বলিউডের পর্দায় মুম্বাইয়ের অন্ধকার জগৎ, অপরাধ আর প্রতিশোধের গল্পকে যিনি দিয়েছিলেন আলাদা এক সিনেমাটিক ভাষা, তিনি নির্মাতা সঞ্জয় গুপ্ত। তাঁর সিনেমায় ছিল দ্রুতগতির অ্যাকশন, টানটান উত্তেজনা, স্টাইলিশ দৃশ্যায়ন আর মনে রাখার মতো সংলাপ। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে গল্প বলার এই নির্মাতা আর নেই। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মুম্বাইয়ে নিজের বাড়িতে এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর। তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া বলিউডের জন্য যেমন এক অপূরণীয় ক্ষতি, তেমনি তাঁর সিনেমার ভক্তদের জন্যও এক বিষাদের খবর।
আকস্মিক বিদায়, অসমাপ্ত স্মৃতির গল্প
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বাইয়ের ভারসোভায় নিজের বাড়িতে দুর্ঘটনার শিকার হন সঞ্জয়। প্রাথমিক পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, শুক্রবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে বসার ঘর থেকে রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার সময় ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান তিনি। এ সময় দেয়ালের একটি কোণে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার সময় তাঁর স্ত্রী আনু লেখি ও সন্তানরা নিজ নিজ ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পুলিশ একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করেছে। প্রাথমিক তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ পাওয়া যায়নি।
১৯৬৯ সালের ২৩ অক্টোবর মুম্বাইয়ে জন্ম সঞ্জয় গুপ্তের। সিনেমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ১৫ বছর বয়সে চলচ্চিত্রজগতে কাজ শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে পোস্ট-প্রোডাকশন ও সাউন্ড ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ১৯৯৪ সালে ‘আতিশ: ফিল দ্য ফায়ার’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

পর্দায় রেখে গেলেন নিজের সিনেমাটিক স্বাক্ষর
সঞ্জয় গুপ্তের নাম উঠলেই প্রথমে মনে পড়ে ‘কান্তে’র কথা। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমায় অমিতাভ বচ্চন, সঞ্জয় দত্ত ও সুনীল শেঠির মতো তারকারা একসঙ্গে অভিনয় করেন। ডাকাতির গল্প, শক্তিশালী সংলাপ আর ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা সিনেমাটিকে সময়ের সঙ্গে কাল্ট মর্যাদা এনে দেয়।
এরপর ‘মুসাফির’, ‘জিন্দা’, ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’, ‘জাজবা’ ও ‘কাবিল’ এর মতো সিনেমা নির্মাণ করেন তিনি। বিশেষ করে ‘শুটআউট অ্যাট লোকান্ডওয়ালা’ ও ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াডালা’ দিয়ে মুম্বাইয়ের অপরাধজগতের গল্পকে নতুন করে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন। অন্যদিকে, হৃতিক রোশন অভিনীত ‘কাবিল’ তাঁর পরিচালিত অন্যতম বাণিজ্যিক সফল সিনেমা হিসেবে পরিচিত।

২০০১ সালে নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াইট ফেদার ফিল্মস’ প্রতিষ্ঠা করেন সঞ্জয়। এর মাধ্যমে বেশ কয়েকটি আলোচিত সিনেমা প্রযোজনা করেন। তাঁর শেষ পরিচালিত সিনেমা ছিল ২০২৪ সালের ‘দ্য মিরান্ডা ব্রাদার্স’। একই বছর ‘ভিসফোট’ সিনেমার প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

তাঁর মৃত্যুর খবরে শোক প্রকাশ করেছেন বলিউডের অনেক তারকা ও নির্মাতা। সোনু সুদ, মিলাপ জাভেরি ও কুনাল কোহলিসহ অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করেছেন। সহকর্মীদের কাছে সঞ্জয় ছিলেন নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও নির্মাণশৈলীর একজন চলচ্চিত্রকার।
একজন নির্মাতার পরিচয় শুধু তাঁর নির্মিত সিনেমার তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনো কখনো কিছু দৃশ্য, কিছু সংলাপ কিংবা গল্প বলার ধরনই তাঁকে দর্শকের মনে বাঁচিয়ে রাখে। সঞ্জয় গুপ্তও রেখে গেলেন তেমনই কিছু সিনেমাটিক স্মৃতি। মুম্বাইয়ের অন্ধকার গলির গল্প হয়তো আরও অনেক নির্মাতা বলবেন, কিন্তু সঞ্জয় গুপ্তের নিজস্ব স্টাইলে সেই গল্প বলার মানুষটি আর ফিরবেন না।









