রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ফিলিস্তিন ও ইহুদি ভাবনা
আজ ২৫ শে বৈশাখ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম সন্তান ও লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। দিনটি নানা আয়োজনে, আলোচনা, গানে ও ভাবনায় পালিত হচ্ছে বাংলা ভাষা-ভাষী ও রবীন্দ্রপ্রেমীদের মধ্যে। তাঁর সাহিত্য রচনা, গান, প্রবন্ধ ও নানা ভাবনা নিয়ে ভাবনা ও আলোচনা চললেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর লেখাজোকা, আলাপচারিতা নিয়ে আলোচনার দৃশ্যমানতা জনপরিসরে কম। যদিও তাঁর প্রায় সমস্ত ভাবনা নিয়েই বদ্ধ ও উন্মুক্ত দুই পরিসরেই আলোচনা হয়ে এসেছে। তবে আজ এমন একটি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা তুলে ধরতে চাই যা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে অন্যতম। যা আধুনিক সভ্যতার সংকট হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। আর এই সংকটের নাম ফিলিস্তিন। ফিলিস্তিনে চলমান ইজরায়েলী গণহত্যা ও অবরোধের মাঝে আজ যখন রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এলো তখন জেনে নেয়া যাক এই দুই জাতিসত্তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি ভেবেছিলেন এবং কি বলেছেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ সরাসরি তাঁর কোন লেখায় ফিলিস্তিন ও ইজরায়েল নিয়ে না লিখলেও তাঁর দুটি সাক্ষাৎকার এ বিষয়ে বেশ প্রণিধানযোগ্য। এর মধ্যে ১৯২৬ সালে, তিনি ফিলিস্তিন সফরের মনোবাসনা করেছিলেন। ফিলিস্তিন যাওয়ার আগে Jewish Telegraphic Agency-কে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তিনি। ১৯২৬ সালের ২০ জুন প্রকাশিত হয় ওই সাক্ষাৎকার। তবে ফিলিস্তিনে ব্যক্তিগত অসুস্থতাজনিত কারণে সেবার আর ফিলিস্তিন যেতে পারেননি তিনি। অবশ্য কখনোই আর ফিলিস্তিনে যাওয়া হয়নি এই বিশ্বকবির। এরপরের সবচেয়ে বিখ্যাত দলিলটি হচ্ছে The Jewish Standard পত্রিকাকে দেয়া রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়। তবে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী আরো বিস্তারিত লিখে প্রকাশ করেন ১৯৫০ সালে তাঁর ব্যক্তিগত লেখায়।

স্বল্প পরিসরের এই সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন জায়োনিস্ট আন্দোলনকে সমর্থন ও এর আসন্ন বিপথগামিতার ব্যাপারটি নিয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলেছেন। ১৯৪৭ সালে বেলফোর ঘোষনার মাধ্যমে ইসরায়েল ফিলিস্তিনে তাঁদের স্থায়ী আবাস গড়তে শুরু করার আগেই এই জায়োনিস্ট আন্দোলন ও এর আসন্ন বিপদ ও ভবিষৎ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
ইহুদি চিন্তকদের সাথে আলাপ
সে সময় রবীন্দ্রনাথের সাথে ইহুদি সম্প্রদায়ের বেশকিছু প্রভাবশালী চিন্তক ও ব্যক্তিবর্গের সাথে আলাপচারিতা হত। তাঁদের সাথে রবীন্দ্রনাথের সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো। তারই প্রেক্ষিতে নানা ভাবনা তিনি বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছেন।
আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫), উইলিয়াম রটেনস্টাইন (১৮৭২-১৯৪৫), সিলভাইন লেভি (১৮৬৩-১৯৩৫), স্টেলা ক্রামরিচ (১৮৯৬-১৯৯৩), শ্লোমিৎ ফ্রিডা ফ্রাউম (১৮৯৩-১৯৬৩), অ্যালেক্স অ্যারনসন (১৯১২-১৯৯৫), মরিস উইন্টারনিৎস (১৮৬৩-১৯৩৭)-এর মতো ইহুদি চিন্তকদের সাথে তাঁর পরিচয় ও কথোপকথন বেশ গুরুত্বপূর্ন এই প্রেক্ষাপটে।
মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু আরব ভূমিতে ইহুদিদের অভিবাসন প্রকল্পকে সমর্থন না করলেও এর সমর্থন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে সেটা বর্তমানে চলমান ইসরায়েল রাষ্ট্রের জাতিগত নিপীড়ন ও জাতিগত নির্মূলের যেই পরিকল্পনা চলমান তাঁকে সমর্থন নয়। বরং এটি ছিলো একটি সহাবস্থান ও এক জাতি হিসেবে গড়ে উঠার পরিকল্পনা দান।
এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে প্যালেস্টাইনের ইহুদি নারী পর্যটক শ্লোমিৎ ফ্রাউম কিংবা সংস্কৃতের অধ্যাপক ড. ইমানুয়েল ওলসফ্যাঙ্গারকে বিভিন্ন সময়ে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র পড়লে ইহুদি জনগণ ও তাঁদের সংস্কৃতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের সম্মান ও মমতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।
তেল আবিবে ‘ট্যাগোর স্ট্রিট’
এমনকি একটি জায়োনিস্ট সংগঠনকে কিবুৎসকিমের (কৃষিভিত্তিক ইহুদি বসতি-প্রকল্প) অনুকরণে শান্তি নিকেতনে ছোটো ছোটো খামারবাড়ি গড়ে তোলার আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ইহুদিদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সহমর্মিতা ও তাঁদের পুনর্বাসন প্রকল্পে সমর্থনের কারণে ইসরায়েল ১৯৬১ সালে রাজধানী তেলআবিবে ‘ট্যাগোর স্ট্রিট’ বা ‘রেহোভ ট্যাগোর’ নামে একটি রাস্তার নামকরণও করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ইহুদিদের একক আধিপত্য চাননি বরং তিনি চেয়েছিলেন ইহুদিদের পুনর্বাসন এবং আরবদের সঙ্গে তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু সেটা ইসরায়েল নামক স্বতন্ত্র কোনো জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য করতে হয় যে, আদি-জায়োনিস্টদের যেসকল চিন্তক অহিংস ও মৈত্রীভিত্তিক একটি ইহুদি রাষ্ট্রের কথা ভাবতেন, রবীন্দ্রনাথের ভাবনা তাঁদের সাথেই বরং বেশি মেলে।

The Jewish Standard এর সাথে সাক্ষাৎকারটি অন্তত তাই নির্দেশ করে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় রবীন্দ্রনাথের এই ইহুদি প্রকল্পের প্রতি সমর্থন কতটা যৌক্তিক ছিলো সে আলোচনা জারি রাখা যাতে পারে একইসাথে।
মার্টিন বুবারের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এটি স্পষ্ট, জায়োনিজম এবং জায়োনিস্টদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সহানুভূতি ছিলো, এবং ইহুদি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তিনি শ্রদ্ধার চোখেও দেখতেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একইসাথে এই জায়োনিজমের সাথে পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ ও এর আগ্রাসনবাদীতার বিরোধীও ছিলেন। ইহুদি ও ফিলিস্তিনিরা যৌথভাবে ইহুদি ও প্যালেস্টাইনের নাগরিক হবে এবং একটি কমনওয়েলথ অফ প্যালেস্টাইনের অধীনে থাকবে এমনটাই চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি চেয়েছিলেন ইহুদি এবং আরবদের শান্তিপূর্ণভাবে একত্রে বসবাস। অন্ধ জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক চুক্তির দুর্বল ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কোনো বিচ্ছিন্ন ইহুদি রাষ্ট্র নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের উপর ভিত্তি করে একটি কমনওয়েলথ তিনি চেয়েছিলেন যা আরবে ইহুদিদের স্থায়ী ও প্রকৃত পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে পারে। সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথের এমন ধারণাই ফুটে উঠেছে। বর্তমান জায়োনিস্টদের চরম উগ্র জাতিগত-ধর্মীয় ও আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের বিপরীতে তিনি আইনস্টাইনের উদার বিশ্বনাগরিকতার ধারনাকেই এক্ষেত্রে বিশ্বাস করতেন।
রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববীক্ষা
তাঁর এমনটা ভাবার কারণ তাঁর বিশ্বাসের মধ্যে অন্তর্হিত। রবীন্দ্রনাথ মানুষের ইতিহাস আর পৃথিবীকে অভিন্ন রূপে দেখতেন যেখানে ছোট-বড়, স্থানীয়-বৈশ্বিক, আধ্যাত্মিক-বস্তুগত, সবকিছুর মধ্যে মেলবন্ধনে বিশ্বাস করতেন।
