Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬

আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস

আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস
আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস

সিনেমা ও আর্জেন্টিনা

চলচ্চিত্র জগতের এক শক্তিশালী নাম আর্জেন্টিনা। দেশটি স্প্যানিশ গোয়া চলচ্চিত্র পুরস্কারে এখন পর্যন্ত ১৮টি পুরস্কার অর্জন করেছে, যা স্প্যানিশ ভাষার চলচ্চিত্রের মধ্যে যে কোনো লাতিন আমেরিকান দেশের হয়ে সর্বোচ্চ। এছাড়া আর্জেন্টিনাই প্রথম লাতিন আমেরিকান দেশ, যারা সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে দুটি অস্কার জিতেছে। প্রথমে ‘দ্য অফিসিয়াল স্টোরি’ (১৯৮৫) এবং পরে ‘দ্য সিক্রেট ইন দেয়ার আইজ’ (২০০৯) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দুই চলচ্চিত্রেরই চিত্রগ্রাহক ছিলেন একই ব্যক্তি যার নাম ফেলিক্স মন্টি। এই দীর্ঘ লেখায় আজ জানা যাক আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস ও দেশটির সিনেমার মূল উপাদান ও ক্রমধারা সম্পর্কে।

আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস
স্প্যানিশ গোয়া চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান পুরস্কার

আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্র শিল্পের শুরু থেকেই নির্মাতারা দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে তাদের কাজের মাধ্যমে তুলে ধরতে আগ্রহী ছিলেন। দেশটির প্রথম চলচ্চিত্র ‘লা বান্দেরা আর্জেন্টিনা’ (১৮৯৭) থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আলোচিত ‘এল ক্লান’ পর্যন্ত, আর্জেন্টিনার সিনেমায় রাজনীতি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থিত থেকেছে।

শুধু নির্মাণশৈলী নয়, অভিনয়শিল্পী তৈরিতেও আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত। ‘ইভিতা’ চলচ্চিত্রের জন্য শিল্পী বাছাইয়ের সময় পরিচালক অ্যালান পার্কার বলেছিলেন, আর্জেন্টিনার অডিশনে অংশ নেওয়া অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন।

আর্জেন্টিনার প্রথম সিনেমা

১৮৯৬ সালে ইউজিন পাই (Eugene Py) নামের এক আলোকচিত্রী তাঁর দুই নিয়োগকর্তা অঁরি লাপাজ এবং ম্যাক্স গ্লুকসমান-এর সঙ্গে বুয়েনস আইরেসের ওদেওন থিয়েটারে ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিত লুমিয়ের সিনেমাটোগ্রাফের প্রথম প্রদর্শনী দেখার সুযোগ পান। সে সময় তাঁরা ‘কাসা লাপাজ’ নামের একটি ফটোগ্রাফি সরঞ্জামের দোকানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এই অভিজ্ঞতায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা দ্রুত ফ্রান্স থেকে একটি গোমোঁ (Gaumont) ক্যামেরা ও অন্যান্য চলচ্চিত্র সরঞ্জাম আমদানি করেন। এরপর ইউজিন পাই নির্মাণ করেন আর্জেন্টিনার প্রথম চলচ্চিত্র লা বান্দেরা আর্জেন্টিনা’ (১৮৯৭)। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রা শুরু হয়।

আর্জেন্টাইন সিনেমার স্বর্ণযুগ

আর্জেন্টাইন সিনেমার স্বর্ণযুগ ধরা হয় ১৯৩০-এর দশক থেকে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত সময়কে। এই সময়ে হলিউডের প্রভাব দেশটির চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করে। তখনকার জনপ্রিয় তারকাদের মধ্যে ছিলেন লুইস সান্দ্রিনি, কার্লোস গার্দেল, আরমান্দো বো এবং লোলিতা তোরেস।

তবে তাঁদের মধ্যেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মির্থা লেগ্রান্দ (জন্ম ১৯২৭)। তিনি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন উভয় ক্ষেত্রেই কিংবদন্তি মর্যাদা অর্জন করেন। তাঁর জনপ্রিয় টক শো ‘আলমোরসান্দো কন মির্থা লেগ্রান্দ’ (মির্থা লেগ্রান্দের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ) তাঁকে আর্জেন্টিনার অন্যতম পরিচিত টিভি ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

৩৬টি চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং অসংখ্য টেলিভিশন পুরস্কার অর্জনের পরও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন, যা তাঁকে আর্জেন্টাইন বিনোদন জগতের এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

হলিউডকে অনুপ্রাণিত করেছিল আর্জেন্টিনা

আর্জেন্টিনার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য একসময় হলিউডকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। লাতিন আমেরিকা সফরের অংশ হিসেবে আর্জেন্টিনায় শুভেচ্ছা সফরে এসে ওয়াল্ট ডিজনি আর্জেন্টিনার সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হন। সেই অভিজ্ঞতার ফল হিসেবে নির্মিত হয় ডিজনির জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘সালুদোস আমিগোস’ (১৯৪২) এবং ‘দ্য থ্রি ক্যাবালেরোস’ (১৯৪৪)।

সেই সময় বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার নানা সাংস্কৃতিক উপাদান, বিশেষ করে ট্যাঙ্গো, ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ট্যাঙ্গো কিংবদন্তি কার্লোস গার্দেল অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোও দর্শকদের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলেছিল। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এল দিয়া কে মে কিয়েরাস’ (১৯৩৫), যার অর্থ ‘যেদিন তুমি আমাকে ভালোবাসবে’। একই বছর কলম্বিয়ায় এক বিমান দুর্ঘটনায় গার্দেলের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় এবং আরও বেশি আবেগঘন তোলে সিনেমাটিকে।  

আর্জেন্টাইন সংস্কৃতির প্রভাব হলিউডে কতটা গভীর ছিল, তার আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় ‘দ্য ফোর হর্সমেন অব দ্য অ্যাপোক্যালিপস’ (১৯২১) চলচ্চিত্রে। ছবিটিতে কিংবদন্তি অভিনেতা রুডলফ ভ্যালেনটিনোকে ঐতিহ্যবাহী গাউচো পোশাকে দেখা যায়। সহ-অভিনেত্রী বিয়াট্রিস ডোমিঙ্গেজ-এর সঙ্গে তাঁর ট্যাঙ্গো নৃত্যের দৃশ্যটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং উত্তর আমেরিকায় ট্যাঙ্গোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আর্জেন্টাইন ইরোটিকা সিনেমা ধারা

১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের ‘নিউ সিনেমা’ যুগে পরিচালক আরমান্দো বো তাঁর নিজস্ব স্বতন্ত্র ও সাহসী চলচ্চিত্রভাষা গড়ে তোলেন। এই ধারার কেন্দ্রে ছিলেন তাঁর মিউজ ও অভিনেত্রী ইসাবেল সারলি, যিনি ‘লা কোকা’ নামেও পরিচিত ছিলেন।

আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস
অভিনেত্রী ইসাবেল সারলি | ছবি: ইন্টারনেট

এক ধারাবাহিকতায় আরমান্দো বো অভিনেত্রী ইসাবেল সারলিকে নিয়ে মোট ২৭টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেগুলোর বিষয়বস্তু ছিল যৌনতা ও মানবিক আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে। যদিও অনেক সমালোচক এসব চলচ্চিত্রকে ‘সফট-পর্ন’ ঘরানার বলে অভিহিত করেছেন, তবুও এগুলো নারীদেরকে উপস্থাপনে এক নতুন ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিল। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে নারীকেই সক্রিয় ও প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে দেখানো হতো, যা তৎকালীন সামাজিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

এই ধারার অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্র ফুয়েগো’ (Fuego/Fire), যা ১৯৬৯ সালে মুক্তি পায়। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রটি পুনরুদ্ধার (রেস্টোরেশন) করা হয় এবং ২০১৬ সালে লন্ডনের বারবিকান সেন্টারে অনুষ্ঠিত “Cheap Thrills: Trash, Movies and the Art of Transgression” চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়।

ছবিটিতে ইসাবেল সারলি এমন এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি প্রবল যৌন আকাঙ্ক্ষা ও ব্যক্তিগত মানসিক সংকটের মধ্যে সংগ্রাম করেন। সাহসী বিষয়বস্তু এবং প্রচলিত সামাজিক মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কারণে চলচ্চিত্রটি আর্জেন্টাইন সিনেমার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

বুদ্ধিবৃত্তিক সিনেমাধারা

১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে লিওপোলদো তোরে নিলসন আর্জেন্টাইন সিনেমায় এক ভিন্নধর্মী বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে মানব অস্তিত্বের সংকট, সামাজিক ভণ্ডামি এবং ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতার মতো বিষয়গুলো গভীরভাবে উঠে আসে। এ কারণে তাঁর কাজকে প্রায়ই ইতালীয় পরিচালক মাইকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি-র চলচ্চিত্র এবং দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্র-এর প্রজন্মের অস্তিত্ববাদী ভাবধারার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র লা কাসা দেল আঞ্জেল’ (La Casa del Ángel, ১৯৫৭), যা তাঁর স্ত্রী বিয়াত্রিস গুইদো-র একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। হালকা ভৌতিক আবহ ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য ছবিটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায় এবং তোরে নিলসনের আন্তর্জাতিক পরিচিতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯২০-এর দশকের আর্জেন্টিনাকে পটভূমি করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে এমন এক সমাজকে দেখানো হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক বিরোধ মেটানো হতো যুদ্ধের মাধ্যমে এবং নারীদেরকে সরল, নিষ্পাপ ও অনুগত থাকার প্রত্যাশা করা হতো। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে আনা (অভিনয়ে এলসা দানিয়েল) নামের এক কিশোরী, যে কঠোর, দমনমূলক ও ভণ্ডামিপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠে।

কৈশোরে পৌঁছে যখন আনা যৌনতা ও বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করে, তখন তার নিষ্পাপ শৈশবের অবসান ঘটে। চলচ্চিত্রজুড়ে বিরাজমান দমবন্ধ করা পরিবেশ, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক দ্বন্দ্ব এক অনন্য শিল্পগুণে ফুটে উঠেছে।

অনেক সমালোচকের মতে, লা কাসা দেল আঞ্জেল’ তোরে নিলসনের শ্রেষ্ঠ কাজ এবং চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীর এক অসাধারণ উদাহরণ। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল এবং গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিল।

ফার্নান্দো ‘পিনো’ সোলানাস

১৯৬০-এর দশকে আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ফার্নান্দো ‘পিনো’ সোলানাস। রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক বাস্তবতা ছিল তাঁর কাজের মূল উপজীব্য। তাঁর তিন পর্বের মহাকাব্যিক প্রামাণ্যচিত্র লা ওরা দে লোস ওর্নোস’ (La Hora de los Hornos, ১৯৬৮) বা দ্য আওয়ার অব দ্য ফার্নেসেস’ তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীতে মেমোরিয়া দেল সাকেও’ (Memoria del Saqueo, ২০০৪) বা ‘মেমোরিজ অব আ রায়ট’-এও তিনি সামাজিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্রীয় সংকটের বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

