Sunday, November 1, 2026

ঐশ্বরিয়ার জন্মদিনে অন্য গল্প – বিশ্বসুন্দরীর মুকুট থেকে পারো-নন্দিনী

রজনীকান্ত কেন সুপার স্টার ?

রজনীকান্ত কেন সুপার স্টার ? 

October 26, 2026

অমিতাভ বচ্চন – যে গল্প কখনো বলা হয়নি

October 16, 2026

আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা নায়িকা কে ?

October 12, 2026

সালমান শাহ কেন এত অল্প সময়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন?

October 2, 2026

কেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিলেন আমির খান?

September 26, 2026

একসময় তাঁর মাথায় উঠেছিল বিশ্বসুন্দরীর মুকুট। এরপর তাঁকে দেখা গেছে কখনো প্রেমে ভেঙে পড়া পারো, কখনো রহস্যময়ী সুহেরি, আবার কখনো রাজকীয় নন্দিনীর চরিত্রে। রুপালি পর্দা থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচা দুই জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। কিন্তু কয়েক দশকের এই যাত্রায় তাঁর পরিচয় কি শুধু সৌন্দর্য আর তারকাখ্যাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ? জন্মদিনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তাঁর গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো পরিচিতির গণ্ডি পেরিয়ে নিজেকে বারবার নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা।

আজ ১লা নভেম্বর, ঐশ্বরিয়ার জন্মদিন। ১৯৭৩ সালের এই দিনে ভারতের ম্যাঙ্গালুরুতে জন্ম নেওয়া অভিনেত্রীর বয়স এখন ৫৩ বছর। তাঁর জীবনের গল্পের শুরুটা হয়েছিল মডেলিং দিয়ে, কিন্তু সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয় কিছু চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে।

যে মুকুট বদলে দিয়েছিল জীবনের পথ

ছোটবেলায় চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা ছিল ঐশ্বরিয়ার। পরে স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার জন্যও ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তবে মডেলিংয়ের সুযোগ বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।

১৯৯৪ সালে ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন ঐশ্বরিয়া। এরপর ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায়। দক্ষিণ আফ্রিকার সান সিটিতে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় ২১ বছর বয়সে জিতে নেন বিশ্বসুন্দরীর মুকুট।

ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন
ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন

এই অর্জন তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়। মডেলিং ও বিজ্ঞাপনের জগতে বাড়তে থাকে তাঁর কাজের সুযোগ। তবে বিশ্বসুন্দরীর পরিচয় ধরে রাখার বদলে তিনি সামনে এগিয়ে যান অভিনয়ের দিকে। সেখানেই তৈরি হয় তাঁর জীবনের আরেকটি অধ্যায়।

পারো থেকে নন্দিনী: চরিত্রে চরিত্রে বদলে যাওয়া

১৯৯৭ সালে মণি রত্নমের তামিল সিনেমা ‘ইরুভার’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় ঐশ্বরিয়ার। একই বছর হিন্দি সিনেমা ‘অউর পেয়ার হো গায়া’ দিয়েও দর্শকের সামনে আসেন তিনি।

তবে ১৯৯৯ সাল তাঁর ক্যারিয়ারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ এবং ‘তাল’  তাঁকে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ এ নন্দিনী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান তিনি।

এরপর ২০০২ সালের ‘দেবদাস’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজ হয়ে ওঠে। সঞ্জয় লীলা বানসালির এই সিনেমায় পার্বতী, অর্থাৎ পারো চরিত্রে ঐশ্বরিয়ার অভিনয়, অভিব্যক্তি ও পর্দায় উপস্থিতি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। শাহরুখ খান ও মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে তাঁর অভিনীত ছবিটি একই বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়।

কিন্তু ঐশ্বরিয়াকে শুধু ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সাজানো রোমান্টিক চরিত্রে আটকে রাখা যায়নি। ২০০৬ সালের ‘ধুম ২’ এ সুহেরি চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল একেবারেই আলাদা। ২০০৭ সালের ‘গুরু’ এবং ২০০৮ সালের ‘যোধা আকবর’ এও দেখা যায় ভিন্ন ধরনের চরিত্রে তাঁকে।

এই বৈচিত্র্যই তাঁর অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একদিকে ঐতিহাসিক ও আবেগনির্ভর চরিত্র, অন্যদিকে আধুনিক অ্যাকশনধর্মী সিনেমা দুই ধারাতেই নিজের উপস্থিতি তুলে ধরেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় তারকার পরিচয়

ঐশ্বরিয়ার ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আন্তর্জাতিক সিনেমায় তাঁর কাজ। ‘ব্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, ‘দ্য মিস্ট্রেস অব স্পাইসেস’ এবং ‘দ্য পিঙ্ক প্যান্থার ২’ এর মতো ইংরেজি ভাষার ছবিতে অভিনয় করে তিনি ভারতীয় সিনেমার বাইরের দর্শকের কাছেও পরিচিতি পেয়েছেন।

