বাজেটে সংস্কৃতি খাতে বড় চমক
নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে সংস্কৃতি ও সৃজনশীল শিল্প খাতের জন্য একাধিক বড় উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে জানান, শিল্পী, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য নানা সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হলো পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি আধুনিক ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ক্রিয়েটিভ হাব হবে দেশের শিল্পী, সংগীতজ্ঞ, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং অন্যান্য সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় মিলনস্থল। এখানে আন্তর্জাতিক মানের স্টুডিও, আর্ট গ্যালারি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং গবেষণামূলক সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় পর্যায়ক্রমে আঞ্চলিক ক্রিয়েটিভ হাব গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, দেশের সৃজনশীল শিল্প খাতের অবদান জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা।

বাজেটে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য আরও একটি সুখবর এসেছে। বাদ্যযন্ত্র এবং পেশাদার ক্যামেরার আমদানি খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে এসব যন্ত্রের বাজারমূল্য কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে চলচ্চিত্র, নাটক এবং ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণে ব্যবহৃত উচ্চ প্রযুক্তির ক্যামেরার আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর ফলে প্রযোজনা ব্যয় কমবে এবং স্থানীয় নির্মাতারা আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও উৎসাহিত হবেন।
দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক মানের একটি টেকনিক্যাল স্টুডিও স্থাপনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এই স্টুডিও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সরকার ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করে তুলতে চায়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্যও এসেছে বড় সুবিধা। বর্তমানে ইউটিউব, ফেসবুক এবং অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করে আয় করছেন হাজারো তরুণ। তাদের উৎসাহিত করতে ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই কর-সুবিধা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ প্রতিপাদ্যে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
সরকার জানিয়েছে, এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর কার্যকর হলে সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র এবং ডিজিটাল সৃজনশীল শিল্প খাতে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।