প্রায় ১১ বছর পর নতুন অ্যালবাম নিয়ে ফিরতে যাচ্ছে ফিডব্যাক। পাঁচ দশকের সংগীতযাত্রা উদ্যাপনে তৈরি হয়েছে ছয়টি নতুন গান। পুরোনো দিনের জনপ্রিয় সুর, নতুন সংগীতায়োজন আর ব্যান্ডের দীর্ঘ পথচলা নিয়ে শুরু হচ্ছে ‘ফিডব্যাক: ফিফটি নট আউট’।
একসময় প্রিয় গান শোনার জন্য ক্যাসেটের ফিতা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চালাতে হতো। একই গান বারবার শুনতে শুনতে ফিতার ক্ষয়ে যাওয়ার গল্পও ছিল সংগীতপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। সেই সময়ের শ্রোতাদের অনেকের কাছেই ফিডব্যাক মানে ‘মেলা’, ‘মৌসুমী’, ‘চিঠি’ কিংবা ‘ফিরে এসো’। এসব গান শুনতে শুনতে কেটে গেছে কৈশোর, তারুণ্য, জীবনের কত অধ্যায়। সেই শ্রোতাদের জন্য এবার আসছে নতুন এক অপেক্ষা, প্রিয় ব্যান্ডের নতুন গান।

প্রায় ১১ বছর পর নতুন অ্যালবাম প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে ফিডব্যাক। এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে ছয়টি নতুন গান। সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ব্যান্ডটি এখন অতীতের জনপ্রিয়তাকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। নতুন গানগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত এখনই প্রকাশ করতে চান না সদস্যরা। একের পর এক গান প্রকাশ করে শ্রোতাদের চমক দেওয়ার ইচ্ছা তাঁদের।
ফিডব্যাকের এই প্রত্যাবর্তন তাই কেবল নতুন অ্যালবাম প্রকাশের খবর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঁচ দশকের স্মৃতি, বাংলা ব্যান্ড সংগীতের বদলে যাওয়া সময় এবং একদল সংগীতশিল্পীর দীর্ঘদিন ধরে গান করে যাওয়ার গল্প।
পাঁচ দশকের পথচলা, নতুন অধ্যায়
১৯৭৭ সালের দিকে যাত্রা শুরু করা ফিডব্যাক বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের পরিচিত নামগুলোর একটি। শুরুতে তাদের নাম ছিল ‘ফিডব্যাক টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি’। কয়েকজন সংগীতপ্রেমী মানুষের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই যাত্রা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।
তখনকার সংগীতজগৎ ছিল আজকের চেয়ে অনেক আলাদা। গান ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন স্ট্রিমিং কিংবা মুহূর্তে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ। ব্যান্ডগুলোকে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করতে হতো মঞ্চে গান গেয়ে, শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মধ্য দিয়ে।
ফিডব্যাকের শুরুর দিনগুলোও ছিল এমন। প্রথম দিকে জনপ্রিয় বিদেশি গান পরিবেশন করত দলটি। তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে নিয়মিত গান গাওয়ার সুযোগ পায় তারা। সপ্তাহে তিন দিন সেখানে সংগীত পরিবেশন করতেন ব্যান্ডের সদস্যরা। পরে সাধারণ শ্রোতাদের সামনে নিজেদের গান ও পরিবেশনা তুলে ধরার পথেও এগিয়ে যায় দলটি।
১৯৭৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে লিও ক্লাবের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ফিডব্যাকের প্রথম উন্মুক্ত কনসার্ট। হোটেলের মঞ্চ থেকে বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর এই অভিজ্ঞতা ব্যান্ডটির যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এরপর সময়ের সঙ্গে বেড়েছে পরিচিতি, বদলেছে সদস্য, তৈরি হয়েছে নতুন গান। কিন্তু ফিডব্যাকের যাত্রা থেমে থাকেনি। পাঁচ দশকের কাছাকাছি এসে দলটি আবারও নতুন অ্যালবামের পরিকল্পনা করছে। যেন পুরোনো দিনের শ্রোতাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছেও নিজেদের গান পৌঁছে দেওয়ার আরেকটি সুযোগ।
যে গানগুলো হয়ে উঠেছে স্মৃতি