সোলানাস এতটাই রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ সিনেমা নির্মাণ করতো যাতে দর্শক তাঁর সিনেমার দৃশ্যের অভিঘাত শারীরিকভাবে অনুভব করতে পারে। তবে আর্জেন্টিনার ইতিহাসে ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এসব বিষয় এড়িয়ে যাওয়া কোনো সংবেদনশীল নির্মাতার পক্ষেই সম্ভব ছিল না।

তবে সোলানাস তাঁর ১৯৮৮ সালের ‘সুর’ (Sur/The South)-চলচ্চিত্রে আরও পরিণত ও শিল্পসম্মত গল্প বলেছেন। ছবিতে মিগেল আঞ্জেল সোলা অভিনয় করেছেন ফ্লোরেয়াল এচেগোয়েন চরিত্রে, লিতো ক্রুস ছিলেন এল নেগ্রো, আর সুসু পেকোরারো অভিনয় করেন রোসি এচেগোয়েন চরিত্রে।  

গল্পটি এমন এক রাজনৈতিক বন্দিকে ঘিরে, যিনি ১৯৮৩ সালে সামরিক একনায়কতন্ত্রের পতন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর কারামুক্ত হন। দীর্ঘ বন্দিজীবনের পর ফ্লোরেয়াল বাইরের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সংগ্রাম করতে থাকেন। তাঁর স্ত্রী নতুন জীবন শুরু করেন। এদিকে তাঁর নিহত বন্ধু ও সহযোদ্ধা এল নেগ্রো এক অতিলৌকিক উপস্থিতি হয়ে ফিরে আসেন এবং তাকে অতীতের মুখোমুখি হতে বাধ্য করেন।

স্বপ্ন, স্মৃতি এবং ম্যাজিক রিয়ালিজম-এর মিশেলে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে ফ্লোরেয়াল রাতভর শহরের পথে ঘুরে বেড়ান, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সঙ্গে দেখা করেন এবং নিজের ক্ষোভ, বেদনা ও অপূর্ণতার মুখোমুখি হন। এই যাত্রা শেষ পর্যন্ত তাকে নতুন জীবনের সূচনার দিকে নিয়ে যায়।

অনেক রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের বিপরীতে ‘সুর’-এ যে রাজনৈতিক বক্তব্য রয়েছে, তা কখনো দর্শকের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। বরং মানবিক আবেগ, স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত ক্ষতকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে চলচ্চিত্রটি একাধারে হৃদয়স্পর্শী এবং শিল্পমানসম্পন্ন হয়ে উঠেছে।

কান উৎসবে আর্জেন্টিনা

সুর মুক্তির পর ১৯৮৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম দ’র-এর জন্য মনোনীত হয় এবং সোলানাস সেরা পরিচালক (Best Director) পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া চলচ্চিত্রটি হাভানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গ্র্যান্ড কোরাল এবং ফ্ল্যান্ডার্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জর্জ দেলরু পুরস্কার লাভ করে।

চমৎকার পরিচালনা, শক্তিশালী চিত্রগ্রহণ এবং কিংবদন্তি সুরকার আস্তর পিয়াজ্জোলার অসাধারণ সংগীতের সমন্বয়ে সুর’ আর্জেন্টাইন চলচ্চিত্রের এক অনন্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নয়, বরং আর্জেন্টিনার মানুষ, সংস্কৃতি ও সংগীতের প্রতি সোলানাসের গভীর ভালোবাসারও এক শিল্পসম্মত প্রকাশ।

রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে সিনেমা

আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরার ক্ষেত্রে হেক্টর অলিভেরা ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তিনি ১৯৭৪ সালে নির্মিত লা পাতাগোনিয়া রেবেলদে’ (La Patagonia Rebelde) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ঐতিহাসিক এই নাট্যচিত্রটি ১৯২০-এর দশকের শুরুতে সান্তা ক্রুজ প্রদেশে সংঘটিত শ্রমিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর নির্মম দমন-পীড়নের বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

তবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত চলা সামরিক শাসনের সময় সেন্সরশিপ ক্রমেই কঠোর হয়ে ওঠে। ফলে অলিভেরা সরাসরি রাজনৈতিক সমালোচনার পরিবর্তে রূপক, ব্যঙ্গ ও প্রতীকের মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরতে শুরু করেন।

এই সময়েই তিনি নাট্যকার রোবের্তো কোসা-র বিখ্যাত নাটক লা নোনা’ (La Nona, ১৯৭৯) বা ‘দাদী’ অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এটি ছিল তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ও অন্ধকার হাস্যরসে ভরপুর একটি কাজ, যা অনেকের মতে আর্জেন্টিনার ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ এবং অর্থনৈতিক সংকটের প্রতীকী উপস্থাপনা।

পরবর্তীতে লেখক ওসভালদো সোরিয়ানো-র সঙ্গে তাঁর সফল সহযোগিতার ফলে দুটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়- নো আবরা মাস পেনা নি অলবিদো’ (No Habrá Más Pena ni Olvido, ১৯৮৩) এবং ‘উনা সোমব্রা ইয়া প্রোন্তো সেরাস’ (Una Sombra Ya Pronto Serás, ১৯৯৪)।

এর মধ্যে ‘নো আবরা মাস পেনা নি অলবিদো’, যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘Funny Dirty Little War’ নামে পরিচিত। এটি আর্জেন্টাইন রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ছবিটি প্রযোজনা করেন ফার্নান্দো আয়ালা ও লুইস ও. রেপেত্তো, এবং এতে অভিনয় করেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অভিনেতা ফেদেরিকো লুপ্পি, মিগেল আঞ্জেল সোলা, উলিসেস দুমন্ত, হেক্টর বিদোন্দে ও ভিক্টর লাপ্লাসে। এতগুলো অভিনয়শিল্পীকে একসঙ্গে পর্দায় দেখা আর্জেন্টাইন সিনেমায় বিরল ঘটনা যা সম্ভব করে তুলেছেন হেক্টর অলিভেরা।  

গল্প

চলচ্চিত্রটির পটভূমি মধ্য আর্জেন্টিনার কলোনিয়া ভেলা নামক এক কাল্পনিক গ্রামীণ জনপদকে নিয়ে। গল্পে দেখা যায়, জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ডেপুটি মেয়র ফুয়েন্তেস (ফেদেরিকো লুপ্পি)-কে সরিয়ে দিতে স্থানীয় মেয়র, এক পেরোনিস্ট রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা ষড়যন্ত্র করেন। মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করা হলে ফুয়েন্তেস সমর্থকদের নিয়ে টাউন হলে ব্যারিকেড গড়ে তোলেন।

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ, স্থানীয় রাজনীতিক, কুখ্যাত আর্জেন্টাইন অ্যান্টি-কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স (AAA), বিভ্রান্ত বামপন্থী গেরিলা তরুণ এবং নানা স্বার্থান্বেষী পক্ষ নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ফলে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খল, হাস্যকর এবং একই সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভরা এক পরিস্থিতি।

রসিকতা, ব্যঙ্গ এবং মানব চরিত্রের দুর্বলতা ও স্বার্থপরতাকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চলচ্চিত্রটি আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। অনেক সমালোচকের মতে, এটি এমন এক চলচ্চিত্র যা হাস্যরসের আড়ালে আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক জীবনের জটিলতা, বিভাজন এবং ক্ষমতার লড়াইকে অসাধারণ দক্ষতায় উপস্থাপন করেছে।

স্বৈরশাসন-পরবর্তী আর্জেন্টাইন সিনেমা

১৯৮৩ সালে সামরিক একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর আর্জেন্টিনায় যে সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ ঘটে, সেটিকে বলা হয় এল ডেস্টাপে। আক্ষরিক অর্থে “উন্মোচন” বা “খোলামেলা হয়ে ওঠা”। বাস্তবে এটি ছিল বহু বছর ধরে দমিয়ে রাখা স্মৃতি, ক্ষোভ ও অভিজ্ঞতার এক প্রবল শিল্পীসুলভ বিস্ফোরণ।

এই সময়ের অনেক চলচ্চিত্র “ডার্টি ওয়ার” বা সামরিক দমন-পীড়নের যুগের মানসিক ক্ষতকে মোকাবিলা করার এক ধরনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত শুদ্ধিকরণ হয়ে ওঠে। নির্বাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত হয় লোস ডিআস দে হুনিও (Los Días de Junio) (১৯৮৫, পরিচালক আলবের্তো ফিশারমান), আবার সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটকে রূপক ও উপপাঠের মাধ্যমে তুলে ধরে Apartment Zero (১৯৮৮)।

একই সময়ে Camila (১৯৮৪), পরিচালনা করেছেন মারিয়া লুইসা বেমবের্গ, অতীতের এক ঐতিহাসিক প্রেমকাহিনির ভেতর দিয়ে ক্ষমতা, ধর্ম, নারীস্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মতো সমসাময়িক প্রশ্নগুলোকে অনুসন্ধান করে। ছবির পটভূমি ছিল হুয়ান মানুয়েল দে রোসাস-এর শাসনকাল (১৭৯৩–১৮৭৭), কিন্তু এর আলোচ্য বিষয় ছিল সমকালীন আর্জেন্টিনার বাস্তবতাও।

প্রথম অস্কার জয়

এই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রগুলোর একটি হলো লা ইসতোরিয়া ওফিসিয়াল (La Historia Oficial) (১৯৮৫), পরিচালনা করেছেন লুইস পুয়েনসো। চলচ্চিত্রটি এক মায়ের যন্ত্রণাময় অনুসন্ধানের গল্প, যিনি তাঁর দত্তক নেওয়া কন্যার জৈবিক মাকে খুঁজতে গিয়ে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেন যে শিশুটি সম্ভবত “নিখোঁজ” রাজনৈতিক বন্দিদের কারও সন্তান।

আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস

নরমা আলেয়ান্দ্রো এবং হেক্টর আলতেরিও অভিনীত এই অসাধারণ চলচ্চিত্রটি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের প্রথম অস্কারজয়ী সিনেমা যা অস্কারে বেস্ট ফরেন ল্যাংগুইজ ফিল্ম বিভাগে অস্কার পায়। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্জেন্টাইন সিনেমাকে নতুন মর্যাদা এনে দেয়।

স্বৈরশাসন-পরবর্তী এই চলচ্চিত্রধারা শুধু রাজনৈতিক স্মৃতি পুনরুদ্ধার করেনি; এটি আর্জেন্টিনার সমাজকে নিজেদের অতীতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সত্যের প্রশ্নকে সংস্কৃতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল।

স্বৈরশাসনের বিভীষিকা নিয়ে লা আমিগা

সামরিক শাসনামলের নির্মম বাস্তবতা ও “ডার্টি ওয়ার”-এর ক্ষত নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে জ্যানিন মিরাপফেল পরিচালিত লা আমিগা’ (La Amiga, ১৯৮৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 

চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী লিভ উলম্যান, পাশাপাশি সিপে লিনকোভস্কি, ফেদেরিকো লুপ্পি, ভিক্টর লাপ্লাসে এবং লিতো ক্রুস। ছবিটি দুই নারীর বন্ধুত্ব, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং স্বৈরশাসনের মানবিক মূল্য নিয়ে গভীর আবেগময় এক কাহিনি তুলে ধরে।

