বছরের শেষটা যখন ঘনিয়ে আসছে, ভারতীয় সিনেমার দুনিয়ায় তখন তৈরি হচ্ছে দুই বড় লড়াইয়ের মঞ্চ। একদিকে প্রাচীন মহাকাব্যের পাতা থেকে উঠে আসছে রাম, সীতা ও রাবণের গল্প। অন্যদিকে বড়দিনের আবহে নতুন রূপে পর্দায় ফিরতে প্রস্তুত শাহরুখ খান। নভেম্বরের শুরুতে ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’, আর ডিসেম্বরের শেষ ভাগে ‘কিং’। দুটি সিনেমা, দুটি ভিন্ন জগৎ, অথচ লক্ষ্য এক দর্শকের মন জয় করে বক্স অফিসে নিজেদের জায়গা তৈরি করা।
একটির পেছনে রয়েছে হাজার বছরের পুরোনো এক মহাকাব্যের আবেগ, অন্যটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় তারকার আকর্ষণ। সঙ্গে বড় বাজেট, তারকাবহর আর মুক্তির আগে থেকেই তৈরি হওয়া কৌতূহল। সব মিলিয়ে বছরের শেষ দুই মাস ভারতীয় সিনেমার জন্য হয়ে উঠতে পারে বেশ জমজমাট।
কিন্তু সিনেমার দুনিয়ায় আগাম উত্তেজনা আর শেষ পর্যন্ত সাফল্যের গল্প সব সময় এক হয় না। প্রচারণায় ঝড় তোলা ছবি যেমন দর্শকের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে, তেমনি মুক্তির আগে তুলনামূলক কম আলোচনায় থাকা সিনেমাও চমকে দিতে পারে সবাইকে। তাই প্রশ্ন শুধু কোন ছবি কত টাকা আয় করবে, তা নয়; বরং কোন সিনেমা দর্শককে এমন অভিজ্ঞতা দিতে পারবে, যা তাঁরা হল থেকে বেরিয়েও মনে রাখবেন?
মহাকাব্যের পথে ‘রামায়ণ’
ভাবুন, প্রেক্ষাগৃহের আলো নিভে গেল। বিশাল পর্দায় ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে প্রাচীন এক জগৎ। সেখানে আছে রাজ্য হারানোর বেদনা, ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের গল্প, ক্ষমতার লড়াই, প্রতিশোধ আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। সেই পরিচিত মহাকাব্যকেই আধুনিক সিনেমার ভাষায় নতুন করে তুলে ধরতে আসছে ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’।
নীতেশ তিওয়ারি পরিচালিত দুই পর্বের এই চলচ্চিত্রের প্রথম কিস্তি বিশ্বজুড়ে মুক্তির জন্য নির্ধারিত হয়েছে ৫ নভেম্বর, ২০২৬। হিন্দির পাশাপাশি তামিল, তেলুগু, কন্নড় ও মালয়ালম ভাষায়ও ছবিটি মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে। আইম্যাক্সসহ বিভিন্ন উন্নত প্রদর্শনব্যবস্থায় সিনেমাটি দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোতেই রয়েছে বড় তারকাবহর। রামের ভূমিকায় রণবীর কাপুর, সীতার চরিত্রে সাই পল্লবী আর রাবণের ভূমিকায় যশ। হনুমান হিসেবে সানি দেওল এবং লক্ষ্মণের চরিত্রে রবি দুবে। পরিচিত এই চরিত্রগুলোকে নতুনভাবে দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন দর্শকেরা।
তবে ‘রামায়ণ’ এর আকর্ষণ শুধু অভিনয়শিল্পীদের নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এর গল্পের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের পরিচয়। বহু প্রজন্ম ধরে রামায়ণের কাহিনি মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই গল্পকে বড় পর্দায় নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগ যেমন বিশাল, তেমনি দায়িত্বও অনেক বড়।
