বলিউডে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিং! সিনেমায় অন্তরঙ্গ দৃশ্য থাকলেই আলোচনা শুরু হয়ে যায়। কখনো সেন্সর নিয়ে ঝামেলা, কখনো মুক্তির পর পক্ষে বিপক্ষে তুমুল তর্ক। কলকাতার অভিনেত্রী পাওলি দাম অভিনীত শ্রীলঙ্কান সিনেমার একটি ক্লিপ ফাঁস হওয়ার পর যা ঘটেছিল, সিনেমাপ্রেমীদের অনেকেরই তা মনে আছে। তবে সেসব পরের কথা। আসল প্রশ্নটা শুটিং নিয়ে। বলিউডে অন্তরঙ্গ দৃশ্যের শুটিং ঘিরে অভিযোগ কম ওঠেনি। অনেক অভিনেত্রী অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন, কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন শুটিংয়ে সহ অভিনেতার বাড়াবাড়ি নিয়েও।
মিটু আন্দোলনের পর পশ্চিমা সিনেমা দুনিয়া এই ধরনের দৃশ্যের শুটিংয়ে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের সাহায্য নিতে শুরু করে। সেই ধারা এখন ভারতেও এসেছে। অন্তরঙ্গ দৃশ্যের পরিকল্পনা ও শুটিংয়ে অভিনয় শিল্পীদের নিরাপত্তা আর সম্মতি নিশ্চিত করাই এই পেশাজীবীদের কাজ।
বলিউডে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিংয়ে বাড়ছে সুরক্ষা
এত দিন ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পে নগ্নতা কিংবা যৌনদৃশ্যের শুটিং অনেকটাই নির্ভর করত তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আর অভিনয়শিল্পীদের পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না, সুরক্ষা ব্যবস্থাও ছিল না বললেই চলে। এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। সেটে যুক্ত হচ্ছেন বিশেষ এই পেশাজীবীরা, যাঁদের উপস্থিতি বলিউডে একসময় প্রায় অপরিচিত ছিল।

বলিউডের ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরদের ছোট কিন্তু বাড়তে থাকা দলটির একজন আস্থা খান্না। তিনি বলেন,
যেভাবে একজন স্টান্ট পরিচালক মারামারির দৃশ্যের পরিকল্পনা করেন, ঠিক সেভাবেই তাঁরা ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের পরিকল্পনা করেন। হাত কোথায় থাকবে, চুল কীভাবে থাকবে, সব ঠিক করে দেওয়া হয় যাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু ঠিক করতে না হয়।
শুটিংয়ের সময় এই পেশাজীবীরা সঙ্গে রাখেন ‘মডেস্টি টুলস’ বা শালীনতা রক্ষার নানা উপকরণ। এর মধ্যে থাকে শরীরের গোপনাঙ্গ ঢাকার বিশেষ সুরক্ষাবস্তু, স্তনবৃন্ত ঢাকার প্যাচ আর ডোনাটের মতো গোলাকার কুশন। এসবের সাহায্যে অভিনয়শিল্পীরা অপ্রয়োজনীয় শারীরিক সংস্পর্শ কমিয়ে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করতে পারেন, দুজনের শরীরের মধ্যে নিরাপদ দূরত্বও বজায় থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়। সাধারণত অভিনয়শিল্পী নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। আস্থা খান্নার কথায়, উদ্দেশ্য হলো চিত্রনাট্যে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য আছে, এ কথা যেন অভিনয়শিল্পীরা আগেই জানতে পারেন। কাজটিতে যুক্ত হওয়ার চুক্তিতে সই করার আগেই তাঁরা ঠিক করে নিতে পারেন, এসব দৃশ্যে অভিনয় করতে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন কি না।
‘গেহরাইয়াঁ’ থেকে মূলধারায় যাত্রা
মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে ইনটিমেসি ডিরেকশন বা ঘনিষ্ঠ দৃশ্য পরিচালনার পেশাগত চর্চা আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর প্রথম দিকের উদাহরণ করণ জোহরের প্রযোজনার ‘গেহরাইয়াঁ’। ২০২২ সালে অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন আস্থা খান্না। অভিনয়শিল্পীদের ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ আর দৃশ্যের পরিকল্পনায় সহায়তা করেন তিনি। অন্যদিকে ইনটিমেসি কোচ নেহা ব্যাসো শারীরিক সম্পর্কের গতিবিধি ও সম্মতি নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেন। ধীরে ধীরে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের জন্য নির্মিত অন্যান্য ছবিতেও এই পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ে। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি স্ট্রিমিং সেবা গুলোই। নেহা ব্যাসোর ভাষায়, এখন সেন্সরশিপ অনেক কম, আর নিষিদ্ধ বা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে গল্প বলার ক্ষেত্রেও আগ্রহ আর উন্মুক্ততা বেড়েছে।