চলচ্চিত্রটির স্প্যানিশ সংস্করণে লিভ উলম্যানের কণ্ঠ ডাব করেন অভিনেত্রী বারবারা মুজিকা। ডাবিংটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দক্ষতার সঙ্গে করা হলেও উলম্যান এতে অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর মতে, একজন অভিনেতার কণ্ঠ তার অভিনয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই নিজের কণ্ঠের পরিবর্তে অন্য কারও কণ্ঠ ব্যবহৃত হওয়ায় তাঁর অভিনয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে গিয়েছিল।

তবে এই বিতর্ক চলচ্চিত্রটির সাফল্যকে ম্লান করতে পারেনি। ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য লিভ উলম্যান এবং সিপে লিনকোভস্কি যৌথভাবে ১৯৮৮ সালের সান সেবাস্তিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন।

এছাড়াও লা আমিগা  অর্জন করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা। চলচ্চিত্রটি আর্জেন্টাইন ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ডস-এ সিলভার কন্ডর পুরস্কার জেতে এবং পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পিস ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

রাজনৈতিক নিপীড়নের ব্যক্তিগত ও মানবিক প্রভাবকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরার কারণে লা আমিগা  আজও আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসন-পরবর্তী চলচ্চিত্রধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

আর্জেন্টাইন নিউ ওয়েভ সিনেমার উত্থান

১৯৯০-এর দশকে আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, যা ‘নিউ আর্জেন্টাইন সিনেমা’ (New Argentine Cinema) নামে পরিচিত। এই সময়ে স্বল্প বাজেটের স্বাধীন চলচ্চিত্র, নতুন নির্মাতা এবং ভিন্নধর্মী গল্প বলার ধারা ব্যাপকভাবে বিকশিত হতে থাকে। রাজনৈতিক ইতিহাসের ভার থেকে বেরিয়ে এসে নির্মাতারা মানবমন, পরিচয়, অস্তিত্ব (সংকট) এবং সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্বেষণ করতে শুরু করেন।

এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ছিলেন এলিসেও সুবিয়েলা। তাঁর ১৯৮৬ সালের আলোচিত চলচ্চিত্র ম্যান ফেসিং সাউথইস্ট’-এর পর তিনি নির্মাণ করেন এল লাদো ওসকুরো দেল কোরাসোন’ (The Dark Side of the Heart, ১৯৯২)। কবিতাময় ভাষা, প্রেম এবং অস্তিত্ববাদী ভাবনার মিশেলে চলচ্চিত্রটি আর্জেন্টাইন আর্ট-সিনেমার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে ওঠে।

একই সময়ে পরিচালক আদোলফো আরিস্তারাইন নির্মিত ‘আ প্লেস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ (A Place in the World, ১৯৯২) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং অস্কারের জন্য মনোনীত হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিস্ফোরণ

নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে আর্জেন্টাইন সিনেমা আন্তর্জাতিক দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক অসাধারণ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে যার নাম ‘নাইন কুইন্স’ (Nueve Reinas/Nine Queens, ২০০০)।

চলচ্চিত্রটির নির্মাতা ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান পরিচালক ফাবিয়ান বেলিনস্কি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০০৬ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলোতে একটি বিজ্ঞাপনের কাস্টিংয়ের কাজ করার সময় মাত্র ৪৭ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর অকালমৃত্যু আর্জেন্টাইন চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বেলিনস্কির লেখা ও পরিচালনায় নির্মিত নাইন কুইন্স প্রযোজনা করেন পাবলো বসি, চিত্রগ্রহণ করেন মার্সেলো কামোরিনো, সম্পাদনা করেন সের্হিও জোত্তোলা এবং সংগীত পরিচালনা করেন সেসার লের্নার।

চলচ্চিত্রটি একই সঙ্গে একটি ক্রাইম থ্রিলার, হেইস্ট ফিল্ম এবং ডার্ক কমেডি। এর বুদ্ধিদীপ্ত চিত্রনাট্য, ধারাবাহিক মোড় পরিবর্তন এবং সূক্ষ্ম হাস্যরস দর্শকদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চমকে রাখে।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে হুয়ান (গাস্তোন পাওলস), একজন তরুণ প্রতারক, যিনি একটি ছোটখাটো প্রতারণার সময় অভিজ্ঞ কন-ম্যান মার্কোস (রিকার্দো দারিন)-এর নজরে পড়েন। মার্কোস তাকে প্রস্তাব দেন একসঙ্গে কাজ করার। এরপর তারা একটি মূল্যবান ডাকটিকিট সংগ্রহশালাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের প্রতারণার পরিকল্পনায় জড়িয়ে পড়ে।

চলচ্চিত্রটি শুধু বাণিজ্যিকভাবেই সফল হয়নি, বরং রিকার্দো দারিনকে আন্তর্জাতিক তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এর নিখুঁত নির্মাণ, চতুর সংলাপ এবং একের পর এক অপ্রত্যাশিত মোড়ের কারণে নাইন কুইন্স  আজ আর্জেন্টাইন সিনেমার আধুনিক ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়।  

মুক্তির পর চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কার মিলিয়ে মোট ২১টি পুরস্কার অর্জন করে এবং এখনও বিশ্বজুড়ে সেরা প্রতারণাভিত্তিক (con artist) চলচ্চিত্রগুলোর অন্যতম হিসেবে প্রশংসিত হয়।

পোস্ট-পলিটিক্যাল আর্জেন্টাইন সুররিয়ালিজম

এই পর্যায়ে এসে আর্জেন্টাইন সিনেমায় নতুন এক ধারা তৈরি করেন লুক্রেসিয়া মার্টেল। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে বরং সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, পরিবেশ, শব্দ ও দৈনন্দিন জীবনের অসামঞ্জস্যের মাধ্যমে সমাজ ও ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করে। এই কারণে তিনি সমসাময়িক অনেক নির্মাতার তুলনায় আরও নান্দনিক ও পরোক্ষ চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করেন।

তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ লা সিয়েনাগা’ (La Ciénaga, ২০০১) বা ‘দ্য সোয়াম্প’, আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিমের শহর সালতা-তে গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় একটি অবক্ষয়িত মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প তুলে ধরে। পরিবারটি তাদের পুরোনো, জরাজীর্ণ বাড়িতে ছুটির সময় কাটাতে গিয়ে ধীরে ধীরে মানসিক ও সামাজিকভাবে ভেঙে পড়ে।

চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন মার্সেদেস মোরান, গ্রাসিয়েলা বর্গেস এবং মার্তিন আদেমিয়ান। মার্টেলের নিজস্ব চিত্রনাট্যে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি আপাতদৃষ্টিতে ধীর ও স্থির মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর উত্তেজনা, অস্বস্তি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের তীব্র প্রতিচ্ছবি।

‘লা সিয়েনাগা’ আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক ও সামাজিক টানাপোড়েনকে সরাসরি না বলে পরিবেশ, সম্পর্কের ভাঙন এবং দৈনন্দিন জীবনের বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে প্রকাশ করে। পরিবারটির ভেতরের ভণ্ডামি, অলসতা এবং আত্মতুষ্টি ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিক অবক্ষয়ের চিত্র তৈরি করে, যা পুরো সমাজের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এই চলচ্চিত্রটি আর্জেন্টাইন সিনেমায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে যেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য আর সরাসরি উচ্চারণে নয়, বরং নীরবতা, পরিবেশ এবং ইঙ্গিতের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই সূক্ষ্ম অথচ শক্তিশালী চলচ্চিত্রভাষার কারণে লা সিয়েনাগাকে আজ আধুনিক আর্জেন্টাইন সিনেমার এক মাস্টারপিস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জামা: উপনিবেশিক অস্তিত্বের স্বপ্নভঙ্গের চিত্র

‘দ্য হোলি গার্ল’ (২০০৪) এবং মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘দ্য হেডলেস ওম্যান’ (২০০৮)-এর পর পরিচালক লুক্রেসিয়া মার্টেল সাহিত্যনির্ভর এক নতুন প্রকল্পে মনোনিবেশ করেন। তিনি লেখক অ্যান্টোনিও দি বেনেদেত্তো-র উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন একটি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র- ‘জামা’ (Zama, ২০১৭)-যা সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও ধীর অথচ গভীর চলচ্চিত্রভাষার এক অনন্য উদাহরণ।

চলচ্চিত্রটির পটভূমি ১৮শ শতকের শেষভাগে, যখন স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিস্তৃত অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। গল্পটি সেট করা হয়েছে প্যারাগুয়ের এক বিশাল জলাভূমি অঞ্চলে, যেখানে এক অদ্ভুত নির্জনতা, অবক্ষয় এবং অনিশ্চয়তা সবকিছুকে ঘিরে রাখে।

কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছেন ডন দিয়েগো দে জামা (ড্যানিয়েল হিমেনেস কাচো)। তিনি ক্রাউন বা রাজশক্তির একজন বিচারক ও কর্মকর্তা, যিনি এক প্রায় “ঈশ্বরবিস্মৃত” প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত। তার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা হলো পুনরায় লারমা-তে বদলি হওয়া, যেখানে তার স্ত্রী ও সন্তানরা বসবাস করে।

কিন্তু সময় যত এগোয়, তার সেই প্রত্যাবর্তনের আশা ততই অনিশ্চিত ও দূরবর্তী হয়ে ওঠে। চারপাশের পরিবেশ ক্রমশ অবক্ষয়, স্থবিরতা এবং এক অদৃশ্য ভয়ের আবহে পূর্ণ হয়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে জামা এক ধরনের মানসিক ও অস্তিত্বগত সংকটে ডুবে যায়-এক “দুঃস্বপ্নময় স্থবির জীবন”-এর মধ্যে আটকে পড়ে, যেখানে বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। সে অপেক্ষা করে, কিন্তু তার প্রতীক্ষা কখনোই পূর্ণ হয় না; বরং তা আরও দীর্ঘ, আরও অর্থহীন হয়ে ওঠে।

লুক্রেসিয়া মার্টেল নিজেই এই চলচ্চিত্রের শৈলী সম্পর্কে বলেন-“আমি ফ্যান্টাস্টিক উপাদান ব্যবহার করি, কিন্তু এর সাথে ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।”

‘জামা তাই শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র নয়; এটি ক্ষমতা, উপনিবেশ, পরিচয় এবং মানব অস্তিত্বের এক গভীর, অস্বস্তিকর ও ধীরগতির ধ্যানচিত্র যেখানে প্রতীক্ষা নিজেই প্রধান ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়।

আর্জেন্টাইন ব্ল্যাক হিউমারের সূক্ষ্ম শিল্প

রিকার্ডো দারিন সম্ভবত তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতির বড় অংশই অর্জন করেছেন নাইন কুইন্স’ (২০০০)-এর বিশাল সাফল্যের মাধ্যমে। এরপর থেকে তিনি আর্জেন্টাইন ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। তিনি কাজ করেছেন খ্যাতনামা পরিচালক পাবলো ট্রাপেরো ও ফার্নান্দো ত্রুয়েবার সঙ্গে, পাশাপাশি অভিনয় করেছেন অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য সিক্রেট ইন দেয়ার আইজ’ (2009)-এ, যার পরিচালক ছিলেন হুয়ান হোসে কাম্পানেলা।

