নির্মাণে অভিনেত্রী নওশাবা
দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ এবার নতুন পরিচয়ে হাজির হচ্ছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনায় নাম লিখিয়েছেন তিনি। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সোমেশ্বরী’ পরিবেশগত অবক্ষয়, গ্রামীণ জনজীবন এবং অনিয়ন্ত্রিত আধুনিকায়নের প্রভাবকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে।
চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে নওশাবার। অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি দর্শকদের কাছে পরিচিত মুখ হলেও নির্মাতা হিসেবে এটি তাঁর প্রথম বড় পদক্ষেপ। নতুন এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি সমাজ ও পরিবেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা তুলে ধরতে চান।
‘সোমেশ্বরী’ ছবিটির প্রযোজক বিবেশ রায়। সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর এবং সোমেশ্বরী নদীসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় এর শুটিং সম্পন্ন হয়েছে। চলচ্চিত্রটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এতে পেশাদার অভিনয়শিল্পীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা এবং একদম নতুন মুখদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ছবির গল্প ও চরিত্রগুলোর সঙ্গে বাস্তব জীবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রযোজক বিবেশ রায় এর আগে মধ্যনগর অঞ্চলের জীবন ও বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘ধানের কাব্য’ চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় এবার ‘সোমেশ্বরী’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এবার তিনি পরিচালনার দায়িত্ব না নিয়ে প্রযোজকের ভূমিকায় ছিলেন এবং পুরো প্রকল্পটি একটি সম্মিলিত সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নির্মাতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সোমেশ্বরী’ প্রচলিত ধাঁচে তৈরি হয়নি। ছবিটির জন্য আগে থেকে পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য লেখা হয়নি। বরং নওশাবা এবং তাঁর সহকর্মীরা আপন, লতা ও জাহিদ। মধ্যনগরে গিয়ে স্থানীয় মানুষ, প্রকৃতি এবং পরিবেশকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে গল্পের কাঠামো তৈরি করেন। লোকেশনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই চলচ্চিত্রটির কাহিনি বিকশিত হয়েছে।

চলচ্চিত্রটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নওশাবা জানান, শুরুতে তাঁর পরিকল্পনা ছিল শুধু পরিচালনার দায়িত্ব পালন করার। কিন্তু কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের জন্য উপযুক্ত কাউকে খুঁজে না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজেকেই সেই চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম দেখেছি। আমার বাবা প্রায়ই আমাকে দেশের নানা প্রান্তে নিয়ে যেতেন। ফলে গ্রামের মানুষ, তাদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গে আমার গভীর পরিচয় রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা এই চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।”
তিনি আরও জানান, শুটিংয়ের সময় মধ্যনগরের সাধারণ মানুষ আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছাড়া ছবিটি নির্মাণ করা সম্ভব হতো না।

‘সোমেশ্বরী’ মূলত পরিবেশ ধ্বংস এবং উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর বাড়তে থাকা চাপের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। নদী, কৃষিজমি এবং গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি এমন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে, যা বর্তমান সময়ের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
নওশাবার ভাষায়, “আমরা উন্নয়নের কথা বলি, কিন্তু সেই উন্নয়নের ফলে প্রকৃতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা অনেক সময় ভাবি না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যাচ্ছি, সেটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ‘সোমেশ্বরী’ সেই প্রশ্নই দর্শকদের সামনে তুলে ধরবে।”
চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে গ্রিন ফিল্মস ব্যানারে, যা ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া-এর একটি উদ্যোগ। পরিবেশ ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে নওশাবার নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে। তাঁর আশা, ‘সোমেশ্বরী’ শুধু একটি চলচ্চিত্র হিসেবেই নয়, বরং পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠবে।