মা দিবসে তৌসিফ মাহবুব
মায়ের রক্তাক্ত শরীর চোখের সামনে দেখার সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও ভুলতে পারেন না অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব । মা দিবস উপলক্ষে দেশের এক গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে শৈশবের সেই বিভীষিকাময় ঘটনার কথা তুলে ধরেন তিনি। জানান, প্রায় ২৫ বছর আগের এক শীতের সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা যা তাঁর জীবনদর্শনই বদলে দিয়েছে।
তখন তৌসিফ ধানমন্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়তেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও স্কুল শেষে বাসায় ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। সাধারণত বাবা কিংবা খালু তাঁকে নিতে আসতেন। কিন্তু সেদিন নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কেউ আসেননি। বন্ধুরা একে একে চলে গেলেও তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন স্কুলের দারোয়ানের কক্ষে। চারপাশের নিরাপত্তাহীনতার কারণে একা বাসায় ফেরার সুযোগও ছিল না।

এই প্রসঙ্গে তৌসিফ বলেন, ‘সেদিন আমাকে কেউ নিতে না আসায় আমি একা বসে ছিলাম দারোয়ানের রুমে। একা বাসায় যাওয়া কঠিন ছিল। কারণ, সেই সময়ে আমাদের স্কুলের এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে ছিনতাইকারী ও ডাকাতদের আনাগোনা থাকত।’
মায়ের রক্তাক্ত শরীর
অপেক্ষার একপর্যায়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতে শুরু করে। ঠিক তখনই একটি রিকশা এসে থামে স্কুলের সামনে। তৌসিফ ভেবেছিলেন, হয়তো বাবা বা খালু এসেছেন তাঁকে নিতে। কিন্তু বাইরে এসে দেখেন, রিকশায় বসে আছেন তাঁর মা। হঠাৎ মাকে দেখে অবাক হলেও জমে থাকা অভিমান আর রাগ উগরে দিতে শুরু করেন তিনি।
ঘটনার সেই মুহূর্ত স্মরণ করে তৌসিফ বলেন, ‘আমি ভেবেছি বাবা বা খালু এসেছে। শুরুতে মাকে দেখে বেশ অবাক হই। কারণ, ওই সময় মায়ের আসার কথা না। যাই হোক তখনো প্রচণ্ড রাগ মনে। কোনো কিছু না ভেবেই মায়ের ওপর রাগ ঝাড়তে শুরু করে দিলাম। আমি একের পর এক রেগেই চলেছি। মা চুপচাপ আমার দিকে ভাবলেশহীনভাবে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ রিকশাওয়ালা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমার মায়ের পেটে ছিনতাইকারীরা ছুরি মেরেছে। যা ছিল সব নিয়ে গেছে। তাঁর শরীরের অবস্থা ভালো না।”’
হাসপাতালে নেয়ার ঘটনা
এরপরই তৌসিফের চোখে পড়ে মায়ের রক্তাক্ত শরীর। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করেন। কিন্তু আশপাশে কেউ এগিয়ে না আসায় নিজেই সিদ্ধান্ত নেন মাকে হাসপাতালে নেওয়ার। ছোটবেলায় ভাইয়ের জন্মের সময় ইবনে সিনা হাসপাতালে যাওয়ার পথ দেখেছিলেন বলে সেই রাস্তাটি তাঁর মনে ছিল। সেই স্মৃতির ওপর ভর করেই রিকশাচালককে পথ দেখাতে শুরু করেন।
তৌসিফ বলেন, ‘রক্তাক্ত মাকে দেখে আমি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলাম। সাহায্য চাইলাম। আমি তো ছোট, কীভাবে হাসপাতালে নেব জানি না। কিন্তু কেউ এগিয়ে না আসায় একসময় আমার নিজেরই মনে পড়ে গেল হাসপাতালের রাস্তার কথা। দুই বছর আগে ইবনে সিনায় আমার ছোট ভাইয়ের জন্ম হয়। যে কারণে আমি রাস্তাটা চিনতাম। পরে রিকশাচালককে বললাম, আমি যেদিকে বলব সেদিকে যাবেন।’

মাকে জড়িয়ে রিকশায় করে হাসপাতালে পৌঁছে দেন তৌসিফ। সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং পরে বাবাকে খবর দেন। তাঁর মা প্রায় ১৫ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে তৌসিফ বলেন, ‘আমরা তখন ধানমন্ডি লেক, তাকওয়া মসজিদের গলি পার হয়ে হাসপাতালের দিকে যাই। রিকশায় বুঝতে পারি আম্মুর অবস্থা খুব বেশি ভালো না। দ্রুতই হাসপাতালে পৌঁছাই। আম্মুকে হাসপাতালে ভর্তি করি। সেদিনের কথা আমার এখনো মনে আছে। হাসপাতালে যাওয়ার পরে সবাই আমাকে বাহবা দিচ্ছিলেন। মূলত একাই আম্মুকে হাসপাতালে আনার জন্য তারা আমার অনেক প্রশংসা করছিলেন।’
পরে জানা যায়, ছিনতাইকারীরা তাঁর মায়ের কাছ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার সময় গলার চেইন ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে পেটে ছুরি মারে।
এ বিষয়ে তৌসিফ বলেন, ‘মায়ের কাছ থেকে সবকিছু নিয়ে শেষে গলার চেইন টান দেয় ছিনতাইকারী। কিন্তু সেটা নিতে পারে নাই। যে কারণে ছিনতাইকারীরা হাতের টিপ চাকু মায়ের পেটে ঢুকিয়ে দেয়। সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে। মায়ের জন্য মন খারাপ লাগে।’
সকল মায়ের প্রতি ভালোবাসা
এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মায়ের আত্মত্যাগ, সাহস আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাঁকে আজও অনুপ্রাণিত করে।

আবেগঘন কণ্ঠে তৌসিফ বলেন, ‘এখনো প্রায়ই আমাকে ঘটনাটি ভাবায়, মা রক্তাক্ত অবস্থায়ও কাউকে সাহায্যের জন্য না ডেকে, কোনো হাসপাতালে না গিয়ে বরং আমার স্কুলে চলে এসেছিলেন, আমাকে নিতে। নিজের কথা না ভেবে মা ছেলের কথা ভেবেছিলেন। এটাই আমার মা। আমার ছোটবেলা থেকে এমন অসংখ্য ত্যাগের, যত্নের, ভালোবাসার ছোট ছোট গল্প আছে আমার মাকে ঘিরে। আমার মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর অবদানের ফলেই আমি আজ তৌসিফ হয়ে উঠেছি। আমি জানি না এসবের প্রতিদান কীভাবে দেব, তবে আমি এটুকু জানি মাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।’
শেষে তিনি বলেন, ‘এখনো সেই ধানমন্ডির রাস্তা সন্ধ্যার পর সুনসান নীরব হয়ে যায়। এখনো শুনি ছিনতাই হয়। এটা ভেবে খারাপ লাগে। আজ মা দিবসে পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুক। আমার মায়ের মতো পরিস্থিতিতে যেন আর কোনো মাকে পড়তে না হয়। মাকে ছিনতাইকারীরা ছুরি মেরেছিল সেই ভয়ংকর দিনের কথা ভাবলে শরীর শিউরে ওঠে।’