কারণ পরিচিত গল্পের ক্ষেত্রে দর্শকের প্রত্যাশা থাকে অন্য রকম। তাঁরা শুধু নতুন দৃশ্য দেখতে চান না, চরিত্রগুলোর আবেগ ও গল্পের গভীরতাও অনুভব করতে চান। তাই রণবীর কাপুরের রাম কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবেন, সাই পল্লবীর সীতা দর্শকের মনে কতটা জায়গা করে নেবেন, আর যশের রাবণ কতটা শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করবেন এসবই হয়ে উঠতে পারে সিনেমাটির আলোচনার বড় অংশ।
বিশেষ করে যশের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ‘কেজিএফ’ দিয়ে বড় পরিসরের অ্যাকশনধর্মী চরিত্রে নিজের জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠা করা এই অভিনেতাকে এবার দেখা যাবে রাবণের ভূমিকায়। তাঁর পর্দার উপস্থিতি ও অভিনয়ের ধরন চরিত্রটিকে কীভাবে নতুন মাত্রা দেয়, তা নিয়ে দর্শকের কৌতূহল থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে রাবণকে শুধু শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, গল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র হিসেবে কতটা গভীরভাবে তুলে ধরা হয়, সেটিও হবে বড় পরীক্ষা।

এরপর আসে সিনেমাটির নির্মাণের প্রশ্ন। পৌরাণিক জগৎ, যুদ্ধের দৃশ্য, বিশাল সেট, পোশাক, আবহ এবং ভিজ্যুয়াল এফেক্টস সবকিছু মিলিয়ে দর্শকের সামনে একটি বিশ্বাসযোগ্য জগৎ তৈরি করতে হবে। ছবিটির নির্মাণে যুক্ত রয়েছে ভিজ্যুয়াল এফেক্টস প্রতিষ্ঠান ডিএনইজি (DNEG), যা ‘ডিউন’ ও ‘ইন্টারস্টেলার’ এর মতো চলচ্চিত্রেও কাজ করেছে। সংগীত পরিচালনায় রয়েছেন এ আর রহমান ও হ্যান্স জিমার।
এই দুই সংগীত পরিচালকের যুক্ত হওয়াও ছবিটির প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর মতো একটি বিষয়। মহাকাব্যের আবেগ, যুদ্ধের উত্তেজনা কিংবা চরিত্রের ব্যক্তিগত সংকট এসব মুহূর্তে সংগীত দর্শকের অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
কিন্তু এত বড় আয়োজনের পরও শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়; পরিচিত গল্পটিকে কতটা নতুন ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারবেন নির্মাতারা? দর্শক যদি গল্পের সঙ্গে আবেগের সংযোগ খুঁজে পান, চরিত্রগুলোকে বিশ্বাস করতে পারেন এবং দৃশ্যায়নে মুগ্ধ হন, তাহলে ‘রামায়ণ’ বড় বাণিজ্যিক সাফল্যের পথ তৈরি করতে পারে। আর প্রত্যাশার তুলনায় গল্প দুর্বল মনে হলে শুধু বিশাল আয়োজন দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে।
বড়দিনে শাহরুখের ‘কিং’
নভেম্বরের মহাকাব্যিক আবহ পেরিয়ে ডিসেম্বরের শেষ দিকে সিনেমাপ্রেমীদের সামনে অপেক্ষা করছে আরেকটি বড় আয়োজন। এবার গল্পের কেন্দ্রে শাহরুখ খান। ‘কিং’ নিয়ে বড় পর্দায় ফিরছেন বলিউডের এই সুপারস্টার, আর তাঁর নতুন রূপ ঘিরেই তৈরি হচ্ছে আলাদা উত্তেজনা।
সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত ছবিটি ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৬ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য নির্ধারিত হয়েছে। ছবিতে শাহরুখের সঙ্গে রয়েছেন সুহানা খান, দীপিকা পাড়ুকোন, অভিষেক বচ্চন, রানি মুখার্জিসহ আরও অনেকে।
শাহরুখের নামের সঙ্গে দর্শকের আবেগের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রোমান্টিক নায়ক থেকে অ্যাকশন তারকা বিভিন্ন সময়ে নানা রূপে পর্দায় হাজির হয়েছেন তিনি। ‘কিং’ এ তাঁর চরিত্র কেমন হবে, কতটা তীব্র হবে অ্যাকশন, আর গল্পের ভেতরে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে এসব প্রশ্নই এখন দর্শকের আগ্রহের জায়গা।

ছবিটির প্রচারসামগ্রীতে শাহরুখের নতুন লুকও আলোচনায় এসেছে। তবে সেই লুকের বাইরেও সিনেমাটির বড় পরীক্ষা হবে চরিত্র ও গল্পের নির্মাণ। দর্শক শুধু পরিচিত তারকাকে নতুন পোশাকে দেখতে হলে যাবেন না; তাঁরা চাইবেন এমন একটি গল্প, যেখানে চরিত্রের নিজস্বতা থাকবে, অ্যাকশন দৃশ্যের পাশাপাশি আবেগও কাজ করবে।
এই সিনেমার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ শাহরুখ ও সুহানা খানের একসঙ্গে অভিনয়। বাস্তবের বাবা-মেয়েকে প্রথমবার বড় পর্দায় একসঙ্গে দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সুহানার অভিনয়, শাহরুখের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন এবং গল্পে তাঁদের সম্পর্ক কীভাবে ফুটে উঠবে, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে। তবে এই জুটি দর্শকের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করবে, তার উত্তর মিলবে সিনেমাটি দেখার পরই।
অন্যদিকে, ‘পাঠান’ এর পর সিদ্ধার্থ আনন্দের সঙ্গে শাহরুখের পুনর্মিলন ছবিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও আলোচনায় এনেছে। পরিচালকের অ্যাকশননির্ভর নির্মাণশৈলী আর শাহরুখের তারকাখ্যাতি একসঙ্গে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে ‘কিং’এর অন্যতম বড় পরীক্ষা।
আর মুক্তির সময়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ ডিসেম্বর ছবিটি মুক্তি পেলে বড়দিনের ছুটি ও বছরের শেষের উৎসবের আবহ দর্শক টানার সুযোগ তৈরি করতে পারে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখার পরিকল্পনা, ছুটির দিনের অবসর এবং বড় তারকার নতুন ছবি সবকিছু মিলিয়ে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে ছুটির সুবিধা পেলেই কোনো সিনেমার ব্যবসা নিশ্চিত হয়ে যায় না। একই সময়ে অন্য বড় ছবি থাকলে দর্শকের মনোযোগ ভাগ হতে পারে। আবার প্রথম দিনের ভালো আয় হলেও পরবর্তী দিনগুলোতে দর্শক কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ‘কিং’এর জন্যও বড় উদ্বোধনী আয়ের পাশাপাশি দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ধরে রাখা জরুরি হবে।
‘রামায়ণ’ নাকি ‘কিং’, বক্স অফিসে এগিয়ে থাকবে কে?
