আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘আলি’
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্য আরেকটি গৌরবের খবর এনে দিলেন নির্মাতা আদনান আল রাজীব। তার পরিচালিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আলি’ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সাফল্যের মুকুটে যুক্ত করল আরও একটি মর্যাদাপূর্ণ অর্জন। এবার ছবিটি এসএক্সএসডব্লিউ (SXSW) লন্ডন-এ শর্ট ফিল্ম পুরস্কার জিতে নিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত এসএক্সএসডব্লিউ লন্ডন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সৃজনশীল উৎসব সাউথ বাই সাউথওয়েস্ট (SXSW)-এর আন্তর্জাতিক সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের অস্টিন শহরে যাত্রা শুরু করা এই উৎসব চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সংগীত, প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতির নতুন ও উদ্ভাবনী ভাবনার মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উদীয়মান প্রতিভা ও সৃজনশীল নির্মাতাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
এই উৎসবে পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে ‘আলি’ আবারও প্রমাণ করল যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গল্প বলার শক্তি দিন দিন আরও সমাদৃত হচ্ছে।
‘আলি’র আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয় ৭৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে চলচ্চিত্রটির বিশ্বপ্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয় এবং এটি ইতিহাস গড়ে। কারণ, ‘আলি’ ছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল শর্ট ফিল্ম প্রতিযোগিতা বিভাগে অংশ নেওয়া প্রথম বাংলাদেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। শুধু অংশগ্রহণেই থেমে থাকেনি ছবিটি; কান উৎসবের শর্ট ফিল্ম জুরি থেকে স্পেশাল মেনশন অর্জন করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় রচনা করে।
বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘আলি’ একটি গভীর মানবিক গল্প তুলে ধরে। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র এক কিশোর, যে একটি রক্ষণশীল উপকূলীয় শহরে বসবাস করে। সেই সমাজে নারীদের গান গাওয়া নিষিদ্ধ। অথচ তার কণ্ঠ অসাধারণ। সামাজিক বিধিনিষেধ ও প্রচলিত রীতিনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে সে গোপনে একটি গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। আত্মপরিচয়, স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রকাশের অধিকার এবং সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ—এই বিষয়গুলো চলচ্চিত্রটির মূল উপজীব্য।
চলচ্চিত্রটির গল্প ও নির্মাণশৈলী আন্তর্জাতিক সমালোচক এবং দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। কান উৎসবের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে ‘আলি’।
স্পেনের ভায়াদোলিদ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (সেমিনসি)-এ ছবিটি সেরা আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ইয়ুথ জুরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এছাড়া কিয়েভ আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বিশেষ সম্মাননা (স্পেশাল মেনশন) অর্জন করে। জার্মানির ফিল্মফেস্ট ব্রেমেন-এ জেতে ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড। অন্যদিকে মন্ট্রিয়ল দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র উৎসব-এ ছবিটি সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র বিভাগে স্পেশাল মেনশন লাভ করে।
এতেই শেষ নয়। ‘আলি’ বিশ্বের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসরে স্বীকৃতি পেয়েছে। ছবিটি টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (TIFF) এবং এশিয়ান অ্যাকাডেমি ক্রিয়েটিভ অ্যাওয়ার্ডস-এ মনোনয়ন অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে এর গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
আদনান আল রাজীবের এই সাফল্য শুধু একজন নির্মাতার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে ধারাবাহিক স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে ‘আলি’ বিশ্বদর্শকের সামনে বাংলাদেশের গল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এসএক্সএসডব্লিউ লন্ডনের এই পুরস্কার সেই যাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করল।