ফিডব্যাকের কথা উঠলে ‘মেলা’র কথা আসবেই। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত এই অ্যালবাম ব্যান্ডটির জনপ্রিয়তার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়। ‘মেলায় যাই রে’ গানটি এখনো বাংলা নববর্ষের উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বৈশাখের আয়োজনে গানটি বেজে উঠলে অনেকের কাছে ফিরে আসে পরিচিত এক আনন্দের অনুভূতি।
তবে ফিডব্যাকের সংগীতভান্ডার কেবল একটি গান কিংবা একটি অ্যালবামে সীমাবদ্ধ নয়। ‘মৌসুমী’, ‘চিঠি’, ‘ময়ূরী আকাশ’, ‘ফিরে এসো’, ‘মাঝি’, ‘করি মানা’, ‘জনম দুঃখী’ ও ‘মন আজ আমার’ এমন অনেক গান শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।



কেউ এসব গানের মধ্যে খুঁজে পান প্রেমের স্মৃতি, কেউ ফিরে যান পুরোনো বন্ধুত্বের দিনে। আবার কারও কাছে এসব গান মানেই তারুণ্যের সময়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা কোনো বিশেষ মুহূর্তের কথা মনে পড়া।
১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘ফিডব্যাক’। এরপর আসে ‘উল্লাস’। ১৯৯২ সালে কলকাতার এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয় ‘জোয়ার’। পরে একে একে প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’, ‘দেহঘড়ি’, ‘বাউলিয়ানা’, ‘আনন্দ’, ‘এই শতাব্দীর ফিডব্যাক’, ‘শূন্য ২’ ও ‘এখন’।
এই অ্যালবামগুলোর মধ্য দিয়ে ফিডব্যাকের সংগীতে এসেছে নানা রকম পরিবর্তন। পপ ও রকের সঙ্গে বিভিন্ন সুরের প্রভাব মিলিয়ে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে ব্যান্ডটি। সময়ের সঙ্গে শ্রোতাদের রুচি বদলালেও পুরোনো গানগুলো ধরে রেখেছে তাদের আবেদন।
এবার সেই সংগীতভান্ডারে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন গান। পুরোনো অ্যালবামের পর নতুন এই উদ্যোগ তাই ফিডব্যাকের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
পুরোনো গান, নতুন কণ্ঠ
নতুন অ্যালবামের পাশাপাশি পুরোনো জনপ্রিয় গানগুলোও নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে ফিডব্যাকের। এসব গানে অন্য ব্যান্ডের সদস্য কিংবা একক সংগীতশিল্পীরা কণ্ঠ দিতে পারেন।
পরিকল্পনাটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের জন্য। কারণ যে গানগুলো একসময় ক্যাসেটে কিংবা সিডিতে শুনেছেন আগের প্রজন্ম, সেগুলো নতুন সংগীতায়োজনে আবার সামনে এলে তরুণ শ্রোতারাও নতুনভাবে পরিচিত হতে পারবেন।
একই সঙ্গে পুরোনো শ্রোতাদের জন্যও এটি হতে পারে পরিচিত গানের নতুন স্বাদ। মূল সুরের স্মৃতি অটুট রেখেই নতুন আয়োজন কীভাবে গানগুলোকে উপস্থাপন করে, সেটিই হবে দেখার বিষয়।
ফিডব্যাকের কি-বোর্ডশিল্পী ফোয়াদ নাসের বাবুর কাছে ব্যান্ডের এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে বড় অর্জন শ্রোতাদের ভালোবাসা। তাঁর মতে, একটি প্রতিষ্ঠানকে যেমন যত্ন নিয়ে গড়ে তুলতে হয়, তেমনি একটি ব্যান্ডকেও লালন ও সংরক্ষণ করতে হয়।
পাঁচ দশক ধরে ফিডব্যাককে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে সেই দায়বদ্ধতাই কাজ করেছে। সদস্য বদলেছে, সংগীতের ধরন বদলেছে, কিন্তু ব্যান্ডটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলেছে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় সুবর্ণজয়ন্তী
নতুন অ্যালবাম প্রকাশের পাশাপাশি ‘ফিডব্যাক: ফিফটি নট আউট’ শিরোনামে এক বছরব্যাপী আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে ব্যান্ডটি। আনুষ্ঠানিক যাত্রার ৪৯ বছর পেরিয়ে ৫০ বছরের পথে এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শ্রোতাদের সঙ্গে উদ্যাপন করতে চায় দলটি।
শুরু হবে চট্টগ্রামের কনসার্ট দিয়ে। ২০২৭ সালের অক্টোবরে, ব্যান্ডটির ৫০ বছর পূর্তির মাসে, ঢাকায় শেষ অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নানা আয়োজনের মাধ্যমে শ্রোতাদের যুক্ত করতে চায় ফিডব্যাক।