এই পর্যায়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দারিনের দুটি চলচ্চিত্র-উন কুয়েন্তো চিনো’ (Un Cuento Chino, 2011), যা ইংরেজিতে Chinese Takeaway নামে পরিচিত, পরিচালনা করেছেন সেবাস্তিয়ান বোর্নেস্তেইন; এবং ‘ওয়াইল্ড টেলস’ (Relatos Salvajes, 2014), পরিচালনা করেছেন দামিয়ান সিফ্রন।

দারিনের অভিনয়ের অন্যতম শক্তি হলো সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের দুর্বলতা এবং দৈনন্দিন হাস্যরসকে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তোলা। তিনি স্বাভাবিকভাবেই কমেডির জন্য উপযুক্ত অভিনেতা। এটি তিনি প্রথমবার প্রমাণ করেন নাইন কুইন্স-এ, যেখানে তাঁর ডেডপ্যান এক্সপ্রেশন এবং নিখুঁত কমিক টাইমিং দর্শকদের মুগ্ধ করে।

Un Cuento Chino-তে তিনি এক একাকী, খিটখিটে কিন্তু মানবিক চরিত্রে অভিনয় করেন, যেখানে হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নিঃসঙ্গতা ও সংযোগের আকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে Wild Tales একটি অ্যান্থোলজি ফিল্ম, যেখানে প্রতিশোধ, রাগ এবং সামাজিক অযৌক্তিকতার বিস্ফোরণ ঘটে তীব্র ব্যঙ্গ ও কালো রসিকতার মাধ্যমে-এবং দারিন সেই জগতের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠেন।

তবে দারিনকে যখন অতিরিক্ত গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক বা ক্ষমতার নাটকে ব্যবহার করা হয়, তখন তাঁর স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কিছুটা চাপা পড়ে যায়। যেমন দেখা যায় লা কোর্দিলেরা’ (The Summit, 2017) সিনেমায় যা পরিচালনা করেন সান্তিয়াগো মিত্রে।

সব মিলিয়ে রিকার্ডো দারিনের অভিনয়জগৎ আর্জেন্টাইন সিনেমার সেই বিশেষ শক্তিকে তুলে ধরে, যেখানে হাস্যরস, ব্যঙ্গ এবং মানবিক দুর্বলতা একসঙ্গে মিশে তৈরি করে এক অনন্য চলচ্চিত্রভাষা-যা আর্জেন্টাইন ব্ল্যাক হিউমারের প্রকৃত সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে।

উন কুয়েন্তো চিনো’-(Un cuento chino)

‘Chinese Take-Away’ (Un cuento chino, 2011) ছিল আর্জেন্টিনার সেই বছরের সবচেয়ে বেশি আয় করা নন-ইউএস চলচ্চিত্রগুলোর একটি। পরিচালক সেবাস্তিয়ান বোর্নেস্তেইন নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি হাস্যরস, উষ্ণতা এবং মানবিক পর্যবেক্ষণের এক অনন্য মিশ্রণ, যেখানে সাধারণ মানুষের আচরণ ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে রবার্তো (রিকার্ডো দারিন), একজন নিয়মকানুনপ্রিয় ও নিয়ন্ত্রণপছন্দ হার্ডওয়্যার দোকানের ম্যানেজার। তার জীবন এতটাই গুছানো এবং কঠোর যে সামান্য বিশৃঙ্খলাও তাকে অস্থির করে তোলে। একবার নতুন ডেলিভারির স্ক্রুগুলোর সংখ্যায় ভুল পাওয়ায় সে এমনকি মামলা করার কথাও ভাবে-যা তার চরিত্রে এক ধরনের ওসিডি-সদৃশ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।

আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস

এই নিয়ন্ত্রিত ও নিঃসঙ্গ জীবনের মধ্যেই হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা তার জীবন বদলে দেয়। সে দেখতে পায় এক চীনা যুবক জুন (ইগনাসিও হুয়াং) একটি চলন্ত গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ছে। রবার্তো নিজেকে বাধ্য মনে করে পরিস্থিতি “ঠিক” করার জন্য এবং জুনকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এর ফলে শুরু হয় এক অদ্ভুত যাত্রা। রবার্তো, যিনি মানুষের সঙ্গে আবেগগতভাবে দূরে থাকতে অভ্যস্ত এবং সম্ভাব্য প্রেমিকা মারি (মুরিয়েল সান্তা আনা)-কেও এড়িয়ে চলে, হঠাৎ করেই এক অচেনা মানুষের জীবন ও সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

ভাষাগত কোনো মিল না থাকলেও ধীরে ধীরে দুই ভিন্ন বিশ্বের মানুষ একে অপরের সঙ্গে অন্যভাবে যোগাযোগ করতে শেখে ইশারা-ইঙ্গিত, আচরণ এবং মানবিক সহমর্মিতার মাধ্যমে। এই সম্পর্কের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ তৈরি হয়, যখন রবার্তোর সংগ্রহ করা পুরনো  সংবাদপত্রের কাটিং থেকে জানা যায় এক চীনা মেয়ের গল্প, যিনি আকাশ থেকে পড়া একটি গরুর আঘাতে মারা যান। পরে বোঝা যায়, তিনি ছিলেন জুনের প্রেমিকা।

এই অদ্ভুত, ট্র্যাজিক এবং হাস্যরসাত্মক ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি ধীরে ধীরে এক গভীর মানবিক বার্তা দেয়।

