আতাউর রহমান
একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। জানা গেছে তাঁর মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়েছে। পরে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
মঙ্গলবার (১২ মে) জোহরের নামাজের পর মগবাজারের ইস্পাহানি সেঞ্চুরি আর্কেডে নিজ বাসভবনের সামনে খোলা মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিকেলে তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে নেয়া হয়েছে যেন সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারে।

তাঁর অসুস্থতার বিষয়ে পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার বাসায় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন আতাউর রহমান। পরে প্রথমে তাকে গুলশানের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় পরে ধানমন্ডির আরেকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
তাঁর শারীরিক অবস্থার সাময়িক উন্নতি হওয়ায় একবার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। পরে আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত রবিবার পুনরায় লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
শিক্ষাজীবন ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা
আতাউর রহমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক বহুমাত্রিক প্রতিভা। তিনি ছিলেন নাট্যকার, অভিনেতা, মঞ্চনির্দেশক ও সংগঠক। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মঞ্চনাট্য আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবেও গণ্য করা হয় তাঁকে।
এই বরেণ্য ব্যক্তি ১৯৪১ সালের ১৮ জুন তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক। তার মাতাও ছিলেন সংস্কৃতিমনা। তার মায়ের কাছেই তিনি বাইরের বই পড়ার শিক্ষা পান। তার শৈশব কাটে নোয়াখালীতে তার মামার বাড়িতে। সেখানেই তিনি প্রথম জুল ভার্ন রচিত টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি পড়েন। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনাবলি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনাবলির সাথে পরিচিত হন।

আতাউর রহমান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিষয়ে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’
১৯৬৮ সালে জিয়া হায়দার ও ফজলে লোহানীর সাথে মিলে লোহানীর বাড়িতে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন আতাউর রহমান। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাটক ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নির্দেশনার মাধ্যমে মঞ্চনির্দেশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এতে তাঁর সাথে কাজ করেছেন লাকি ইনাম, আবুল হায়াত, ইনামুল হক, আলী যাকের, ও ফখরুল ইসলাম প্রমুখ।
আতাউর রহমান ৩৫টির বেশি মৌলিক এবং অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ করা মঞ্চনাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল গ্যালিলিও, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, রক্তকরবী, বাংলার মাটি বাংলার জল, নারীগণ, ঈর্ষা, অপেক্ষমাণ, এবং ওয়েটিং ফর গোডো।
লেখনী
শুধু মঞ্চেই নয়, শিক্ষকতা ও লেখালেখিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। আতাউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। তার প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘প্রজাপতি নিবন্ধ’, ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’, ‘নাটক করতে হলে’ ও ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’।
দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনে তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন তিনি। ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারও পান তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ‘মুনীর চৌধুরী সম্মাননা’সহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন এই নাট্যব্যক্তিত্ব।
তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।


