হলিউডে চাকরি সংকট
গত তিন বছরে হলিউডের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনার কাজে ধস নেমেছে। এ কারণে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রায় ৫১ হাজার চাকরি হারিয়ে গেছে যার বেশিরভাগই লস অ্যাঞ্জেলেসে। এই ক্ষতির পরিমাণ ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে লস অ্যাঞ্জেলেসের মহাকাশ শিল্পে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার সমতুল্য বলে বলা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচনে ট্রাম্প কার্ড হয়ে উঠেছে হলিউডের চাকরির সংকট ইস্যু। ভ্যারাইটি অবলম্বনে।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদপ্রার্থীরা হলিউডের চাকরির সংকটের বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। প্রার্থীরা শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করছেন। এসব পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো রাজ্যের অভ্যন্তরীণ প্রযোজনার জন্য বরাদ্দ ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের কর-প্রণোদনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো।

সোমবার সান হোসে-এর মেয়র ম্যাট মেহান, ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের সীমা তুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাব প্রকাশ করেন। পাশাপাশি, এই ভর্তুকির আওতায় অভিনেতা, প্রযোজকসহ অন্যান্য “অ্যাবাভ দ্য লাইন” প্রতিভাদের পারিশ্রমিক অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।
হলিউড ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু
“হলিউড ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু,” শীর্ষক এক সাক্ষাৎকারে ভ্যারাইটি-কে ম্যাট মেহান বলেন, “সংকটে থাকা এই শিল্পে বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত চাকরি ঝুঁকির মুখে। ২০২২ সালের শীর্ষ অবস্থান থেকে আমরা ৩৫% নিচে নেমে গেছি। বাস্তবতা হলো, অন্য অঙ্গরাজ্য ও দেশগুলো এই শিল্পকে আকর্ষণ করতে আরও বেশি সুবিধা দিচ্ছে। আমরা হলিউডকে হারাতে দিতে পারি না।”
অন্যদিকে, গভর্নর গ্যাভিন নিউসম হলিউডের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, বিশেষ করে তার দ্বিতীয় মেয়াদে। তখন তিনি কর-প্রণোদনা ৩৩০ মিলিয়ন ডলার থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ান এবং এটিকে “রিফান্ডেবল” করেন-অর্থাৎ, কোনো স্টুডিওর রাজ্য করের দায় কম বা না থাকলেও তারা নগদ অর্থ ফেরত পেতে পারে। পাশাপাশি, তিনি এই কর্মসূচির আওতায় অ্যানিমেশন ও প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানও যুক্ত করেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব উদ্যোগ শিল্পের এই পতন ঠেকাতে যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি।
“আমরা যথেষ্ট কিছু করিনি,” বলেন অ্যান্টোনিও ভিলারাইগোসা, যিনি নিজেও এই সীমা তুলে দেওয়া এবং “অ্যাবাভ দ্য লাইন” খরচ অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে। তিনি আরও বলেন, “আমার বিশ্বাস, এই নির্বাচন চলচ্চিত্র শিল্পের অস্তিত্বের প্রশ্ন। যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও অঙ্গরাজ্যগুলো সব ধরনের খরচে প্রণোদনা দিচ্ছে, তখন তারা এখানে (হলিউডে) শুটিং করবে না।”
বিলো দ্য লাইন
হলিউডের শ্রমিক সংগঠনগুলো চাইছে প্রণোদনা কর্মসূচিটি “বিলো দ্য লাইন” খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক, যাতে বেশি সংখ্যক টেকনিশিয়ান ও ক্রুদের চাকরি নিশ্চিত করা যায়। তবে স্টুডিওগুলো-মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশন-এর মাধ্যমে-“অ্যাবাভ দ্য লাইন” খরচ (যেমন অভিনেতা ও প্রযোজকদের পারিশ্রমিক) অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোরালো লবিং করছে। তাদের যুক্তি, জর্জিয়া ও নিউ ইয়র্ক-এর মতো রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে এটি জরুরি।
গত বছর একটি সমঝোতার ভিত্তিতে আইনপ্রণেতারা “অ্যাবাভ দ্য লাইন” খরচ বাদ রাখার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার পরিবর্তে “বিলো দ্য লাইন” খরচের ওপর রিবেট ২০%-২৫% থেকে বাড়িয়ে ৩৫%-৪০% করা হয়।