উন কুয়েন্তো চিনো মূলত এক “সুইট অ্যান্ড সাওয়ার” চলচ্চিত্র-যেখানে একাকীত্ব, নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, ভাগ্য এবং মানবিক সংযোগের প্রয়োজন একসঙ্গে মিশে যায়। এটি দেখায়, ভাষা বা সংস্কৃতির পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ কীভাবে একে অপরকে অনুভব করতে এবং বোঝার চেষ্টা করতে পারে।

‘Wild Tales’ (Relatos Salvajes): আর্জেন্টাইন ব্ল্যাক কমেডির শিখর

পেড্রো আলমোদোভার-এর প্রযোজনা সংস্থা El Deseo, ও তাঁর ভাই আগুস্তিন আলমোদোভার-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে ড্যামিয়ান সিফ্রন নির্মাণ করেন অসাধারণ সংকলন চলচ্চিত্র Wild Tales’ (2014) (Relatos Salvajes)। ছয়টি পৃথক কিন্তু থিমগতভাবে সংযুক্ত স্বল্পদৈর্ঘ্য গল্পের এই অ্যান্থোলজি ফিল্মটি আর্জেন্টাইন সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। 

চলচ্চিত্রটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আয় করা আর্জেন্টাইন চলচ্চিত্র হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। এটি অস্কারের জন্য মনোনীত হয় এবং ২০১৬ সালে BAFTA-তে Best Film Not in the English Language পুরস্কার জয় করে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতেও এটি একাধিক বিভাগে পুরস্কৃত হয়ে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে।

চলচ্চিত্রটিতে একাধিক শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীর সমন্বয় দেখা যায়যেমন রিকার্দো দারিন, লিওনার্দো সবারাগলিয়া, অস্কার মার্টিনেজ, এরিকা রিভাস, রিতা কোর্তেসে, দারিও গ্র্যান্ডিনেত্তি এবং জুলিয়েটা জিলবারবার্গ। যারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ গল্পে অসাধারণ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেন।

Wild Tales মূলত এমন মানুষদের গল্প, যারা চরম মানসিক চাপ, ক্ষোভ বা অন্যায়ের মুখোমুখি হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং প্রতিশোধ, পাগলামি বা বিস্ফোরক আচরণের দিকে চলে যায়। প্রতিটি গল্পই মানব আচরণের সীমা, সামাজিক অসঙ্গতি এবং আবেগের বিস্ফোরণকে ব্যঙ্গ ও কালো রসিকতার মাধ্যমে তুলে ধরে।

পরিচালক ড্যামিয়ান সিফ্রন দর্শকদের এক ধরনের রোলারকোস্টার অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে যান যেখানে হাসি, আতঙ্ক, সহানুভূতি এবং বিস্ময় একসঙ্গে কাজ করে। তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ এবং তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গচেতনা Wild Tales-কে আধুনিক আর্জেন্টাইন সিনেমার এক অনন্য মাইলফলকে পরিণত করেছে। 

এই চলচ্চিত্রটি দেখায়-সামান্য চাপ, অবিচার বা অপমান কীভাবে সাধারণ মানুষকেও চরম প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে, এবং সেই প্রতিক্রিয়ার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সমাজের গভীর অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি।

‘দ্য সিক্রেট ইন দেয়ার আইজ’ (২০০৯)

‘দ্য সিক্রেট ইন দেয়ার আইজ’ (El Secreto de Sus Ojos) সিনেমাটি ২০১০ সালে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জয় করে। রহস্য, রোমান্স ও রাজনৈতিক নাটকের এক অনন্য সংমিশ্রণের এই পুরষ্কার পায় সিনেমাটি। এটি পরিচালনা করেন হুয়ান হোসে কাম্পানেয়া। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন রিকার্দো দারিন, সোলেদাদ ভিয়ামিল ও গিয়ের্মো ফ্রান্সেয়া।

আর্জেন্টিনার সিনেমার ইতিহাস

সিনেমাটিতে দেখানো হয় একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার গল্প। এই কর্মকর্তা বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে বই লিখতে গিয়ে অতীতের রহস্য, অপূর্ণ প্রেম এবং আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক অস্থিরতার স্মৃতির মুখোমুখি হন। এই সিনেমাটি আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্রের একটি শক্তিশালী নির্মাণ।

লাটিনো লাইফ অবলম্বনে (Latino Life).

+ posts
Share this article
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read next

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ‘মাস্টার’, এবার যুক্তরাজ্যে প্রিমিয়ার

রটারডাম ও সিডনির পর লন্ডনে ‘মাস্টার’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও জোরালো করতে যাচ্ছে…
মাস্টার

নেটফ্লিক্সের ডকুমেন্টারিতে রোনালদিনহোর উত্থান ও পতনের গল্প

মাঠের জাদুকরের অজানা অধ্যায় ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নেটফ্লিক্স নিয়ে এসেছে নতুন ডকুমেন্টারি সিরিজ “Ronaldinho: The…
রোনালদিনহো

‘লগান’ শুটিংয়ের অজানা গল্প – সিনেমায় জয়, বাস্তবে হার

লগানের শুটিংয়ে বন্ধুত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া আশুতোষ গোয়াড়িকরের ‘লগান’ শুধু একটি…
লগান

মহাজাগতিক রোমান্স নিয়ে আসছেন তানিম রহমান অংশু

স্পেস ড্রামা ও কসমিক রোমান্স ‘ন ডরাই’ নির্মাতা তানিম রহমান অংশু নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ করার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৯…
তানিম রহমান অংশু
0
Share