যুগসন্ধিক্ষণের সিনেমা
বাংলাদেশি সিনেমার ইতিহাসে একেবারেই কম কিংবা ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পেতে যাওয়া সিনেমার ইতিহাসে এই প্রথমই বলা যায় বাংলাদেশের মানুষ এমন এক সাংস্কৃতিক ও সিনেম্যাটিক মুহূর্তের মধ্যে বিরাজ করছে যেখানে চলচ্চিত্র বাজারি অনুভূতির বাহিরে গিয়ে হয়ে উঠেছে দর্শন ও শিল্পভাবনার খোরাক। বনলতা সেন ও রইদ সেই ইতিহাসেরই অংশ।
‘বনলতা সেন’ এবং ‘রইদ’ ঠিক সেই ধরনের দুই সিনেমাটিক শক্তি যা ঈদে মুক্তি পেতে চলেছে। এর একটি কবিতার শরীর থেকে জন্ম নেওয়া চলচ্চিত্র, অন্যটি লোককথা, আদিম ভয়, প্রকৃতি ও মিথের গর্ভ থেকে উঠে আসা সিনেমা। ফলে, বনলতা সেন ও রইদ- জনতার মনস্তত্ত্বে শিল্প-দর্শন ফেরানোর দুই দিকপাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সম্ভবত এটা এক যুগসন্ধিক্ষণ যেখানে বাংলাদেশি সিনেমা আগের বাজারিপনার ভিতর ঢুকবে না। কিংবা এই দুই সিনেমা আমাদের প্রচ্ছন্নভাবে তাই বলছে। মানুষকে আনন্দ উদ্দীপনা বিষণ্নতা কিংবা দৃশ্যায়নের মাধ্যমে ফেরাতে হবে মৌলিক ভাবনায় এমনটাই বলছে সিনেমা দুটি।
এই দুই সিনেমার মধ্যে বক্স অফিসে প্রতিযোগিতা হলেও আদতে এই দুটি সিনেমাই দর্শনের অন্যতম উপাদান। শিল্পের কুপি জ্বালিয়ে চলেছে প্রতিটি দৃশ্যে, বর্ণনায়, গানে ও চিন্তায়। তবে এই দুই সিনেমার মাঝে পার্থক্যের জায়গাও আছে। সাহিত্য বনাম মৌখিক লোকঐতিহ্য, স্মৃতি বনাম প্রবৃত্তি, সভ্যতা বনাম প্রকৃতি, বিষণ্নতা বনাম পৌরাণিক অন্ধকারের লড়াই চলবে এই দুই সিনেমার মাঝে।
বনলতা সেন
‘বনলতা সেন’ মূলত জীবনানন্দ দাসের কবিতার অন্তর্জগতকে ধারণ করে। কিন্তু এই কবিতার বিশেষত্ব হলো, এখানে প্রচলিত গল্পের কাঠামো নেই। এখানে কোনো নায়কোচিত সংঘর্ষ নেই, নেই নাটকীয় পরিণতি। আছে কেবল একজন ক্লান্ত মানুষের দীর্ঘ যাত্রা এবং সেই যাত্রার শেষে একটি মুখ, একটি আশ্রয়, একটি শান্তি।
কবি জীবনানন্দ দাসের এই কালজয়ী কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৫ সালের ডিসেম্বরে, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায়। পরে ১৯৪২ সালে এটি কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ পায়।
এখানে “বনলতা” সম্ভবত কোনো নারী নন, বরং এক সাইকোলজিক্যাল স্পেস। এক ক্লান্ত মানুষের শেষ আশ্রয়।এক সভ্যতার পরাজয়ের পরও বেঁচে থাকার প্রেরণা।
এই কারণেই বনলতা সেনকে সিনেমায় রূপ দেওয়া মানে গল্প বলা নয়, বরং অনুভূতির স্থাপত্য নির্মাণ করা। এই চলচ্চিত্রের শক্তি সংলাপে নয়, নীরবতায় ও দৃশ্যায়নে। এখানে ধীর গতি, নিঃসঙ্গ ফ্রেম, আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং মানসিক শূন্যতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রইদ
অন্যদিকে ‘রইদ’ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে মানুষ সভ্য সমাজের প্রতিনিধি নয়, বরং প্রকৃতির অংশ। কাদা, বৃষ্টি, শরীর, ক্ষুধা, অন্ধকার, সবকিছু মিলিয়ে এটি এক আদিম পৃথিবী নির্মাণ করতে চায়।
যদি ‘বনলতা সেন’ সাহিত্যিক অনুভূতির বিস্তার হয়, তাহলে ‘রইদ’ হলো লোকমিথের পুনর্জন্ম। লোককথা সবসময় মানুষের গভীর অবচেতন ভয় ও প্রবৃত্তির ভাষা। এখানে চরিত্ররা কেবল মানুষ নয়, প্রতীক হয়ে ওঠে। পুরুষ হয়ে ওঠে নির্বাসিত মানুষ বা শিকারি। নারী হয়ে ওঠে রহস্য, উর্বরতা কিংবা ভয়। প্রকৃতি হয়ে ওঠে নিয়তি বা শাস্তির শক্তি।
