঁকড়ে ধরে আছেন এবং ভাষাটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।”
রাজনীতির ভাষাতেও হিন্দি শব্দের বাড়তি ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অভিনেতা। তাঁর মতে, ‘কার্যকর্তা’ বা ‘মন্ডল’–এর মতো শব্দের ব্যাপক ব্যবহার ভাষাগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
বাংলাদেশি শিল্পীদের প্রশংসা
বাংলাদেশি শিল্পীদের কাজেরও প্রশংসা করেন অনির্বাণ। চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম এবং জয়া আহসান–এর অভিনয়ের প্রশংসা করে তিনি জানান, বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতাদের কাজ তাঁর আগ্রহ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ এর আগেই এখান থেকে একটি কাজের প্রস্তাব পেয়েছিলেন। বিশেষ করে নুহাশ হুমায়ুন এবং নিপুণের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে বলেন, “বাংলাদেশে কাজ করার জন্য দরখাস্ত দিয়েছি।”
টালিউডে কাজ করলেও ভালো গল্প ও সৃজনশীল নির্মাতাদের টানেই বাংলাদেশে কাজ করতে চান বলে জানান অনির্বাণ।
থিয়েটার-রাজনীতি-বেকার তরুণ
থিয়েটার নিয়ে তরুণদের আগ্রহ কমে গেছে, এমন ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন তিনি। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান কমে যাওয়ায় থিয়েটার জগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। পাশাপাশি টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও সচেতন থাকার কথা জানান তিনি।
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক বিষয়গুলোতে সবসময় সরব ছিলেন অনির্বাণ। অতীতে এনআরসি ইস্যুতে “কাগজ দেখাব না” আন্দোলনের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর নতুন ব্যান্ড ‘হোলিগানিজম’–ও তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ব্যান্ডটির আলোচিত গান ‘পৃথিবীটা ভালো লোকেদের নয়’ প্রসঙ্গে অনির্বাণ বলেন, গানটি মূলত বর্তমান সমাজের বেকার তরুণদের হতাশা, অস্থিরতা ও অপ্রাপ্তির প্রতিফলন।