চট্টগ্রামের সঙ্গে ব্যান্ডটির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম ক্লাবের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রথম সেখানে গান গায় দলটি। পরে মুসলিম ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন জায়গায় কনসার্ট করেছে তারা। ফোয়াদ নাসের বাবুর হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ দশকের পথচলায় চট্টগ্রামে পাঁচ শতাধিক কনসার্টে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে ব্যান্ডটির।
চট্টগ্রামের শ্রোতাদের ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে বাবু জানিয়েছেন, সেখানে ফিডব্যাকের জনপ্রিয়তা অন্য জায়গার তুলনায় বেশি। ভক্তদের সঙ্গে এই সম্পর্ককে ব্যান্ডটি সব সময় বিশেষভাবে মূল্যায়ন করে।
সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আরও একটি পরিকল্পনা রয়েছে, প্রায় ২৫ মিনিটের তথ্যচিত্র নির্মাণ। এতে ব্যান্ডের সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের বক্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে দীর্ঘ সংগীতযাত্রা, সদস্যদের অভিজ্ঞতা এবং নানা সময়ের স্মৃতি।
ফোয়াদ নাসের বাবু জানিয়েছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আয়োজনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান তাঁরা। আকাশচুম্বী আয়োজনের চেয়ে গানের মধ্য দিয়ে ৫০ বছর উদ্যাপন করাই তাঁদের কাছে বড় বিষয়।
বদলেছে সময়, রয়ে গেছে গান
ফিডব্যাকের দীর্ঘ পথচলায় অনেক শিল্পী যুক্ত হয়েছেন। একসময় মাকসুদুল হকের কণ্ঠ ব্যান্ডটির জনপ্রিয়তার অন্যতম পরিচয় ছিল। পরে তিনি দল ছেড়ে নিজের সংগীতযাত্রা শুরু করেন। অন্যদিকে নতুন সদস্যদের নিয়ে এগিয়ে গেছে ফিডব্যাক।
বর্তমানে ব্যান্ডটির সদস্য লাবু রহমান, এনাম এলাহি টন্টি, রায়হান হাসান, ফোয়াদ নাসের বাবু, মোহাম্মদ দানেশ ও রবিউল আলম রিয়েল। তাঁদের হাত ধরেই পুরোনো পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে নতুন দিনের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
দীর্ঘ পথচলায় ব্যান্ডটি পেয়েছে বিভিন্ন স্বীকৃতি। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৫ সালের ‘যায়যায়দিন বেস্ট ব্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০১৭ সালের ‘আরটিভি বেস্ট ব্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’। তবে পুরস্কারের বাইরেও ব্যান্ডটির বড় অর্জন হলো, এত বছর পরও শ্রোতাদের কাছে তাদের গান পরিচিত ও প্রিয়।
একটি ব্যান্ডের পাঁচ দশক টিকে থাকা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা, একসঙ্গে কাজ করার মানসিকতা এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়ার সাহস। ফিডব্যাকের পথচলায় যেমন রয়েছে জনপ্রিয়তার সময়, তেমনি রয়েছে পরিবর্তনের নানা অধ্যায়।
এবার নতুন অ্যালবামের মধ্য দিয়ে সেই যাত্রায় যুক্ত হবে আরেকটি অধ্যায়। হয়তো নতুন গানগুলোর কোনোটি একদিন শ্রোতাদের নতুন স্মৃতির অংশ হয়ে উঠবে। হয়তো বহু বছর পর কেউ সেই গান শুনে ফিরে যাবেন জীবনের কোনো বিশেষ দিনে।
যে ব্যান্ডের পুরোনো গান এত মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে, তাদের নতুন গান ঘিরে তাই প্রত্যাশাও স্বাভাবিক। পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিডব্যাক এখন সামনে তাকাচ্ছে। পেছনে পড়ে আছে অসংখ্য গান, কনসার্ট আর শ্রোতাদের ভালোবাসা। সামনে অপেক্ষা করছে নতুন সুরের গল্প।
ফিডব্যাকের সুবর্ণজয়ন্তী তাই শুধু অতীতকে স্মরণ করার আয়োজন নয়। এটি নতুন করে শুরু করারও উপলক্ষ। পাঁচ দশক পেরিয়ে ব্যান্ডটির বার্তা যেন একটাই; গান থেমে নেই, পথচলাও নয়।









