ছয় দশকের ক্যারিয়ার
রবিবার (১৯ এপ্রিল) দেশের স্বনামধন্য অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদের ক্যারিয়ারের ছয় দশক পূর্তি উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘ছয় দশক পেরিয়ে তৌকীর আহমেদ’- শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে তৌকির আহমেদ বলেন, আমি যেন কোনোভাবেই আবর্জনা উৎপন্ন না করি।
ক্যারিয়ারের ছয় দশকের পূর্তি উপলক্ষে কথা বলতে গিয়ে তৌকির আহমেদ স্মরণ করেন ফরাসী দার্শনিক ভলতেয়ারের বিশেষ একটি কথাকে। তৌকির আহমেদ বলেন, “ভলতেয়ারের একটা উক্তি আমার খুব প্রিয়। লেখকদের উদ্দেশে তিনি বলছেন, “যতক্ষণ পারো, না লিখে থাকো। কারণ, আবর্জনার কোনো স্থান সাহিত্যে নেই।” শুধু লেখায় না, শিল্পের যেকোনো মাধ্যমে আবর্জনার কোনো স্থান নেই। সুতরাং আমি যেন কোনোভাবেই আবর্জনা উৎপন্ন না করি, বা করলেও সেটা যাতে দ্রুত ডাস্টবিন পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারি, সে ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলাম।”
“যতক্ষণ পারো, না লিখে থাকো। কারণ, আবর্জনার কোনো স্থান সাহিত্যে নেই।”
রবিবার সকালে জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গণে প্রথমে আয়োজনটি উদ্বোধন করা হয়। এরপরে শিল্পকলার সেমিনার কক্ষে ‘আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পীর দায়’ শীর্ষক সেমিনারে কথা বলেন তৌকীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা হচ্ছে, এটি একটি সময় নষ্ট করার খেলা। আমরা নানানভাবে সময় পার করার চেষ্টা করি, খেলা দেখে, গান শুনে, চলচ্চিত্র দেখে, ঘুমিয়ে, বসে, আলস্যে। খেলাটি খুব আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে, যদি কেউ সৃষ্টি খেলায় মাতে। যদি সে মনে করে, সে কিছু একটা সৃষ্টি করতে চায় এবং তখন সে কিন্তু একটি অত্যন্ত মূল্যবান স্ট্যাটাস অর্জন করে। সৃষ্টির স্ট্যাটাস। যেটা যখন সে ধারণ করতে চায়, তখন কিন্তু সে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করতে চাচ্ছে।’
‘জীবন সম্পর্কে আমার ধারণা হচ্ছে, এটি একটি সময় নষ্ট করার খেলা।
শিল্প ও অর্থ
তৌকির আহমেদের প্রায় সাড়ে চার দশকের অভিনয় জীবনে তিনি মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্র অভিনয়ের বাইরে সাতটি চলচ্চিত্র ও চারটি মঞ্চনাটক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শুধু অর্থ উপার্জনই জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না। আমি জানি, অর্থ খুবই দরকারি। কিন্তু আমরা যদি সেই সৃজনশীলতার জায়গায় চর্চা করার অধিকার না পাই, সুযোগ না পাই, তাহলে সেটা খুব দুঃখজনক। এই ৭টি চলচ্চিত্র ১৪টি হতে পারত। ৪টি নাটক ১৬টি হতে পারত। কিন্তু না, শিল্পী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সমাজ-সবকিছুই তাঁকে অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে।’

নিজের তৈরি সিনেমা নিয়ে তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘আমি জানি, বাণিজ্যিক ছবি বানালে হয়তো সেটা বেশি চলবে, বেশি উপার্জন হবে। কিন্তু আমি চাই, আমার অধিকারটা থাকুক। আমি যেন আমার মতো ছবিটি বানাতে পারি। আরেকজন যদি অন্যভাবে বানাতে চায়, সেটাও যেন তার অধিকার থাকে। এবং সমাজকে বা রাষ্ট্রকে সেই ক্ষেত্রটি অবারিত করতে হবে। না হলে তো একই ধরনের কাজ হবে। কিন্তু সব কাজ তো একরকম হবে না। বিভিন্ন ধরনের কাজ হবে।’
‘শিল্পের সর্বনাশ হয়েছে’
আয়োজিত সেমিনারটিতে কথা বলেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, অভিনেতা আবুল হায়াত, ও বরেণ্য আফজাল হোসেন। মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ভিউ বাণিজ্য এসে আমাদের শিল্পের সর্বনাশ হয়েছে। সেই সর্বনাশের কালে আজকে আমরা বসে আছি। একদিকে শিল্পে সংকোচন, রাজনৈতিক সংকোচন। গত ১৭টি মাস আমাদের ওপর রাজনৈতিক সংকোচন চলেছে। এবং আমরা ভালো কোনো কিছু নির্মাণ করার কথা ভাবতেও পারিনি। আমরা প্রেরণাহীন সময় কাটিয়েছি।’
এ সময় আবুল হায়াত বলেন, ‘সৃজনশীল ব্যক্তি হিসেবে তৌকীরকে আমরা উদাহরণ হিসেবে ধরে নিতে পারি। সে বিভিন্ন রকম বই পড়ে। আমার বাসায় যখন তৌকীর আসে বা তৌকীরের সাথে যখন আমার দেখা হয়, আমাদের যে কথাবার্তাগুলো হয়, আমি মনে করি যে আমার একটা ক্লাস হলো, আমি অনেক কিছু শিখলাম।’

‘আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পীর দায়’ শীর্ষক সেমিনারের পর বিকেল চারটায় জাতীয় নাট্যশালায় প্রদর্শিত হয় তৌকীর আহমেদ পরিচালিত সিনেমা ‘অজ্ঞাতনামা’। এছাড়া একই মিলনায়তনে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় মঞ্চস্থ হয় নাট্যকেন্দ্রের ‘তীর্ষযাত্রী’। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন তৌকীর আহমেদ।
তৌকির আহমেদের সিনেমা
তৌকির আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে জয়যাত্রা , রূপকথার গল্প , দারুচিনি দ্বীপ , অজ্ঞাতনামা , হালদা , ফাগুন হাওয়ায় , স্ফুলিঙ্গ। এর মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘জয়যাত্রা’ পরিচালনার মাধ্যমে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া স্ফুলিঙ্গ সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।


