সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজন
দেশের কিংবন্দন্তী সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। শুক্রবার (১৩ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘কালজয়ী কণ্ঠ: শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সৈয়দ আব্দুল হাদী’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই অনুষ্ঠানের শুরুতে সৈয়দ আব্দুল হাদীর দীর্ঘ সংগীতজীবন, কর্ম ও অবদান নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
আব্দুল হাদী সম্মাননা স্মারক গ্রহণের পর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘সেই সঙ্গে একটি কথা বলতে হয়, সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা বাক্য আমি আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়েছি এবং কিছুটা বিব্রতও হয়েছি। এই জন্য যে আমি এতটা যোগ্য নই। আমার প্রতি আপনারা যে প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ করলেন, আমি তাঁর প্রতিদানে কী দিই? আমার তো দেওয়ার তেমন কিছু নেই।’

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল হাদীকে বলেন, আপনি চাইলে গান গাইতে পারেন। প্রতিমন্ত্রীর কথা শুনে হেসে ফেলেন এই কিংবন্দন্তী শিল্পী। পরে তিনি বলেন, ‘যদি এখনো গাইতাম, তাহলে একটি গান গেয়েই হয়তো এর প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু আমি তো গান ছেড়ে দিয়েছি, অনেক দিন গাই না। আমি সবাইকে অকৃত্রিম ভালোবাসা উপহার দিলাম।’
‘হাদী ভাইয়ের গান শুনে বড় হয়েছি’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘আমরা হাদী ভাইয়ের গান শুনে বড় হয়েছি। আমাদের কলেজজীবনে সিনেমা হলে যেতাম। তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে নায়কদের কণ্ঠের চমৎকার ম্যাচিং ছিল। সেটা আমাদের আনন্দ দিয়েছে, অনুপ্রাণিত করেছে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ছায়াছন্দ বলে সিনেমার গানের একটা অনুষ্ঠান হতো। আমরা ছোটবেলায় বিটিভিতে অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য বসে থাকতাম। গান হতে থাকলেই দেখা যেত একটার পর একটা সৈয়দ আব্দুল হাদীর গান আসছে। দুর্দান্ত, অসাধারণ সব আমরা শুনেছি। অনেক ক্ষেত্রেই হয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা স্ট্যান্ডার্ড বানিয়ে ফেলেছি। সৈয়দ আব্দুল হাদী আসলে সেই রকম একজন মানুষ।’

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। তিনিসহ আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) আহ্বায়ক হেলাল খান, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন। আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
এরপর ভিডিওবার্তায় সৈয়দ আব্দুল হাদীকে নিয়ে কথা বলেন আবিদা সুলতানা, ফোয়াদ নাসের বাবু, মাকসুদ জামিল মিন্টু, মনির খান ও রোমানা ইসলাম।
আব্দুল হাদীর সম্মানে গান
আলোচনা পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত হয় দেড় ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান। সেখানে বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা সৈয়দ আব্দুল হাদীর জনপ্রিয় গানগুলো নতুন করে পরিবেশন করেন। আব্দুল্লাহ হেল রাশ তালুকদার গেয়েছেন ‘বাংলাদেশের ছবি এঁকে দিও’, শিল্পী স্বরণ পরিবেশন করেছেন ‘তোমাদের সুখের এই নীড়’, নোলক বাবু গেয়েছেন ‘চোখ বুঝিলেই দুনিয়া আঁধার, হায়রে’, আর অনন্যা পরিবেশন করেছেন ‘আমার অর্থই একবার যদি কেউ ভালোবাসত’।
এ ছাড়া পিয়াল হাসান গেয়েছেন ‘এই পৃথিবীর পান্থশালায় গাইতে গেলে গান’, নুজহাত সাবিহা পুষ্পিতা পরিবেশন করেছেন ‘আমি তোমারই প্রেম ভিখারি’, অপু আমান গেয়েছেন ‘এমনও তো প্রেম হয়’ এবং অপু আমান ও পুষ্পিতা দ্বৈত কণ্ঠে গেয়েছেন ‘তুমি ছাড়া আমি একা’। অনুষ্ঠানে আরও পরিবেশিত হয় ‘কি করে বলিবো আমি’, ‘কেন তারে এত ভালোবাসলাম’, ‘যেও না সাথি’, ‘যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে’, ‘আউল বাউল লালনের দেশে’ ও ‘চোখের নজর এমনি কইরা’সহ তাঁর বহু জনপ্রিয় গান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় সৈয়দ আব্দুল হাদীর বহুল জনপ্রিয় দুটি গান ‘আছেন আমার মোক্তার’ এবং ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি’। পুরো মিলনায়তনজুড়ে তখন হাদীর প্রতি ভালোবাসার ঢেউ উঠে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
জীবন ও আত্মজীবনী
সৈয়দ আব্দুল হাদী ১৯৪০ সালের ১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০০০ সালে একুশে পদক লাভ করেছেন।
এই মহান শিল্পী তাঁর জীবন নিয়ে একটি বইও লিখেছেন যার নাম ‘জীবনের গান’। এই আত্মজীবনীমূলক বইয়ে তাঁর গানের জগতের নানা তথ্য, ইতিহাস, স্মৃতি তুলে ধরেছেন। এই বইয়ে উঠে এসেছে তাঁর অনেক অজানা বিষয় ও তাঁর শিল্পী হিসেবে বেড়ে উঠা ও যাদের সাহচর্য পেয়েছেন জীবনব্যাপী।