এবার আসা যাক আসল প্রশ্নে। বছরের শেষ ভাগে এই দুই সিনেমার মধ্যে কোনটি বেশি আলোচনায় থাকবে, আর কোনটি শেষ পর্যন্ত বক্স অফিসে এগিয়ে যাবে? দুটি ছবির শক্তির জায়গা আলাদা। ‘রামায়ণ’ এর রয়েছে পরিচিত মহাকাব্য, বহু প্রজন্মের আবেগ, বড় তারকাবহর এবং বিশাল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে ‘কিং’ এর প্রধান শক্তি শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তা, নতুন চরিত্রের আকর্ষণ, অ্যাকশনধর্মী উপস্থাপনা এবং বড়দিনের ছুটির সময়সূচি।
‘রামায়ণ’ যদি গল্পের আবেগ ও দৃশ্যায়নের সমন্বয়ে দর্শককে মুগ্ধ করতে পারে, তাহলে বিভিন্ন বয়সী দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। আর ‘কিং’ যদি শাহরুখের তারকাখ্যাতির সঙ্গে শক্তিশালী গল্প ও জমজমাট বিনোদনের সমন্বয় ঘটাতে পারে, তাহলে বছরের শেষের ছুটিতে ছবিটি বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে দুটি ছবির বক্স অফিস তুলনা করতে গেলে শুধু প্রথম দিনের আয় দেখলেই হবে না। আগাম বুকিং থেকে বোঝা যেতে পারে মুক্তির আগে দর্শকের আগ্রহ কতটা। প্রথম দিনের সংগ্রহ দিতে পারে প্রাথমিক সাফল্যের ইঙ্গিত। কিন্তু প্রথম সপ্তাহের পরও দর্শক হলে আসছেন কি না, মুখে মুখে প্রশংসা ছড়াচ্ছে কি না এবং ছবির আয় কত দিন ধরে ভালো থাকছে এসব বিষয়ই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ছবি পরিষ্কার করবে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব রয়েছে। বক্স অফিসের মোট আয় আর প্রযোজকের লাভ এক নয়। টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ প্রযোজকের হাতে আসে না। প্রেক্ষাগৃহের অংশ, পরিবেশকের হিসাব, প্রচার-প্রচারণার ব্যয় এবং অন্যান্য খরচও বিবেচনায় নিতে হয়। ফলে কোনো সিনেমা বিপুল অর্থ আয় করলেও তার বাজেট ও অন্যান্য ব্যয়ের তুলনায় সেই আয় যথেষ্ট নাও হতে পারে।
এ কারণেই মুক্তির আগেই কোনো ছবিকে নিশ্চিত ‘হিট’ বা ‘সুপারহিট’ বলে ঘোষণা করা ঠিক হবে না। তারকাদের জনপ্রিয়তা দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে আনতে পারে, কিন্তু তাঁদের আবার হলে ফেরানোর জন্য প্রয়োজন ভালো গল্প ও সন্তোষজনক সিনেমার অভিজ্ঞতা।
শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করবে কোন সিনেমা?
নভেম্বরের ‘রামায়ণ’ থেকে ডিসেম্বরের ‘কিং’ বছরের শেষ দুই মাসে ভারতীয় সিনেমার সামনে রয়েছে দুটি বড় আয়োজন। একটিতে প্রাচীন মহাকাব্যের আবেগকে নতুন করে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা, অন্যটিতে শাহরুখ খানের তারকাখ্যাতি ও নতুন চরিত্রের আকর্ষণ।
দুটি ছবির মধ্যে কোনটি বেশি আয় করবে, তা নিয়ে আলোচনা চলতেই পারে। কিন্তু এখনই বিজয়ী ঘোষণা করার সময় আসেনি। ‘রামায়ণ’ যদি তার বিশাল জগৎ ও পরিচিত গল্পের মাধ্যমে দর্শকের আবেগ ছুঁতে পারে, তাহলে সেটি বড় সাফল্যের পথে এগোতে পারে। অন্যদিকে, ‘কিং’ যদি তারকাখ্যাতির সঙ্গে গল্প, অ্যাকশন ও আবেগের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তাহলে বড়দিনের বাজারে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই লড়াই শুধু দুই তারকা বা দুই সিনেমার নয়; এটি দর্শকের সময়, অর্থ ও প্রত্যাশা জয়ের লড়াই। প্রচারণার আলো নিভে যাবে, মুক্তির দিনের উত্তেজনাও একসময় কমবে। তখন থেকে যাবে সিনেমার গল্প, দর্শকের প্রতিক্রিয়া আর বক্স অফিসের হিসাব।
আর সেই হিসাবই বলে দেবে, বছরের শেষ দুই মাসে কোন সিনেমা শুধু আলোচনায় ছিল, আর কোনটি সত্যিকারের সাফল্যের গল্প লিখতে পেরেছে।









