প্রাণবন্ত রিভিউ
গত ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমাটি বক্স অফিসে সাফল্যের পাশাপাশি দর্শকমহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রেক্ষাগৃহে সফল প্রদর্শনের পর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেলেও এর জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ। সম্প্রতি সিনেমাটি দেখে সামাজিক মাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও গভীর বিশ্লেষণধর্মী রিভিউ প্রকাশ করেন এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। হাসনাত আবদুল্লাহর রিভিউ দ্রুতই নেটিজেনদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। শুধু দর্শকরাই নন, রিভিউটি মুগ্ধ করেছে সিনেমাটির নির্মাতা তানিম নূরকেও।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসনাতের রিভিউ শেয়ার করে তানিম নূর লেখেন,
বনলতা এক্সপ্রেসের এত চমৎকার প্রাণবন্ত রিভিউ লেখার জন্য হাসনাত আবদুল্লাহকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসার জোয়ার বইতে থাকে। অনেকেই তানিম নূরকে বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করে তার সৃজনশীল কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, হাসনাত আবদুল্লাহর লেখনিশৈলী, জীবনবোধ ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের গভীরতাও নেটিজেনদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

হাসনাটের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এর রিভিউ হুবহু তোলা হলো
অসুস্থ এক মায়ের জন্য হেলিকপ্টার আনার আবদার শুনে মন্ত্রী মহোদয় অবাক হলেন। বললেন, “একটা মামুলি বিষয়কে আপনি এত বড় কেন করছেন?”
গণিতের প্রফেসর রশিদ উদ্দিন উত্তর দিলেন, “মন্ত্রী সাহেব, মামুলি বিষয়কে বড় করে তোলাই তো মানুষের কাজ!”
বনলতা এক্সপ্রেস মুভিতেও আসলে একই কাজ করা হয়েছে। ছোট ছোট গল্প দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে অনেকগুলো মানুষের জীবনকে, তাদের দুঃখকে। সিনেমাটা দেখার পর বনলতা এক্সপ্রেসকে আপনার আর ট্রেন মনে হবে না; মনে হবে জীবন্ত দুঃখের এক বাহন, যার একেকটা বগি একেকটা দুঃখ দিয়ে ভর্তি।
যেমন ডাক্তার আশহাবের কথাই ধরুন। ম্যাজিক দেখানো, মায়ের সঙ্গে মজা করা হাসিখুশি ছেলেটাও একটা পর্যায়ে দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বলল, “না পারলাম ভালো মানুষ হইতে, না পারলাম ভালো ডাক্তার হইতে…”
সঙ্গে সঙ্গে আশহাব হয়ে গেল বাংলাদেশের সমস্ত বড় ছেলে; যাদের পেছনে থাকে শৈশবের ট্রমা, বর্তমানজুড়ে থাকে আফসোস, আর হাতে থাকে কিছু অনর্থক ম্যাজিকের কার্ড।
দেখতে দেখতে মনে হয়, আমরাও কি অনর্থক কিছু কার্ড আর মুখে ফেইক হাসি ঝুলিয়ে বেড়ানো ডাক্তার আশহাব নই?
নিঃসন্তান কিন্তু ক্ষমতাবান মন্ত্রী আবুল খায়ের, নাকি মাত্র ২৪ বছর বয়সী একমাত্র ছেলের কফিন নিয়ে যাত্রা করা রশিদ উদ্দিন- কার দুঃখ আসলে বেশি?
শেষ আর শুরুর সমান্তরাল যাত্রা
হাতে মাত্র এক বছরের জীবন নিয়ে আজিজ যখন স্ত্রী, ছেলে আর মেয়ের ওপর থেকে মায়া কাটাতে ব্যস্ত,ঠিক সেই সময়ে জীবনে নতুন যাত্রা শুরু করতে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে সদ্য এডমিশন ক্যান্ডিডেট রুবি। যেই ট্রেনে একজন তরুন কফিনে চড়ে যাচ্ছে ঠিক একই ট্রেনে একজন তরুণী নতুনভাবে জীবন শুরু করছে। একটি বিদায়ের দিকে, অন্যটি আগমনের দিকে। শেষ আর শুরুকে একই রেখায় বেঁধে।
সেই একই রেললাইনে বসে গণিতের প্রফেসর কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, “হোল ওয়ার্ল্ডে আমি ম্যাথে জায়ান্ট নাম্বার এইট, কিন্তু ম্যাথ আমার হাতে নাই, ম্যাথ আমার হাতে নাই…”
ম্যাথ কি আসলে আমাদের কারও হাতেই থাকে? নাকি আমাদের সকল ম্যাথের সমাধান নিয়ে ওপরে একজন বসে থাকেন, আর আমাদের হিসাব মেলানোর ছুটোছুটি দেখেন?