তবে আন্তর্জাতিক পরিচিতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত মঞ্চগুলোর একটি কান চলচ্চিত্র উৎসব।

২০০২ সালে ‘দেবদাস’ নিয়ে কান উৎসবে অংশ নেওয়ার পর ২০০৩ সালে উৎসবটির মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারক হন ঐশ্বরিয়া। তিনি প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে কান উৎসবের লালগালিচায় তাঁর উপস্থিতি হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বিনোদন ও ফ্যাশন সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বিষয়।

কানের সঙ্গে এই দীর্ঘ সম্পর্কের একটি দিক হলো, সেখানে ঐশ্বরিয়ার পরিচয় শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবে নয়; তাঁর পোশাক, সাজ ও ব্যক্তিত্বও নিয়মিত আলোচনায় এসেছে। যদিও লালগালিচার উপস্থিতি তাঁর ক্যারিয়ারের সম্পূর্ণ গল্প নয়, এটি তাঁকে আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে দৃশ্যমান রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

বিরতির পর আবার পর্দায়

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ঐশ্বরিয়া সব সময় নিয়মিত সিনেমা করেননি। কাজের বিরতি নিয়েছেন, আবার নতুন চরিত্র নিয়ে ফিরেছেন। ২০১৫ সালে ‘জাজবা’ এবং ২০১৬ সালে ‘সর্বজিৎ’ ও ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল‘ এ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে হিন্দি সিনেমায় ফিরে আসেন তিনি।

এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া মণি রত্নমের  ‘পোন্নিয়িন সেলভান’ সিরিজ তাঁর অভিনয়জীবনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। ঐতিহাসিক এই ছবিতে নন্দিনী ও মন্দাকিনী দেবীর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। বিশেষ করে নন্দিনীর রহস্যময় উপস্থিতি ও রাজনৈতিক কৌশলনির্ভর চরিত্রটি দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

পোন্নিয়িন সেলভান: পার্ট টু তে অভিনয়ের জন্য ২০২৪ সালে সাইমা সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান ঐশ্বরিয়া।

এই প্রত্যাবর্তন মনে করিয়ে দেয়, দীর্ঘ বিরতির পরও পরিচিত অভিনেত্রী নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে আলোচনায় ফিরতে পারেন। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায় কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে তাঁর বেছে নেওয়া কাজের ওপর।

পুরস্কারের বাইরেও যে স্বীকৃতি

ঐশ্বরিয়ার অর্জনের তালিকায় রয়েছে ভারতের পদ্মশ্রী সম্মান, যা তিনি ২০০৯ সালে পান। ২০১২ সালে ফ্রান্স সরকার তাঁকে অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স সম্মানে ভূষিত করে। অভিনয়ের বাইরে তিনি এইচআইভি ও এইডস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজেও ইউএনএইডসের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে যুক্ত হয়েছেন।

২০০৭ সালে অভিনেতা অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। তাঁদের মেয়ে আরাধ্যা। দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি চলা এই অধ্যায়ও তাঁর জীবনের অংশ। তবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও, তাঁর কাজ ও অর্জনকে আলাদা করে দেখাই একজন শিল্পীর দীর্ঘ যাত্রা বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

জন্মদিনে ফিরে দেখা: সৌন্দর্যের বাইরে যে গল্প

ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের গল্পের শুরু বিশ্বসুন্দরীর মুকুট দিয়ে। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারকে শুধু সেই একটি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। ‘দেবদাস’ এর পারো, ‘ধুম ২’ এর সুহেরি কিংবা ‘পোন্নিয়িন সেলভান’ এর নন্দিনী প্রতিটি চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি ভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে।

তাঁর যাত্রায় রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি, অভিনয়ের নানা অভিজ্ঞতা, বিরতি এবং নতুন করে পর্দায় ফেরার অধ্যায়। সব কাজ সমানভাবে সফল হয়নি, আবার কিছু চরিত্র দর্শকের মনে দীর্ঘদিনের জন্য জায়গা করে নিয়েছে। এই মিশ্র অভিজ্ঞতাই একজন শিল্পীর বাস্তব ক্যারিয়ারকে আরও মানবিক করে তোলে।

জন্মদিনে তাই ঐশ্বরিয়াকে ফিরে দেখার উপলক্ষ শুধু তাঁর সৌন্দর্যের প্রশংসা নয়। বরং কীভাবে একটি বিশ্বসুন্দরীর পরিচয় সময়ের সঙ্গে একজন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অভিনেত্রীর পরিচয়ে বিস্তৃত হয়েছে, সেটি মূল বিষয়।

Share

Read more

Local News