তিনি ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে বিদ্বেষ, ভয়, অন্ধ গর্ব, কিংবা চরম জাতীয়তাবাদ কোনটার পক্ষেই ছিলেন না। কোনো ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতি বা সম্প্রদায় অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয় বলেও মানতেন।
একই সাথে তিনি নিপীড়িত মানুষের নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণের অধিকারের পক্ষে ছিলেন। একইসঙ্গে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সব সম্প্রদায়ের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হওয়া উচিত বলেও মনে করতেন। ফলে ইহুদিরাও যেহেতু নির্যাতিত, নিপীড়িত জাতি ছিলোও সেকারণে তাঁদের পক্ষে দাঁড়াতেও রবীন্দ্রনাথ কুন্ঠাবোধ করেননি।
সাক্ষাৎকার
১৯২৬ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর Jewish Telegraphic Agency একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি টেলিগ্রাফিককে বলেছিলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে গভীর আগ্রহ ও কিছুটা উদ্বেগের সঙ্গে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের উপনিবেশ স্থাপনের অগ্রগতি লক্ষ্য করছি। সম্প্রতি আমি ফিলিস্তিন থেকে আমার জায়নবাদী বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু সাহিত্যপত্র পেয়েছি, যেখানে ইহুদি অগ্রগামীদের সামনে থাকা বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং মানবকল্যাণের স্বার্থে তাদের যে কঠিন বাধা অতিক্রম করতে হচ্ছে, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনে আমি Hebrew University of Jerusalem-এ বক্তৃতা দেব, প্রাচ্যের সভ্যতা বিকাশে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো।”
তিনি প্যালেস্টাইনে ইহুদি প্রকল্পের গোড়াপত্তনকারীদের প্রশংসা করছিলেন, কিন্তু স্বদেশ ভূমি গাড়তে গিয়ে ইউরোপীয় খ্রিস্টান উপনিবেশবাদীদের অনুকরণ না করার জন্য ইসরায়েলীদের সতর্কও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
ইউরোপীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ
এর কারণ, ইউরোপীয় ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন যে, ইউরোপে থাকা ইহুদিরা অনেক সময় তাদের আতিথ্যদানকারী দেশের চেয়েও বেশি “ইউরোপীয়” হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে, এবং কখনো কখনো তারা অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদ বা উগ্র দেশপ্রেমের দিকে ঝুঁকেছে-যা শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য ভালো ফল বয়ে আনেনি।
এই প্রসঙ্গে তিনি টেলিগ্রাফিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তোমাদের (ইজরায়েল) উচিত ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের অন্ধভাবে অনুকরণ না করা। এসময় তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন। রবীন্দ্রনাথ বলেন, “সম্প্রতি কলকাতায় আমার সঙ্গে এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হয়েছে, এক রাশিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি ইন্ডোলজিস্ট আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু একইসাথে তিনি প্রবল ফরাসি জাত্যাভিমান দেখাচ্ছিলেন। আনাতোল ফ্রান্সের কি কখনো দরকার পড়েছে তাঁর নিজের থেকে ফ্রান্সপ্রেম দেখানো? এটা খুবই ক্ষতিকর বিষয় হয়ে উঠে, যদি কোনো মানুষ তাঁর নিজের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলে।“ এসময় রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন যে, ইহুদি চেতনার সবচেয়ে বড় শক্তি তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। আর তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সার্বজনীনতা।“
