যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অনুমোদন
প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের ১১১ বিলিয়ন ডলার (৮২.৮ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে অধিগ্রহণের প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদন এই দুই কোম্পানির একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে ওয়ার্নার ব্রাদার্স স্টুডিওটির অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এগিয়ে যেতে পারবে, যার মালিকানায় রয়েছে সিএনএন (CNN) এবং এইচবিও (HBO)। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক গণমাধ্যম শিল্পের কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
তবে প্রস্তাবিত বিক্রয় প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই নানা বিতর্কে ঘেরা ছিল। প্যারামাউন্টের করপোরেট লড়াই, গণমাধ্যম খাতে অতিরিক্ত একচেটিয়াকরণের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ-সবকিছুই এই চুক্তিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। প্যারামাউন্টের প্রধান ডেভিড এলিসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম বড় দাতাব্যক্তি ল্যারি এলিসনের ছেলে।

তবে চুক্তিটি এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। ক্যালিফোর্নিয়াসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য এখনও বিক্রয় প্রক্রিয়াটি পর্যালোচনা করছে এবং তারা চাইলে এই অধিগ্রহণ ঠেকাতে আদালতে মামলা করতে পারে।
যে কারণে অনুমোদন
নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবিত চুক্তিটি নিয়ে একটি “কঠোর ও বিস্তৃত” তদন্ত পরিচালনা করেছে এবং তাদের মতে এটি প্রতিযোগিতা বা মার্কিন ভোক্তাদের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বরং বিচার বিভাগের মতে, এই একীভূতকরণ গণমাধ্যম ও বিনোদন খাতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়াতে পারে, যা মার্কিন ভোক্তা ও কর্মীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের যেকোনো অধিগ্রহণ বিনোদন শিল্পে আরও বেশি কেন্দ্রীকরণ সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রতিযোগিতা সীমিত করতে পারে। যেমন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই শিল্পে ব্যাপক ছাঁটাই ও ব্যয়সংকোচনের ঘটনা ঘটেছে।
চলতি মাসের শুরুতে বন্টা জানান, একীভূতকরণ ঠেকাতে আনুষ্ঠানিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টার একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, পর্যালোচনা প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য নেই এবং বিষয়টি এখনও “তদন্তাধীন” রয়েছে।
তারকাদের প্রতিবাদ
গত এপ্রিল মাসে হলিউডের ১,৪০০-এরও বেশি অভিনেতা, পরিচালক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা এই একীভূতকরণের বিরোধিতা করে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন।
চিঠিতে তারা বলেন, “এর ফলে সৃজনশীল কর্মীদের জন্য সুযোগ কমে যাবে, প্রযোজনা-সংশ্লিষ্ট খাতে চাকরি হ্রাস পাবে, ব্যয় বেড়ে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের দর্শকদের জন্য পছন্দের পরিসর সংকুচিত হবে।”
স্কাইড্যান্স ২০২৫ সালে প্যারামাউন্টের সঙ্গে একীভূত হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ ছাঁটাই করে।
হলিউডের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই অধিগ্রহণের ফলে আরও চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটতে পারে এবং বড় স্টুডিওর সংখ্যা কমে যাওয়ায় ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হবে। তবে প্যারামাউন্টের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এই চুক্তি নিয়ে আশাবাদী, কারণ এর মাধ্যমে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব হবে।
প্যারামাউন্ট যাদের মালিক হবে
ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে অধিগ্রহণ করতে পারলে প্যারামাউন্ট হলিউডের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। তখন তাদের সম্পদের তালিকায় যুক্ত হবে সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN), টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এইচবিও (HBO), টিবিএস (TBS), টিএনটি (TNT), টিসিএম (TCM), পাশাপাশি ডিসি স্টুডিওস (DC Studios) ও নিউ লাইন সিনেমা (New Line Cinema)। বর্তমানে প্যারামাউন্টের মালিকানায় রয়েছে প্যারামাউন্ট পিকচার্স (Paramount Pictures), সিবিএস (CBS), শোটাইম (Showtime) এবং নিকেলোডিয়ন (Nickelodeon)।
সিবিএস নিউজ (CBS News) এবং তাদের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 60 Minutes-এর ওপরও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক নজরদারি ও সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু সম্পাদকীয় ও প্রোগ্রামিং সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। নতুন নেতৃত্বের অধীনে দীর্ঘদিনের কর্মী ও খ্যাতনামা সাংবাদিকদের বরখাস্ত করাও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ওয়ার্নার ব্রাদার্স গত বছর নিজেদের বিক্রির জন্য বাজারে তোলে এবং ঋণসহ প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলার (৬১ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের একটি চুক্তির মাধ্যমে তাদের কিছু সম্পদ কেনার ব্যাপারে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছায়। এরপরেই এই চুক্তিতে ঢুকে পরে প্যারামাউন্ট তারপর নেটফ্লিক্স এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়।


