চীনের সিনেমা ‘ডিয়ার ইউ’
চীনের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে পারিবারিক নাট্যধর্মী সিনেমা ‘ডিয়ার ইউ’। তুলনামূলক স্বল্প বাজেটে নির্মিত এই সিনেমা বক্স অফিসে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছে। মাত্র ১৭ কোটি টাকা বাজেটের ছবিটি ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ২৪ কোটি ৮৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন হাজার কোটিরও বেশি। ফলে ২০২৬ সালের অন্যতম সফল ও আলোচিত চীনা সিনেমায় পরিণত হয়েছে এটি।
চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন হংচুন লান। এতে অভিনয় করেছেন সিটং লি, ইয়ানটং ওয়াং এবং শাওকিং উ। মুক্তির পর থেকেই আবেগঘন গল্প, মানবিক সম্পর্কের গভীরতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের উপস্থাপনার কারণে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে সিনেমাটি।
জুনের প্রথম সপ্তাহান্তেই ছবিটি আয় করে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার। বক্স অফিসে ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে সিনেমাটি এখনো দর্শকদের আকর্ষণ ধরে রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বড় বাজেটের অ্যাকশন কিংবা ভিজ্যুয়াল ইফেক্টনির্ভর সিনেমার ভিড়ে ‘ডিয়ার ইউ’ সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটি অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে।

সিনেমার কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক বৃদ্ধা নারী, ইয়ে শুরোউ। ঋণের চাপে জর্জরিত তাঁর নাতি একসময় থাইল্যান্ডে পাড়ি জমায় কথিত এক ধনী দাদার সন্ধানে। এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে অর্ধশতাব্দী ধরে লুকিয়ে থাকা এক প্রেমের গল্প। একই সঙ্গে সামনে আসে এমন কিছু সত্য, যা পরিবারটির অতীত এবং পরিচয়ের ধারণাকেই বদলে দেয়।
চিঠির গল্পেই দর্শকের হৃদয় জয়
চলচ্চিত্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবাসী চীনাদের চিঠি আদান-প্রদানের ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গল্প। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে হারিয়ে যেতে বসা সেই আবেগঘন যোগাযোগব্যবস্থাকে সিনেমায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে লেখা চিঠির মাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, স্মৃতি এবং অপেক্ষার অনুভূতি দর্শকদের মধ্যে গভীর আবেগ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষ করে বয়স্ক দর্শকদের কাছে সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অনেকেই নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা, বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে ছবিটির গল্পের মিল খুঁজে পেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সিনেমাটির বিভিন্ন সংলাপ, আবেগঘন দৃশ্য এবং চমকপ্রদ সমাপ্তি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘ডিয়ার ইউ’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর গল্প বলার ধরন। আধুনিক চীনা সমাজে পরিবার, অভিবাসন, প্রজন্মগত দূরত্ব এবং একাকীত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ছবিটি ভালোবাসা, অনুশোচনা, ক্ষমা এবং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানের গল্পও বলে।

চীনের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র বাজারে যেখানে বড় বাজেটের অ্যাকশন, সায়েন্স ফিকশন ও ফ্যান্টাসি সিনেমার আধিপত্য দেখা যায়, সেখানে ‘ডিয়ার ইউ’ প্রমাণ করেছে যে দর্শকদের হৃদয় জয় করতে সবসময় বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হয় না। বরং শক্তিশালী গল্প, বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র এবং আবেগময় উপস্থাপনাই একটি সিনেমাকে অসাধারণ সাফল্য এনে দিতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের শুরু থেকে চীনের বক্স অফিস আয় দাঁড়িয়েছে ২৩৬ কোটি ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ কম। এমন চ্যালেঞ্জিং সময়ে ‘ডিয়ার ইউ’-এর এই সাফল্য চীনা চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য আশার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিনেমাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, দর্শক এখনো এমন গল্পই খোঁজেন যেখানে তাঁরা নিজেদের জীবন, পরিবার এবং স্মৃতির প্রতিফলন দেখতে পান। আর সেই কারণেই ১৭ কোটি টাকার একটি সিনেমা আয় করে ফেলেছে তিন হাজার কোটিরও বেশি।