বলিউড ও আন্ডারওয়ার্ল্ড
আজকের বলিউড যতটা নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল একটা সময় এমনটা ছিলো না। সিনেমার আড়ালে লুকিয়ে ছিলো ভিন্ন এক দুনিয়া। অন্তরালে চলতো আরো অনেক সিনেমা। শুরুর দশকের বলিউডে ছিলো নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা, গল্পের ভিতরে গল্প। বলিউডের এই গল্প মূলত এর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংযোগ ও প্রভাব নিয়ে। যেখানে দাউদ ইব্রাহিম এক রূপকথার ভিলেন। বলিউডে দাউদ ইব্রাহিমের মতো লোকজন ও আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ে আছে নানা গল্প। আছে সত্যি আছে অতিরঞ্জন। বলিউডে মাফিয়া ও আন্ডারওয়ার্ল্ডজগতের লোকজনের আসলে প্রভাব ঠিক কতটুকু ছিলো? কি করতো তাঁরা, কেনই বা তাঁরা তাদের পরিকল্পনায় সিনেমাকে বেছে নিলো?
শিল্পস্বীকৃতি ও অর্থলগ্নি
বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংযোগ শুরু হয় মূলত এর আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার মাধ্যমে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী কয়েক দশক বলিউড আনুষ্ঠানিক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, ফলে এটি ছিলো সরকারি স্বীকৃতি ও আর্থিক নিরাপত্তার বাহিরে। যার কারণে ব্যাংকঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সুযোগ ছিল সীমিত। প্রযোজকদের অধিকাংশকেই ব্যক্তিগত অর্থদাতা, ব্যবসায়ী কিংবা অনানুষ্ঠানিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হতো। এই শূন্যস্থানকেই যাকে লাগায় আন্ডারওয়ার্ল্ড।
তাঁরা সিনেমায় ইনভেস্ট করা শুরু করে। আর ধীরে ধীরে বৃদ্ধি হতে থাকে তাঁদের শিকড়। ষাট ও সত্তরের দশক থেকেই মুম্বাইয়ের কুখ্যাত স্মাগলার ও আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যক্তিত্বরা এই সিনেমায় ঢুকে পরে। তাঁদের অবস্থান আরো শক্ত হয় আশির শেষ ও নব্বইয়ের দশকে, যখন মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে আলোচিত নাম দাউদ ইব্রাহিম ও তাঁর ডি-কোম্পানি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।

মাফিয়ারা বলিউডে কেন্দ্র বানালো কেন?
আন্ডারওয়ার্ল্ডের জন্য চলচ্চিত্র একাধিক কারণে ইনভেস্টের জায়গা হয়ে উঠেছে। যার কারণ প্রথমত, এটি ছিল কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্র। অবৈধ পথে অর্জিত অর্থ চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করে বৈধ আয়ে রূপ দেওয়া যেত বলেই বলিউড তাঁদের পছন্দের জায়গায় পরিনয় হয়।
দ্বিতীয়ত, বলিউড ছিল সামাজিক প্রভাব অর্জনেরও একটি মাধ্যম। তারকাদের সঙ্গে ছবি তোলা, পার্টিতে উপস্থিত থাকা কিংবা চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নি করা আন্ডারওয়ার্ল্ড ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা বাড়াত। তৃতীয়ত, বিদেশি বাজারে চলচ্চিত্রের বিতরণ অধিকারও ছিল লাভজনক ব্যবসা।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য যেখানেই হিন্দি ছবির বাজার দ্রুত বাড়ছিল সেখানেই তাঁদের আধিপত্য বিস্তার হচ্ছিলো চলচ্চিত্রের বিদেশি স্বত্ব কেনার মাধ্যমে। সবমিলিয়ে বলিউড ছিলো তাঁদের স্বর্গরাজ্য। তবে নব্বইয়ের দশকে তাঁরা বেশ উন্মাদ হয়ে উঠে। এই সময়ে বহু প্রযোজক, পরিচালক, পরিবেশক এবং অভিনেতাকে নিয়মিত হুমকি দেয়া হত। চাঁদা দাবি করা হতো।
চলচ্চিত্র নির্মাতা রামগোপাল ভার্মা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সেই সময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের লক্ষ্য ছিল একজনকে আক্রমণ করে দশজনের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া। আর এসব আতঙ্ক সৃষ্টি করে অর্থ আদায় করতো তাঁরা।