“আরবরাও এক সহনশীল জাতি। তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ইহুদিদের মতো একই ভিত্তি থেকে এসেছে। আধ্যাত্মিকভাবে আরবরা ইহুদিদের কাছ থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করেছে। মূলগতভাবে দেখলে-তোমরা এবং তারা একই পরিবার।
দি জিউইশ স্ট্যান্ডার্ড-এর সাথে সাক্ষাৎকার: ফিলিস্তিনি সমস্যা প্রসঙ্গে
টেলিগ্রাফিকের সাথের সাক্ষাৎকারের চার বছর পর, ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথের আরো একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় উদারপন্থী সংবাদমাধ্যম দি জিউইশ স্ট্যান্ডার্ডে। এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন জন্মসূত্রে অস্ট্রিয়ান অস্তিত্ববাদী ইহুদী দার্শনিক ও পরবর্তী ইসরায়েলী নাগরিক, মার্টিন বুবার। মার্টিন বুবারের লেখা থেকে জানা যায় এই আলাপটি তিনি রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে প্রাগে গিয়ে করেছিলেন। যা ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয় বুধবারের নিজস্ব লেখা থেকে।
মার্টিন বুবারের ভাষায়- আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে (১৯২৬) প্যালেস্টাইনে ইহুদি অভিবাসন এবং জায়োনিজমের ব্যাপারে আলোচনার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারটি প্রাগে, সংস্কৃতের অধ্যাপক মরিস উইন্টারনিৎজের বাসায় ঘটেছিলো।
সেদিন আমাদের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছিলো, তার কোনো নোট আমি রাখিনি। তবু স্মৃতির সাহায্য নিয়ে পঁচিশ বছর আগের সেই আলোচনার মূল বিষয়বস্তুর একটা রূপরেখা এখানে দেওয়া যেতে পারে।

ওই সাক্ষাৎকারটিতে রবীন্দ্রনাথ বলেন, “আমি জায়নবাদী আদর্শকে সম্মান করি এবং যারা এর জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছেন, তাদের প্রশংসা করি। যতটা সম্ভব আমি নিবিড়ভাবে দেখেছি-কীভাবে ধীরে ধীরে তোমাদের আদর্শ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। তোমরা অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছ।‘
তবুও তিনি আবারও সতর্ক করেন ঔপনিবেশিক ধাঁচ অনুসরণ করা নিয়ে। “কিন্তু এখন তোমাদের রাজনৈতিক অভিমুখ তোমাদের এমন এক অন্ধগলির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যার কোনো সমাধানের পথ নেই। ইংল্যান্ড চাইলেও আরব-ইহুদি অংশীদারিত্ব তৈরি করতে পারবে না। এই সম্প্রীতি ফিলিস্তিনের মাটিতেই অর্জন করতে হবে।”

প্রশ্ন: এই সম্প্রীতি কীভাবে অর্জন করা সম্ভব?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: “আমি কোনো রাষ্ট্রনায়ক নই, আর তোমার প্রশ্নের উত্তর জানি-এমন ভানও করি না। তবে আমি আরবদের চিনি, এবং আমি বিশ্বাস করি ইহুদিদেরও চিনি। তাই আমার মনে হয়, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্ভব।
ইহুদিরা এক প্রাচীন জাতি। তারা নির্যাতন ও যন্ত্রণা সহ্য করেছে, কিন্তু নিজেদের পরিচয় হারাতে দেয়নি। তাদের শক্তি তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মে। এই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়, যাকে সহজে বিলীন বা আত্মসাৎ করা যায় না।”
আরব-ইহুদি সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন- “আরবরাও এক সহনশীল জাতি। তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ইহুদিদের মতো একই ভিত্তি থেকে এসেছে। আধ্যাত্মিকভাবে আরবরা ইহুদিদের কাছ থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করেছে। মূলগতভাবে দেখলে-তোমরা এবং তারা একই পরিবার, হ্যাঁ, এক মহান পরিবার। পারিবারিক বিরোধ সবসময়ই তীব্র হয়,”-তিনি হেসে বললেন-“কিন্তু তার সমাধান সম্ভব।
ইহুদি এবং ফিলিস্তিনি পরিচয়
তোমরা এমন মানুষের সঙ্গেও বাস করতে শিখেছ যারা আরবদের চেয়েও অনেক বেশি ভিন্ন-যেমন আমেরিকার মতো যন্ত্রসভ্যতার দেশে। সেখানে তোমরা একইসঙ্গে ইহুদি এবং আমেরিকান হতে পেরেছ। তাহলে কি তোমরা ইহুদি এবং ফিলিস্তিনি হতে পারবে না?”
সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়, এই কথা বলার সময় রবীন্দ্রনাথের মুখে এক অস্বাভাবিক শান্ত ভাব নেমে আসে। তিনি যেন নিজের কথার প্রতিধ্বনি শুনছিলেন।
এরপর বুবার সংশয় প্রকাশ করে বলেন, “কিন্তু জায়নবাদ তো ইহুদিদের এই দ্বৈত জীবন থেকে মুক্তি খুঁজছে। যদি ইহুদি জাতীয়তাবাদ ও ফিলিস্তিনীয় পরিচয়ের মধ্যে আলাদা করতে হয়, তাহলে ফিলিস্তিন তো আরেকটি আমেরিকা, ফ্রান্স বা জার্মানির মতোই হয়ে যাবে ইহুদিদের কাছে।”
আইনস্টাইনের বিশ্বনাগরিকতা
তখন রবীন্দ্রনাথ, যার কথায় সবসময়ই এক ধরনের ছন্দময়তা ছিল, উত্তর দেন,“আমি জায়নবাদকে বুঝি আমার মহান বন্ধু আলবার্ট আইনস্টাইন-এর মতো করেই (বিশ্বনাগরিকতা)। আমি ইহুদি জাতীয়তাবাদকে দেখি ইহুদি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে। আজকের পৃথিবীতে এর জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রয়োজন। এর অর্থ উপযুক্ত ভৌগোলিক পরিবেশ, এবং অনুকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থাকা দরকার।”
যদি ইহুদি নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরবদের থেকে আলাদা করতে চায়, তবে এই পবিত্র ভূমিতে অস্থিরতা ও বিস্ফোরণ ঘটবেই।”
ঔপনিবেশিক ফাঁদ
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আবারও সেই সতর্কবার্তা দেন। জায়নবাদী প্রকল্পের চারপাশে থাকা ঔপনিবেশিক ফাঁদ এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত ভূখণ্ডে মানুষের সভ্যতার ইতিহাস ও সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথায় তিনি বলেন, “আমি তা বুঝি। কিন্তু ফিলিস্তিন এই সুযোগগুলো দিতে পারবে কেবল তখনই, যদি ইহুদিরা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে আরবদের অন্তর্ভুক্ত করে। তোমাদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিকে রাজনৈতিক সহযোগিতা অর্জনের জন্য কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হবে না। আমি এমন একটি ফিলিস্তিনি কমনওয়েলথ কল্পনা করি, যেখানে আরবরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় জীবন যাপন করবে, ইহুদিরা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে, কিন্তু উভয়েই একক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে যুক্ত থাকবে।”
রবীন্দ্রনাথ আরও বলেন,“আলবার্ট আইনস্টাইন-এর যে ধর্মীয়/দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি-যার সঙ্গে আমি মূলগতভাবে একমত, যদিও কিছু ছোটখাটো পার্থক্য আছে-তা সংকীর্ণ গোঁড়ামি বা কঠোর রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের বিরোধী। তার মহাজাগতিক বিশ্বাস ইউরোপীয় কূটনীতির শ্বেতপত্র বা অন্য কোনো রাজনৈতিক নথির দ্বারা প্রভাবিত হয় না। এই ধরনের বিশ্বাসই তোমাদের সেই বিস্তৃত জাতীয়তাবাদের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি উদাহরণ হবে।
চুক্তি কখনোই নিপীড়ন থেকে রক্ষা করেনি
কাগজের অনুচ্ছেদ আর ধারার জালে জড়িয়ে যেয়ো না। সব দেশের ইহুদিরা জানে-রাজনৈতিক সুরক্ষা আসলে কিছুই নিশ্চিত করতে পারে না। চুক্তি কখনোই তোমাদের নিপীড়ন থেকে রক্ষা করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না।‘
নিজেদের সহ-ফিলিস্তিনিদের কাছে গিয়ে বলো, ‘আমরা দু’জনই প্রাচীন জাতি। আমরা দু’জনই একগুঁয়ে জাতি। তোমরা আমাদের দমন করতে পারবে না, আমরাও তোমাদের বদলাতে চাইব না। কিন্তু আমরা নিজেদের মতো থেকেও ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য-ইহুদি ও আরবদের কমনওয়েলথ- ধারণার মধ্যে একত্রিত হতে পারি।’”
তিনি জানতেন, এসব কথা অনেকের কাছেই হয়তো ইউটোপিয়ান স্বপ্ন বলে মনে হবে। তবুও তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের সম্ভাবনায়। তিনি বলেন,“আমি তোমাদের চোখে সংশয় দেখতে পাচ্ছি। তোমরা ভাবছ, এগুলো এক সরল কবির স্বপ্ন। কিন্তু আমি ইহুদি জাতির সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করি না। যদি তোমরা মন দিয়ে আরবদের বোঝাতে পারো যে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ তোমাদের সঙ্গে অভিন্ন, এবং দেখাতে পারো যে তোমাদের কাজ উভয় জাতির জন্যই, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরবরাই তোমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হয়ে উঠবে।”
সাংবাদিক আবার প্রশ্ন তোলেন-অতীতে জায়নবাদীরা কি সেটাই করেনি? এরপর তিনি ১৯২৯ (জেরুজালেমের ‘ওয়েলিং ওয়াল’ ব্যবহার নিয়ে বিরোধের জেরে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ওপর আরবদের হামলা) সালের সহিংস ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চান, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাকে থামিয়ে দেন। তাঁর মুখে ছায়া নেমে আসে: রবীন্দ্রনাথ বলেন,“ওই কুৎসিত ঘটনাগুলোর কথা এখন না বলাই ভালো। ঠিক সেই ঘটনাগুলোর কারণেই আমি এভাবে বলছি।”
জাতীয়তাবাদের পশ্চিমা খেলা
এরপর তিনি আরব রাজনীতি ও জনমানসের প্রসঙ্গে গভীরভাবে বলেন, “আগে আরব জাতীয়তাবাদ মূলত আধ্যাত্মিক ছিল, ইহুদিদের থেকে ভিন্নভাবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা তাদের ভূমিকে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের চেয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছে, কারণ তারা আধ্যাত্মিকভাবে এর ঊর্ধ্বে ছিল। পশ্চিমা সভ্যতা একে আদিম বলে। কিন্তু আরবরা রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের পশ্চিমা খেলায় নতুন-তাই তাদের মন সহজেই বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা মনে করেছে, ইহুদিদের উপস্থিতি তাদের ধর্মীয় জীবনের জন্য হুমকি। এই ভুল ধারণা অনেকটাই রাজনৈতিক উসকানির ফল।”
তিনি যোগ করেন- “জায়নবাদ, যা পশ্চিমা কূটনৈতিক চিন্তার কাছে জটিল মনে হতে পারে, আরবদের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ও বিভ্রান্তমূলক। তাই আরবদের মানসিক অভিযোজন ধীরে ধীরে হতে হবে এই ধারণার সাথে। এতে ইহুদিদের ধৈর্যশীল ও বুদ্ধিমান হতে হবে। তোমরা প্রাচ্য ও পশ্চিমের মিশ্র সভ্যতায় গড়া মানুষ-তোমাদের উচিত সহনশীল শিক্ষক হওয়া। রাজনৈতিক বাধা সত্ত্বেও, তোমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। ত্যাগ স্বীকার সত্ত্বেও, ফিলিস্তিনের সহ-জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে বোঝাপড়ার পথে তোমাদের অবিচলভাবে এগিয়ে যেতে হবে।“
ইহুদি ও আরব উভয়েরই মহান বন্ধু বলতে থাকলেন,“আমি জানি, (ওদের) প্রথমেই তোমাদেরকে বুঝতে কষ্ট হবে। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে মর্যাদা ও অহংকারের ধারণা ভুলে যাও, এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ চালিয়ে যাও- একটি ফিলিস্তিন কমনওয়েলথ যেখানে আরব ও ইহুদিরা তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করবে। তখন তোমরা সফল হবেই—হতেই হবে,” বললেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তারপর ক্লান্ত হয়ে হেলান দিলেন।
লন্ডনের টেবিল নয়, সম্প্রীতি
সবশেষে ক্লান্ত রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে বলেন-“ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান লন্ডনে ব্রিটিশ সরকার ও জায়নবাদী নেতাদের আলোচনায় হবে না। জায়নবাদের সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করে আরব-ইহুদি যৌথ সহযোগিতার ওপর। এই সহযোগিতা কেবল ফিলিস্তিনেই সরাসরি বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্ভব। যদি ইহুদি নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরবদের থেকে আলাদা করতে চায়, তবে এই পবিত্র ভূমিতে অস্থিরতা ও বিস্ফোরণ ঘটবেই।”
চোখ বন্ধ করে তিনি খুব নরম স্বরে বলেন-“আমরা কবিরা যা স্বপ্ন দেখি, ইহুদিরা তা ফিলিস্তিনে বাস্তব করতে পারে-যদি তারা পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের ধারণা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে।”
অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে একটি ‘প্যালেস্টাইন কমনওয়েলথ’ ধারনার মধ্য দিয়ে গিয়ে একক রাষ্ট্রের অধীনে দুই জাতিসত্তা শান্তিপূর্ণভাবে যার যার সংস্কৃতি, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতাকে লালন করবে একই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে। যা একজন কবির দৃষ্টিভঙ্গি হলেও অসম্ভব কোন প্রকল্প ছিলো না। তবে, রবীন্দ্রনাথের এই ধারণা প্রকল্পেরও সমালোচনা ও বিকল্প আছে। তবে ১৯৪৭ সালের বেলফোর ঘোষণারও দুই দশক আগে যেই প্রজ্ঞা নিয়ে এই দুই জাতির ভবিষৎ সমস্যা ও সমাধান কল্পনা করে গেছেন তা আজও বিস্ময় জাগানিয়া।
লেখক- জাকির হোসেন
তথ্যসূত্র: NewsRoomIndia, Rashtrochinta, Jewish Telegraphic Agency