জানাজার নামাজের কোনো আজান হয় না। কারণ জন্মের সময়ই আমাদের কানে আজান দিয়ে দেওয়া হয়। জন্মের সময় আযান আর মৃত্যুর সময় তার নামাজ। এর মাঝখানের সময়টুকুই আমাদের জীবন।
জন্ম, মৃত্যু আর ভালোবাসার এক যাত্রা
এছাড়াও, বনলতা এক্সপ্রেস হচ্ছে একটা পৃথিবী। যে পৃথিবীর এক পাশে সন্তানের কফিন, আরেক পাশে নতুন এক শিশুর জন্ম। যে পৃথিবীর এক পাশে ক্ষমতার দম্ভ, আরেক পাশে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। এক পাশে নীলাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট, আরেক পাশে চিত্রার বাড়িয়ে দেওয়া হাত।
দিনশেষে বনলতা এক্সপ্রেস আমার গল্প, আমাদের গল্পই। জন্মের আজান, মৃত্যুর জানাজা, হারানোর দুঃখ কিংবা পাওয়ার আনন্দ-সব নিয়েই আমাদের জীবন। বারবার হাঁটু গেড়ে পড়ে যাওয়ার পরও আবার উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলাই মানবজাতির নিয়তি।

থেমে না থাকার নামই জীবন
নিয়তি বলেই একটা থেঁতলে যাওয়া ব্যাঙও মাটির সঙ্গে অর্ধেক লেপ্টে থাকা দেহটা নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লাফায়, চলে, চলতে থাকে। তাকে থামানো যায় না। এই চলতেই থাকাই জীবনের ধর্ম। থেমে গেলেও,কষ্ট পেলেও জীবন কষ্ট পেতে পেতে সূর্যের মতো স্পষ্ট হয়ে সুস্মিত শিশিরের মতো সবার মাঝে বারবার ছড়িয়ে পড়ে। ঠিক বনলতা এক্সপ্রেসের মতো।
এই বনলতা এক্সপ্রেসকে কেউ থামাতে পারে না। কারণ এই ট্রেন মানবজীবনেরই মতো যেখানে স্থবিরতা নয়, কেবল রূপান্তরই চূড়ান্ত সত্য। সেই রূপান্তরের ভেতর দিয়েই মানুষ অশ্রুকে অভিজ্ঞতায়, সংগ্রামকে সাফল্যে, দুঃখকে মহাকাব্যে, সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে।
যে রূপান্তর শিশুকে প্রৌঢ়ে, বীজকে বৃক্ষে, স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে, সেই রূপান্তরকে বন্ধ করে দেওয়ার সাধ্য কার আছে?
হাসনাতের রিভিউয়ে উন্মোচিত অদেখা দিক
মন্তব্যকারীদের অনেকেই পোষ্টটি পড়ে মনে করেন, সিনেমাটির যেসব সূক্ষ্ম দিক সাধারণ দর্শকের চোখ এড়িয়ে গেছে, হাসনাতের রিভিউ সেগুলো নতুনভাবে উন্মোচন করেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একজন সংবেদনশীল লেখক হিসেবেও তার নতুন পরিচয় আবিষ্কার করেছেন অনেক পাঠক।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর উপন্যাস কিছুক্ষণ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মানুষের জীবন, মৃত্যু, বিচ্ছেদ, আশা ও রূপান্তরের গল্পকে এক ট্রেনযাত্রার ভেতর দিয়ে তুলে ধরেছে। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, শরিফুল রাজ, সাবিলা নূর, আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, শ্যামল মাওলা এবং ইন্তেখাব দিনারসহ দেশের জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পীরা।
বর্তমানে সিনেমাটি দেখা যাচ্ছে হইচই প্ল্যাটফর্মে। দর্শক ও সমালোচকদের মতে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ শুধু একটি ট্রেনযাত্রার গল্প নয়, বরং মানবজীবনের আনন্দ-বেদনা, হারানো-পাওয়া এবং অনিবার্য রূপান্তরের এক প্রতীকী উপাখ্যান।


