অরুন্ধতী রায়
ভারতের প্রখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব প্রত্যাখ্যান করেছেন।তিনি জানিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে উৎসবের জুরি সদস্যদের করা “অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য” তাকে “স্তম্ভিত ও ঘৃণাবোধে আচ্ছন্ন” করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এই উৎসব এবং শেষ হবে ২২ ফেব্রুয়ারি।
এ বছরের বার্লিনালে -এর উদ্বোধনী দিনেই রাজনীতি–সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে জুরি প্রধান ভিম ভেন্ডার্স–এর প্রতিক্রিয়া ব্যাপক শিরোনাম ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।
এর জেরেই সাধারণত রাজনৈতিকভাবে সরব এই উৎসবটি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন খ্যাতিমান ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায়।
বার্লিনে অরুন্ধতী রায়ের ‘In Which Annie Give It Those Ones’ শিরোনামের ১৯৮৯ সালের ক্যাম্পাস কমেডি চলচ্চিত্রটি ক্লাসিকস বিভাগে প্রদর্শনের কথা ছিল। এটি লিখেছেন অরুন্ধতী রায় এবং পরিচালনা করেছেন প্রদীপ কৃষেন।

চলচ্চিত্রটিতে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহরুখ খান এবং মনোজ বাজপেয়ি, যারা তখন দিল্লির থিয়েটার জগতে নতুন এবং প্রতিভাবান অভিনেতা হিসেবে মাত্র শুরু করেছেন তাদের অভিনয়যাত্রা।
অনুষ্ঠানে গাজা প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে বলা হলে জুরি সদস্যদের দেওয়া “অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্য”–এর প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি আর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না বলে জানিয়েছেন।
অরুন্ধতী রায় যে বক্তব্যে আশাহত হয়েছেন
বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ভিম ভেন্ডার্স বলেন, “আমাদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ যদি আমরা সচেতনভাবে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বানাতে যাই, তাহলে আমরা সরাসরি রাজনীতির ক্ষেত্রেই প্রবেশ করি।

কিন্তু আমরা রাজনীতির প্রতিপক্ষ—আমরা রাজনীতির ঠিক বিপরীত অবস্থানে। আমাদের কাজ মানুষের জন্য কাজ করা, রাজনীতিবিদদের কাজ করা নয়।”
এদিকে, গাজায় চলমান সংঘাত এবং উৎসবের অর্থায়নকারী জার্মানি সরকারের ইসরায়েল–সমর্থন নিয়ে জুরিকে প্রশ্ন করা হলে, সহ–জুরি সদস্য এভা পুশ্চিনস্কাও মন্তব্য করতে আপত্তি জানান।
তিনি বলেন, “পৃথিবীতে আরও অনেক যুদ্ধ চলছে, যেখানে গণহত্যা ঘটছে-সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলি না। তাই এটি খুব জটিল একটি প্রশ্ন। আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা-আমরা কী ভাবি, কীভাবে সমর্থন করি বা করি না, কিংবা নিজেদের সরকারের সঙ্গে কথা বলব কি না—এটা কিছুটা অন্যায্য।”
অন্যদিকে, নিজের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে দেওয়া বিবৃতিতে—যা প্রথমে ভারতীয় প্রকাশনা দ্য ওয়্যার–এ প্রকাশিত হয় সেখানে খ্যাতিমান লেখক অরুন্ধতী রায় বলেন, “তাদের মুখে ‘শিল্প যেন রাজনৈতিক না হয়’—এমন কথা শোনা সত্যিই স্তম্ভিত করার মতো।”
তিনি আরও বলেন, “এটি এমন একটি উপায়, যার মাধ্যমে আমাদের চোখের সামনে বাস্তব সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া হয়—যখন শিল্পী, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উচিত তাদের সব শক্তি দিয়ে সেটি থামানোর চেষ্টা করা।”
অরুন্ধতী রায় বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব প্রত্যাখ্যান করে যা লিখেছেন
নিচে অরুন্ধতী রায়–এর পূর্ণ বিবৃতির অনুবাদ:
‘In Which Annie Gives It Those Ones’—আমার ৩৮ বছর আগে লেখা একটি খেয়ালি চলচ্চিত্র ২০২৬ সালের বার্লিনালে ক্লাসিকস বিভাগে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। বিষয়টি আমার কাছে খুবই মধুর ও আনন্দের ছিল।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে জার্মানি সরকার এবং বিভিন্ন জার্মান সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থানে আমি গভীরভাবে বিচলিত হলেও, গাজায় সংঘটিত গণহত্যা নিয়ে জার্মান দর্শকদের সামনে আমার মত প্রকাশের সময় সবসময় রাজনৈতিক সংহতি পেয়েছি। এ কারণেই আমি বার্লিনালে ‘অ্যানি’–র প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার কথা ভাবতে পেরেছিলাম।

আজ সকালে, (১৩ ফেব্রুয়ারি) বিশ্বের কোটি মানুষের মতো আমিও বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি সদস্যদের সেই অবিবেচনাপ্রসূত বক্তব্য শুনেছি, যখন তাদের গাজায় গণহত্যা নিয়ে মন্তব্য করতে বলা হয়েছিল। তাদের মুখে ‘শিল্প যেন রাজনৈতিক না হয়’—এমন কথা শোনা সত্যিই স্তম্ভিত করার মতো। এটি এমন এক উপায়, যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যখন সেটি আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে—যখন শিল্পী, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উচিত সেটি থামাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই: গাজায় যা ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে, তা হলো ইসরায়েল রাষ্ট্রের হাতে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চালানো একটি গণহত্যা। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশের সরকারের সমর্থন ও অর্থায়নে পরিচালিত-যার ফলে তারাও এই অপরাধে জড়িত।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীরা যদি এ বিষয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারেন, তাহলে তাদের জানা উচিত—ইতিহাস তাদের বিচার করবে। আমি বিস্মিত ও ঘৃণাবোধ করছি।
গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমি বার্লিনালে অংশগ্রহণ করব না।’
— অরুন্ধতী রায়
শিল্প কি অরাজনৈতিক?
শিল্প অরাজনৈতিক নয়। বরং এর থেকে প্রতীয়মান হয় অরুন্ধতী রায়–এর বার্লিনাল থেকে সরে দাঁড়ানো শুধুমাত্র একটি উৎসবে অংশ না নেওয়ার ঘটনা নয়। এটি শিল্প, রাজনীতি এবং নৈতিক দায়িত্বের জটিল সংযোগকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে শিল্প কখনো অরাজনৈতিক কিছু নয় এবং মানবিক বিপর্যয়কে পাশ কাটিয়ে শিল্প কেবল মনোরঞ্জনের বিষয় হয়ে দাঁড়ালে মানুষ হিসেবে আমরা খুবই হীনকায় হয়ে উঠি।