এই জায়গাতেই ‘রইদ’ আদম-হাওয়ার গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কারণ আদম-হাওয়ার কাহিনিও মূলত সভ্যতা হারানোর গল্প। স্বর্গ থেকে পতনের পর মানুষ প্রথম আবিষ্কার করেছিল শরীর, ক্ষুধা, ভয়, শ্রম ও মৃত্যু। রইদ যেন সেই পতনের পরের পৃথিবীর সিনেমা।
দুটি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় পার্থক্য তাদের সময় ব্যবহারে। ‘বনলতা সেন’-এ সময় মানসিক। একটি স্মৃতি অন্য স্মৃতিকে ডাকে। এখানে সময় ধীর, বিষণ্ন ও পুনরাবৃত্তিময়।
অন্যদিকে ‘রইদ’-এ সময় প্রকৃতির মতো চক্রাকার। দিন-রাত, বর্ষা-খরা, জন্ম-মৃত্যু সবকিছুই পুনরাবৃত্ত হয়। লোকমিথ সবসময় এই চক্রাকার সময়ের ভিতরে বাস করে।
সিনেমাটোগ্রাফির দিক থেকেও দুটি সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ মিল ও পার্থক্য বহন করবে। বনলতা সেনে আছে স্থির দৃশ্য, দীর্ঘ শট, ম্লান রঙ, নরম শব্দ ও স্মৃতিময় পরিবেশ। এখানে প্রতিটি ফ্রেম যেন অতীতের একটি কক্ষ।
অন্যদিকে রইদে আছে আলো ছায়ার খেলা, প্রাকৃতিক আলো, ভেজা মাটির গন্ধ, ঘন শব্দমণ্ডল এবং শরীরের উপস্থিতি, বিষণ্নতা। এখানে প্রতিটি দৃশ্য বেঁচে থাকার সংগ্রামের মতো।
নারীর ভূমিকা
এছাড়াও দুই চলচ্চিত্রেই নারী চরিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে তাদের ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা।
“বনলতা সেন”-এ নারী শান্তির প্রতীক। তিনি ক্লান্ত সভ্য মানুষের শেষ আশ্রয়। তিনি প্রায় বাস্তবতার বাইরে এক স্বপ্নময় উপস্থিতি। কিংবা হারায়ে যাওয়া ইনকা সভ্যতার স্মৃতিময় জাদুঘর বনলতা সেন।
কিন্তু “রইদ”-এর নারী রহস্যময় ও বিপজ্জনকও হতে পারেন। তিনি প্রকৃতিরই এক সম্প্রসারণ। এখানে নারী কোনো চরিত্র নয়, বরং এক শক্তি।
বাংলাদেশি সিনেমার জন্য এই দ্বন্দ্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের চলচ্চিত্র তারকাকেন্দ্রিকতা ও অতিরিক্ত সংলাপনির্ভর কাঠামোর ভিতরে আটকে ছিল। কিন্তু “বনলতা সেন” ও “রইদ” দেখাচ্ছে যে বাংলা সিনেমা আবার চিত্রভাষা, নীরবতা, লোকঐতিহ্য ও সাহিত্যিক বিমূর্ততার দিকে ফিরছে।
বিশ্ব সিনেমায় বর্তমানে লোকভিত্তিক ভৌতিকতা, ধীরগতির চলচ্চিত্র, পৌরাণিক বাস্তবতা ও সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্রের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশি সিনেমাও ধীরে ধীরে সেই ভাষায় প্রবেশ করছে।
শেষ পর্যন্ত ‘বনলতা সেন’ ও ‘রইদ এর লড়াই আসলে দুই ধরনের মানুষের লড়াই। একজন মানুষ পৃথিবী ঘুরে শেষে শান্তি খোঁজে। অন্যজন এখনো প্রকৃতির অন্ধকারের সঙ্গে লড়ছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন নারীকে পৃথিবীর আদিম উৎস, রস বলে সম্বোধন করেছেন, যার কোমলতা আছে গভীরতা, জটিলতা ও বহু অনাবিষ্কৃত স্তর। তেমনই সিনেমা হতে যাচ্ছে রইদ।
তাই বলা যায় জীবনানন্দের মানুষ পৃথিবী ঘুরে এসে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় খোঁজে একটি মুখে।
অন্যদিকে মিথের মানুষ আশ্রয় হারিয়ে প্রকৃতির ভিতর নির্বাসিত হয়।