নিউইয়র্ক ও জর্জিয়া-এ প্রজেক্টগুলো প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ট্যাক্স ক্রেডিট পেয়ে যায়। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদন করতে হয় এবং একই তহবিলের জন্য প্রতিযোগিতায় থাকা অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে-এমন প্রমাণ দিতে হয়। ফিল্মএলএ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রায় ১১% টিভি প্রকল্প এবং ১৭% চলচ্চিত্র প্রকল্প রাজ্য ভর্তুকি পেয়েছে।
সাবেক মেয়র অ্যান্টোনিও ভিলারাইগোসা কিংবা ম্যাট মেহান-কেউই এখনও এই সীমা তুলে দিলে কত ব্যয় হতে পারে, তার নির্দিষ্ট হিসাব দেননি। ভিলারাইগোসা বলেন, “আমার মনে হয় না কেউই এর সঠিক হিসাব জানে।”
অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন স্বাস্থ্য সচিব জাভিয়ের বেসেরার উপদেষ্টা মাইকেল বুস্তামান্তে জানান, তিনিও চলচ্চিত্র শিল্পকে সমর্থন করেন, তবে প্রণোদনার সীমা নিয়ে তার অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, “শিল্পকে সমর্থন করতে যা প্রয়োজন, তিনি তা করতে প্রস্তুত। সীমা শিথিল করার পক্ষেও তিনি থাকতে পারেন। তবে সামগ্রিক বাজেট পরিস্থিতি মাথায় রেখে আমাদের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রযোজনা শিল্প
শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রযোজনা শিল্প নিউইয়র্ক-এর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং জর্জিয়ার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বড়। তবে ২০২২ সালের পর থেকে এসব রাজ্যেও প্রযোজনা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে-বিশেষ করে জর্জিয়ায়। মার্ভেল চলচ্চিত্রও এখান থেকে সরে যুক্তরাজ্যে চলে গেছে।
সাবেক কংগ্রেস সদস্য কেটি পোর্টার বলেন, তিনি আগে দেখতে চান সম্প্রসারিত ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা কীভাবে কাজ করছে, তারপর সেটি আরও বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, “যদি দেখি বরাদ্দের সীমায় পৌঁছে গেছি এবং আরও সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে সীমা আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়। ভালো সাড়া পেলে আমি সীমা বাড়াতে দ্বিধা করব না।”
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, প্রণোদনা কতটা ‘রিফান্ডেবল’ হবে-সেই বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। “এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে,”-বলেন কেটি পোর্টার।
পোর্টার ইতোমধ্যে টিমস্টারস ইউনিয়নের সমর্থন পেয়েছেন, হলিউডে যাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তবে অন্যান্য হলিউড ইউনিয়নগুলো নীতিগত কারণে কাউকে সমর্থন করে না, অথবা এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে।
ম্যাট মেহান-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, “অ্যাবাভ” ও “বিলো দ্য লাইন”-উভয় ধরনের খরচের ওপর সীমাহীন ৪০% ট্যাক্স ক্রেডিট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও, তিনি কনসার্ট, ট্যুরিং প্রোডাকশন ও ফেস্টিভালের জন্য ২০% ভর্তুকি এবং বড় লাইভ ক্রীড়া ইভেন্টের ভেন্যু ফি-র ওপর ৩০% কর-ছাড় দেওয়ার আলাদা প্রস্তাবও দিয়েছেন।
এই সীমাহীন কর-ছাড়ের সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা চাই এটি যতটা সম্ভব বাড়ুক। এগুলো এমন অর্থ, যা অন্যথায় তৈরি হতো না। এতে করদাতাদের কোনো ক্ষতি নেই-এটি মূলত সম্ভাব্য রাজস্ব ত্যাগ।”
প্যারামাউন্ট-ওয়ার্নার ব্রাদার্স-এর একীভূতকরণ নিয়ে সমালোচনা
হেজ ফান্ড প্রতিষ্ঠাতা টম স্টেয়ার-ও গত মাসে এই শিল্পের জন্য কর-প্রণোদনা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, “এর নির্দিষ্ট কোনো সীমা আমি বলছি না। এখানে একটি পুরো ইকোসিস্টেম রয়েছে, যা একবার হারিয়ে গেলে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্বজুড়ে অনেকেই এই শিল্প নিজেদের দিকে টানতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।”

স্টেয়ার প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স-এর একীভূতকরণ নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন। বিশেষ করে ডেভিড জাসলাভ-এর সম্ভাব্য ৭০০-৮০০ মিলিয়ন ডলারের পারিশ্রমিক নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, “একজন সিইও যদি ৭০০-৮০০ মিলিয়ন ডলার নিয়ে নিজের কর্মীদের স্বার্থ বিসর্জন দেন, তা সত্যিই নিন্দনীয়। হাজারো মানুষের ক্ষতির বিনিময়ে একজনকে অর্থ দিয়ে চুক্তি করানো-এটা আমি ঘৃণ্য বলেই মনে করি।”
আগামী ২ জুন প্রাইমারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শীর্ষ দুই প্রার্থী নভেম্বরের রানঅফে অংশ নেবেন। অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী চ্যাড বিয়ানকো ও স্টিভ হিলটন। তাদের প্রচার দল এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, হিলটন এন্টারটেইনমেন্ট ইউনিয়ন কোয়ালিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যারা স্যাক্রামেন্টোতে চলচ্চিত্র শিল্পের স্বার্থে কাজ করছে।