১৯৯৭ সালে সংগীতজগতের প্রভাবশালী উদ্যোক্তা গুলশান কুমারের হত্যাকাণ্ড পুরো ভারতে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তদন্তে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে চলচ্চিত্র ও সংগীতশিল্পের ওপর অপরাধ চক্র কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল।
এর কিছুদিন পরই প্রযোজক-পরিচালক রাকেশ রোশনের ওপর হামলা হয়। তাঁর ব্লকবাস্টার ছবি ‘কাহো না…প্যায়ার হ্যায়’ মুক্তির পর এই হামলা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পুলিশি তদন্তে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নাম উঠে আসে।
তারকাদের সাথে সম্পর্ক
এ নিয়ে অসংখ্য কথা উঠেছে। তবে সাংবাদিক ও গবেষকদের মতে, বলিউডের সবাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল বেশ জটিল। মাফিয়াদের জালে পড়ে কেউ কেউ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কেউ হুমকির মুখে পড়েছেন, কেউ ব্যবসায়িক কারণে অপরাধ চক্রের সংস্পর্শে এসেছেন, আবার অনেকে সম্পূর্ণ দূরেও থেকেছেন। অভিযোগ আছে যেআন্ডারওয়ার্ল্ড গোষ্ঠী নির্দিষ্ট অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে ছবিতে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টিও করত। কোনো কোনো প্রযোজক দাবি করেছেন, ফোন করে নির্দিষ্ট শিল্পীকে সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হতো। মুম্বাই পুলিশের একাধিক তদন্তে চলচ্চিত্রশিল্পে অপরাধ চক্রের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।
চলচ্চিত্র মুক্তি, বিদেশে সিনেমা স্বত্ব বিক্রি, সংগীতের স্বত্বসহ নানা ক্ষেত্রে অপরাধ চক্রের আগ্রহ ছিল বলে বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি কি বদলালো?
তবে এই পরিস্থিতি বেশ অনেকটাই বদলানো শুরু করে২০০০ সালের পর। এর পেছনে অন্যতম কারণ ভারত সরকার চলচ্চিত্রশিল্পকে আনুষ্ঠানিক শিল্প খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে ব্যাংকঋণ, করপোরেট বিনিয়োগ, বীমা এবং অন্যান্য বৈধ অর্থায়নের পথ খুলে যায়। এর পাশাপাশি মুম্বাই পুলিশের বিশেষ অভিযান, সংগঠিত অপরাধবিরোধী আইন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ফলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব কমতে থাকে।
করপোরেট স্টুডিও, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং শেয়ারবাজারভিত্তিক বিনিয়োগের যুগ শুরু হলে চলচ্চিত্র ব্যবসা ধীরে ধীরে আরও স্বচ্ছ কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়।
তবু কি শেষ হয়েছে মাফিয়া দৌরাত্ম?
আন্ডারওয়ার্ল্ডের আগের সেই প্রকাশ্য দাপট এখন আর নেই। তবে মাঝে মাঝেই চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের কাছে চাঁদাবাজির হুমকি, হত্যার হুমকি এমনকি মেরে ফেলার প্রচেষ্টাও চোখে পরেছে সম্প্রতি। অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, নব্বইয়ের দশকের মতো পরিস্থিতি এখন আর নেই। চলচ্চিত্রশিল্পের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে গেছে, নজরদারি বেড়েছে এবং করপোরেট জবাবদিহিও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।

১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের উত্থান এবং বলিউডের সঙ্গে তাদের নানা ধরনের যোগাযোগ নিয়ে অনেক সিনেমা হয় পরবর্তীতে। যেমন ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’ রাম গোপাল ভার্মার ‘কোম্পানি’, ‘শুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’, অনুরাগ কশ্যপের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’, ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ডি-ডে’ এসব ছবিতে দেখানো হয়েছে।
বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংযোগ সহ নানা অপরাধচক্র ও বলিউডে এর প্রভাব। সবমিলিয়ে বলিউড ছিলো এক দুর্ধষ অপরাধ কারখানা। আজ বলিউড সেই রূপ থেকে কিছুটা মুক্ত। তবে কতটুকু মুক্ত সেটা সময়ই বলে দেবে।