অথচ বলিউডে কয়েক দশক ধরে পর্দায় শারীরিক ঘনিষ্ঠতা অনেকটাই এড়িয়ে চলা হয়েছে। সরকারের কঠোর নির্দেশিকা আর সেন্সর কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধের কারণে চুম্বন কিংবা যৌন সম্পর্কের দৃশ্য সরাসরি না দেখিয়ে প্রতীকী ভাবে বোঝানো হতো। ফুলে ফুলে ঘষা লাগা, পরস্পরের দিকে ধেয়ে আসা ঢেউ কিংবা দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন দিয়ে প্রকাশ করা হতো আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত। নির্মাতাদের কেউ কেউ সেই সীমা পেরোনোর চেষ্টা করলেও ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ধারণের পদ্ধতি দীর্ঘদিন ছিল অনেকটাই অনিয়মতান্ত্রিক।
অপরাধনির্ভর সিরিজ ‘মির্জাপুর’ স্পষ্ট ও খোলামেলা দৃশ্যের জন্য পরিচিত। তবে সিরিজটির প্রথম দিকের মৌসুম গুলোতে কোনো ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর ছিলেন না। এর প্রধান অভিনয়শিল্পী রসিকা দুগ্গাল মনে করেন, এ ধরনের বিশেষজ্ঞরা কাজের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করেন। তাঁর কথায়, প্রথম দিকের মৌসুম গুলোতে প্রত্যেককে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী আলাদাভাবে সীমারেখা সামলাতে হতো। যাতে কারও সঙ্গে কোনোভাবেই সীমা লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে আর সবার উদ্বেগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়, সে জন্য ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বলিউডের চাকচিক্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ছিল বিশৃঙ্খল এক কর্মপরিবেশ, যেখানে ব্যক্তিগত সীমারেখা প্রায়ই লঙ্ঘিত হতো। আস্থা খান্না জানান, এমন ঘটনাও ঘটেছে যেখানে একজন অভিনেতা সহ অভিনেত্রীর সম্মতি ছাড়াই তাঁকে চুমু দিয়েছেন। শুটিংয়ের স্বাভাবিক গতির মধ্যে যাতে এ ধরনের কিছু না ঘটে, সেটাই তাঁরা নিশ্চিত করেন। নিজের কাজের গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলেন,
তাঁর কাজ এমন পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করে, যার মধ্য দিয়ে গেলে একজন মানুষকে হয়তো কয়েক বছর ধরে থেরাপি নিতে হতে পারে, অথচ সেই ক্ষত কখনোই পুরোপুরি শুকায় না। খান্নার মতে, ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটরের কাজ কেবল যৌনতার অভিনয় বা যৌনদৃশ্যের পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিসরে সহিংসতা, আধিপত্য বিস্তার, হয়রানি ও নগ্নতার মতো বিষয়ও পড়ে।
তবে এই পেশাজীবীদের উপস্থিতি এখনো সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি। ভারতের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনশিল্প মিলিয়ে এ ধরনের পেশাজীবীর সংখ্যা মাত্র এক ডজনের কিছু বেশি। বড় বাজেটের অনেক বাণিজ্যিক ছবিতে তাঁদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগও খুব বেশি নেই, কারণ এসব ছবির প্রধান অভিনয়শিল্পীদের অনেকেই পর্দায় স্পষ্ট শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, এমনকি চুম্বনের দৃশ্যেও অভিনয় করতে চান না। আবার কিছু ছবিতে নির্দিষ্ট কোনো ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর ছাড়াই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ধারণ করা হয়, অভিজ্ঞ কিছু পরিচালক এখনো নিজেরাই এসব দৃশ্য পরিচালনা করেন। ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর নিয়োগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা বা বাধ্যবাধকতাও নেই। তাই সংশ্লিষ্টদের আশা, চলচ্চিত্র সংগঠন গুলো একসময় পুরো শিল্পের জন্য অভিন্ন মানদণ্ড চালু করবে।









