লগানের শুটিংয়ে বন্ধুত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প
২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া আশুতোষ গোয়াড়িকরের ‘লগান’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্রিকেট, দেশপ্রেম, প্রেম ও সংগ্রামের অনন্য মিশেলে নির্মিত এই ছবিটি যেমন দর্শকদের আবেগে নাড়া দিয়েছিল, তেমনি এর শুটিং ঘিরেও রয়েছে বহু অজানা ও চমকপ্রদ ঘটনা।
ছবির গল্পে দেখা যায়, দরিদ্র চম্পান গ্রামের কৃষকেরা ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচে অসম্ভব জয় অর্জন করে। কিন্তু বাস্তব শুটিংয়ে একদিন ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে, ভারতীয় ও ব্রিটিশ অভিনেতাদের মধ্যে আয়োজিত একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচে সহজেই জয় পায় ব্রিটিশ দল।

কচ্ছের মরুভূমিতে টানা শুটিং
গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলে মরুভূমির প্রেক্ষাপটে পুরো শুটিং হয়েছিল একটানা দীর্ঘ শিডিউলে, কোনো বড় বিরতি ছাড়াই। পরিচালক আশুতোষ গোয়াড়িকরের এই সিদ্ধান্ত তখন অনেকেই সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন। তবে এতে ছবির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হয়। প্রাথমিকভাবে ছবির প্রথম কাট ছিল প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা দীর্ঘ, যা পরে সম্পাদনার মাধ্যমে প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে নামিয়ে আনা হয়।
শুটিংয়ের সময় ভারতীয় ও ব্রিটিশ অভিনেতাদের মধ্যে এক ধরনের বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়। গল্প অনুযায়ী ব্রিটিশদের হারতে হলেও বাস্তবে তাঁদের অনেকেই ছিলেন দক্ষ ক্রিকেটার, কেউ কেউ ক্লাব ও কাউন্টি পর্যায়েও খেলেছেন। তাই তাঁরা শুটিংয়ের বাইরে একটি বাস্তব ক্রিকেট ম্যাচ খেলার দাবি তোলেন।
শেষ পর্যন্ত ২০০০ সালের ২৬ মার্চ সেই বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচের আয়োজন করা হয়। ভারতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন আমির খান। তাঁর দলে ছিলেন অভিনেতা, টেকনিশিয়ান, লাইটম্যানসহ পুরো ইউনিটের সদস্যরা। অন্যদিকে ব্রিটিশ দলে ছিলেন সিনেমায় অভিনয় করা ইংরেজ ক্রিকেটার চরিত্রের শিল্পীরা।

‘ট্রেইটর’ চরিত্র
মজার বিষয় হলো, ব্রিটিশ দলের কয়েকজন খেলোয়াড় আহত ও অনুপস্থিত থাকায় ভারতীয় দল থেকেই একজন খেলোয়াড় ধার নিতে হয়, অভিনেতা আদিত্য লখিয়াকে। তাঁকে খেলতে দেখে সহকর্মীরা মজা করে “ট্রেইটর” বলেও ডাকেন। মাঠে টস, স্কোরবোর্ড ও ধারাভাষ্য, সবকিছুই ছিল যেন একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের পরিবেশ।
ম্যাচে বাস্তবতার জয় হয়। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সমন্বয়ে গড়া ব্রিটিশ দল সহজেই জয় লাভ করে। সিনেমার কাহিনিতে যারা পরাজিত হওয়ার জন্য অভিনয় করছিল, বাস্তবে তারাই জয়ের হাসি হাসে। তবে ম্যাচ শেষে দুই পক্ষই একে অপরকে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়, যা শুটিং ইউনিটে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করে।

শুধু ক্রিকেট নয়, সেটে আরও একটি জনপ্রিয় আয়োজন ছিল টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট। ব্রিটিশ অভিনেতা ব্যারি হার্টের উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ১৬টি ডাবলস দল অংশ নেয়। প্রতিটি দলে একজন ভারতীয় ও একজন ব্রিটিশ সদস্য ছিলেন। ফাইনালে পৌঁছায় আমির খান ও তাঁর ব্রিটিশ সঙ্গীর দল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় পায় আদিত্য লখিয়া ও ক্রিস ইংল্যান্ড জুটি।
‘লগান’ নির্মাণে ব্যতিক্রমী বাজেট, শৃঙ্খলা ও কঠোর শুটিং পরিবেশ
ছবিটির নির্মাণও ছিল ব্যতিক্রমী। প্রায় ২৫ কোটি রুপির বাজেটে নির্মিত ‘লগান’ ছিল সেই সময়ের অন্যতম ব্যয়বহুল ভারতীয় চলচ্চিত্র। এতে প্রথমবার নির্বাহী প্রযোজকের দায়িত্ব পান রীনা দত্ত। ইউনিটে কঠোর সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখা হতো; এমনকি আমির খান মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি করায় শুটিং বাস তাঁকে ছাড়াই চলে যায়।

‘লগান’ শুটিং সেটে আধুনিক প্রযুক্তি ও সিঙ্ক-সাউন্ডের ব্যবহার
ছবির সেটে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও ছিল উল্লেখযোগ্য। গুজরাটের মরুভূমিতে নির্মিত চম্পান গ্রামের প্রতিটি কুঁড়েঘরে ছিল এয়ারকন্ডিশনার ও আধুনিক সুবিধা, যাতে শুটিং নির্বিঘ্নে চলতে পারে। পাশাপাশি প্রায় তিন দশক পর প্রথমবার বড় ভারতীয় চলচ্চিত্রে সিঙ্ক-সাউন্ড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
শুটিং শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস পরই ২০০১ সালের ভয়াবহ গুজরাট ভূমিকম্পে কচ্ছ অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পুরো ইউনিটকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
পরিচালক আশুতোষ গোয়াড়িকরের ‘লগান’ শুধু বক্স অফিসে সফল হয়নি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। এটি ৭৪তম অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়। আজও ‘চলে চলো’, ‘মিতওয়া’ কিংবা ‘ও রে ছোরি’র মতো গান এবং ছবির আবেগঘন গল্প দর্শকদের মনে সমানভাবে জীবন্ত।


