বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
গাজা সংঘাত নিয়ে “নীরবতা” এবং প্রতিবাদী শিল্পীদের “সেন্সর” করার অভিযোগ তুলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে বার্লিনালকে চিঠি দিলো ৮১ তারকা। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষকে একটি উন্মুক্ত চিঠি লিখেছেন উৎসবের বর্তমান-সাবেক ৮১ জন অংশগ্রহণকারী। চিঠিতে তারা অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতার বিষয়ে অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত নৈতিক দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেতা টিল্ডা সুইনটন, হাভিয়ের বারদেম, অ্যাঞ্জেলিকি পাপুলিয়া, সালেহ বাকরি, তাতিয়ানা মাসলানি, পিটার মুলান ও টোবিয়াস মেনজিস। পাশাপাশি পরিচালক মাইক লি, লুকাস ধোঁ, ন্যান গোল্ডিন, মিগেল গোমেস, অ্যাডাম ম্যাককে ও আভি মোগরাবিও এতে স্বাক্ষর করেছেন।

চিঠিতে শিল্পীরা বলেন, তারা প্রত্যাশা করেন যে চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিষ্ঠানগুলো ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীরব সমর্থন বা সহযোগিতায় যুক্ত থাকবে না।
চিঠিতে বার্লিনাল ২০২৬-এর আসরের উদ্বোধনী সংবাদ সম্মেলনে জুরি প্রধান উইম ওয়েন্ডার্স-এর মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। যা থেকেই মূলত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
গাজা পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের প্রতি জার্মান সরকারের সমর্থন-যা উৎসবের বড় অংশের অর্থায়নও করে- বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জুরি প্রধান উইম ওয়েন্ডার্স বলেন, “আমাদের রাজনীতির বাইরে থাকা উচিত।” এছাড়াও তিনি দাবি করেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ ‘রাজনীতির ঠিক বিপরীত।’
এই মন্তব্যের পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে উৎসব থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন ভারতীয় চিন্তাবিদ ও লেখক অরুন্ধতী রায়। এরপর উৎসব পরিচালক ট্রিসিয়া টাটল- এক বিবৃতিতে বলেন, “শিল্পীদের কাছ থেকে এমন প্রত্যাশা করা উচিত নয় যে, কোনো উৎসবের অতীত বা বর্তমান কার্যক্রম- যেগুলোর ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই- সেসব বৃহত্তর বিতর্কে তারা মন্তব্য করবেন।”
ফিলিস্তিন ইস্যুতে বার্লিনালকে দেয়া তারকাদের চিঠির সারমর্ম
তাদের এমন বক্তব্যের পরেই তারকারা উন্মুক্ত চিঠি লিখেন। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা জুরি প্রধান উইম ওয়েন্ডার্স -এর বক্তব্যের সঙ্গে “দৃঢ়ভাবে দ্বিমত” পোষণ করেন। তাদের ভাষায়, চলচ্চিত্র ও রাজনীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই-“একটিকে অন্যটির থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।”
চিঠিতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে এ বিষয়ে মনোভাব দ্রুত বদলাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, ইতোমধ্যে ৫ হাজারের বেশি চলচ্চিত্রকর্মী-যাদের মধ্যে হলিউডের বেশ কয়েকজন পরিচিত নামও রয়েছেন-তথাকথিত “সহযোগী” ইসরায়েলি চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়েছে, অতীতে বার্লিনাল ইরান ও ইউক্রেনের মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত “নৃশংসতা” নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে স্বাক্ষরকারীরা উৎসব কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের “গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের” বিরোধিতা করে পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া, সমালোচনা ও জবাবদিহির দাবি থেকে ইসরায়েলকে আড়াল করার সব ধরনের সম্পৃক্ততা বন্ধ করা এখন তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ওই উন্মুক্ত চিঠিতে নিজেদের চলচ্চিত্রকর্মী ও বর্তমান-সাবেক বার্লিনালে অংশগ্রহণকারী হিসেবে পরিচয় দেন। এতে স্বাক্ষরকারীরা বলেন, তারা প্রত্যাশা করেন যে, তাদের শিল্পক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতায় কোনোভাবে সহযোগী হবে না।
শিল্পীদের উপর নজরদারি
চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ইসরায়েলি অভিযানের বিরোধিতা করা শিল্পীদের “সেন্সর” করতে উৎসব কর্তৃপক্ষ জড়িত রয়েছে। প্যালেস্টাইন ফিল্ম ইন্সটিটিউট-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, উৎসবটি ফেডারেল পুলিশের তদন্তে সহযোগিতা করে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর নজরদারিও চালিয়েছে।
গত বছর বার্লিনালে মঞ্চ থেকে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলা কয়েকজন নির্মাতা পরে উৎসব কর্তৃপক্ষের তীব্র ভৎসনার মুখেও পড়েন বলে অভিযোগ করা হয়। এমনকি একজন নির্মাতাকে পুলিশের তদন্তের মুখেও পড়তে হয়েছিল। এতে শিল্পীদের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে একজন শিল্পী জার্মানির বর্তমান অবস্থানকে ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
এছাড়া স্বাক্ষরকারীরা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইতোমধ্যে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রামাণ্যচিত্র উৎসব ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি ফেস্টিভ্যাল আমস্টারডাম, যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাকস্টার ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং বেলজিয়ামের ফিল্ম ফেস্ট জেন্ট-সহ বিভিন্ন উৎসব ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক বয়কট সমর্থন করেছে। পাশাপাশি পাঁচ হাজারের বেশি চলচ্চিত্রকর্মী তথাকথিত সহযোগী ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ না করার ঘোষণা দিয়েছেন।
চিঠির উপসংহারে বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের জীবন, মর্যাদা ও স্বাধীনতার অধিকার স্বীকার করে এবং চলমান সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া এখন বার্লিনালের ন্যূনতম দায়িত্ব।
ভ্যারাইটি ও ফার আউট ম্যাগাজিন অবলম্বনে।


