ম্যারাডোনার জীবনের গল্প
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি নাম ডিয়েগো ম্যারাডোনা। মাঠের জাদুকর, কোটি মানুষের আবেগের কেন্দ্র এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত এক জীবন, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ চরিত্র। আর্জেন্টিনার একটি দরিদ্র বস্তি থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে পৌঁছানোর তার গল্প যেন রূপকথাকেও হার মানায়। সেই গল্পই নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তথ্যচিত্র ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’-তে, যা নির্মাণ করেছেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ পরিচালক আসিফ কাপাডিয়া।
ম্যারাডোনাকে নিয়ে এর আগে অসংখ্য বই, প্রামাণ্যচিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মিত হলেও এই তথ্যচিত্রটি আলাদা। কারণ এটি পুরো জীবনকাহিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেনি; বরং ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সালের সময়কালকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে। এই সময়েই ম্যারাডোনা ইতালির ক্লাব নাপোলিতে যোগ দেন এবং নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করেন।

তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, নাপোলিতে ম্যারাডোনার আগমন ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ইতালির উত্তরাঞ্চলের ধনী ও শক্তিশালী ক্লাবগুলোর আধিপত্যের বিপরীতে নাপোলি ছিল অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী একটি দল। ম্যারাডোনার নেতৃত্বে সেই দল দুটি সিরি আ শিরোপা এবং একটি উয়েফা কাপ জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে। নেপলস শহরের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন মুক্তির প্রতীক।
আসিফ কাপাডিয়ার নির্মাণশৈলীর অন্যতম শক্তি হলো চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করা। তথ্যচিত্রে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন, ম্যারাডোনার ভেতরে যেন দুটি আলাদা সত্তা ছিল। একদিকে দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা স্বপ্নবাজ ও লাজুক ম্যারাডোনা। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান এক সুপারস্টার, যার চারপাশে সবসময় ঘিরে থাকে ক্ষমতা, অর্থ, রাজনীতি ও অসংখ্য স্বার্থান্বেষী মানুষ।

এই দ্বৈত সত্তার সংঘাতই তথ্যচিত্রের মূল আবেগ। ডিয়েগো চেয়েছিলেন স্বাভাবিক জীবন, পরিবার ও ভালোবাসা। কিন্তু ‘ম্যারাডোনা’ নামের আইকন তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। খ্যাতির চাপে তিনি ধীরে ধীরে নিজের ব্যক্তিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
যদিও তথ্যচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু নাপোলি, তবুও ১৯৮৬ বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। মেক্সিকো বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার দুটি গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ। ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল যেমন বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল, তেমনি একই ম্যাচে করা তার দ্বিতীয় গোলকে অনেকেই সর্বকালের সেরা গোল হিসেবে বিবেচনা করেন।
তবে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় পতনের গল্প। মাদকাসক্তি, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা, পরিবারে অশান্তি এবং ক্রমাগত মিডিয়ার নজরদারি তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। তথ্যচিত্রে তার ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙন অত্যন্ত মানবিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মাঠে অপ্রতিরোধ্য নায়ক হলেও বাস্তব জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন অসহায় এক মানুষ।

১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালি ও আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল ম্যাচও তথ্যচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল নেপলসে। সেখানে ম্যারাডোনা স্থানীয় মানুষদের স্মরণ করিয়ে দেন যে উত্তর ইতালির মানুষ কখনোই তাদের আপন করে নেয়নি। এই বক্তব্য ইতালিজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং একসময়কার জাতীয় নায়ক ধীরে ধীরে বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হন।
অবশেষে ১৯৯১ সালে কোকেইন ব্যবহারের অভিযোগে নিষিদ্ধ হন ম্যারাডোনা। এর মধ্য দিয়েই কার্যত শেষ হয়ে যায় নাপোলিতে তার স্বর্ণযুগ। তবে নির্মাতা তাকে দোষী বা নির্দোষ হিসেবে বিচার করেননি। বরং এমন একজন মানুষকে তুলে ধরেছেন, যিনি নিজের অসাধারণ প্রতিভার ভারই শেষ পর্যন্ত বহন করতে পারেননি।

‘সেনা’ ও অস্কারজয়ী ‘অ্যামি’ নির্মাণের পর আসিফ কাপাডিয়া আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা তথ্যচিত্র নির্মাতা। আর্কাইভ ফুটেজ, বাস্তব অডিও রেকর্ডিং এবং দক্ষ সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি এমন এক সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছেন, যা সাধারণ ক্রীড়া তথ্যচিত্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
২০১৯ সালের ১৪ জুন মুক্তিপ্রাপ্ত ১৩০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রটি সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। অনেকেই এটিকে শুধু ম্যারাডোনাকে নিয়ে নয়, বরং সর্বকালের সেরা ক্রীড়াভিত্তিক তথ্যচিত্রগুলোর একটি বলে মনে করেন। ফুটবলের বাইরেও খ্যাতি, সাফল্য, চাপ এবং মানবিক ট্র্যাজেডির গল্প হিসেবে ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা’ আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে।