বাংলাদেশী নারী নির্মাতা
ঢাকাই সিনেমায় নারী নির্মাতার সংখ্যা খুবই অল্প। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা বাধার মুখে অনেক নারীই জয় করে উঠতে পারেন না তাদের স্বপ্নকে। যারা নির্মাতা হতে চান তাদের জন্য এই পথ আরো কঠিন। এ ছাড়া বিনিয়োগের অভাবেও অনেক নারী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে সাহস করেন না। এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নানান সময়ে বেশ কয়েকজন নারী নির্মাতা সিনেমা নির্মাণের মতো জায়গায় এসেছেন। এই লেখায় সংক্ষেপে সেসকল বাংলাদেশী নারী সিনেমা পরিচালকদের পরিচয় ও সিনেমা তুলে ধরা হল।
রেবেকা (মনজর আরা বেগম)

বাংলাদেশের সিনেমা জগতে প্রথম নারী নির্মাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন রেবেকা। পুরো নাম মনজর আরা বেগম। ১৯৭০ সালে ‘বিন্দু থেকে বিসর্গ’ নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। সিনেমাটি সেসময় বেশ প্রশংসাও কুড়ায়। রেবেকা ১৯৪১ সালে পাবনার হায়দারপুরে জন্মগ্রহন করেন। তিনি মূলত একজন অভিনেত্রী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৬৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘এইতো জীবন’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীকালে ‘মালা’, ‘বাহানা’, ‘উলঝন’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন তিনি। এরপর ১৯৭০ সালে সিনেমা নির্মাণ করেন তিনি। এটি ছিল বাংলাদেশের কোন নারী নির্মাতার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র। এরপরে তিনি আর সিনেমা নির্মাণ করেননি। এছাড়া তিনি একজন ভাস্কর ও কবিও ছিলেন। স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও অবদান রেখেছিলেন।
কোহিনুর আক্তার সুচন্দা

নায়িকা হিসেবেই অধিক পরিচিত সুচন্দা। তিনি জহির রায়হানের সহধর্মিনী। অভিনয় ছেড়ে একটা সময় চলচ্চিত্র পরিচালনায় এসেছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘সবুজ কোট কালো চশমা’ নামের একটি সিনেমা। এরপর ২০০২ সালে তিনি ফের নির্মাণ করেন জহির রায়হানের উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে হাজার বছর ধরে। এ চলচ্চিত্রটি এখনো দর্শক হৃদয়ে জায়গাজুড়ে বিস্তার করছে। সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ বেশ কয়েকটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে।
নারগিস আক্তার

নারগিস আক্তার ছিলেন সমাজকল্যাণের ছাত্রী। শিক্ষা জীবনে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সিনেমা নির্মাণে আসেন তিনি। ২০০১ সালে এইডস নিয়ে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র ‘মেঘলা আকাশ’ দিয়ে পরিচালনায় আসেন নারগিস। ২০০৫ সালে বহুবিবাহের অন্যায়কে উপজীব্য করে সেলিনা হোসেনের গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘চার সতীনের ঘর’ সিনেমা। ২০০৮ সালে মুক্তি পায় তাঁর ‘মেঘের কোলে রোদ’ সিনেমা। ২০১০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ছোটগল্প সমাপ্তি অবলম্বনে নির্মাণ করেন অবুঝ বউ। এটি ৩৫তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা চিত্রনাট্য, সুর ও সম্পাদনার তিনটি পুরস্কার ঘরে তোলে। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম বাংলাদেশী নারী। ২০১৫ সালে তিনি নির্মাণ করেন সিনেমা ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’। নরেন্দ্রনাথ মিত্র রচিত গল্প ‘রস’ অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন পৌষ মাসের পিরীত (২০১৬)। এছাড়া নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন রচিত মঞ্চনাটক ‘যৈবতী কন্যার মন’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তিনি ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকার থেকে অনুদান পান। এটি পরে ২০২১ সালে এসে মুক্তি পায়।
সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি ‘মেহেরজান’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এটি ছিলো তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র। ছবিটি দেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এতো আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বিদেশে পুরস্কৃতও হয় ছবিটি। এরপর তিনি ‘আন্ডার কন্সট্রাকশন’(২০১৫) নির্মাণ করেন। সমকালীন ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত এক নারীর আত্ম-অনুসন্ধানের চিত্র এটি। এরপর তিনি ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’(২০১৯) নামে আরেকটি সিনেমা নির্মাণ করেন। ছবিটির মূল নাম ‘শিমু’। শিমু চলচ্চিত্রটির জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন রুবাইয়াত হোসেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন।
বর্তমানে তাঁর নির্মিত সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ মুক্তির অপেক্ষায় আছে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন,সুনেরাহ্ বিনতে কামাল ও রিকিতা নন্দিনী শিমু।
শাহনেওয়াজ কাকলী

শাহনেওয়াজ কাকলী একাধারে চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও টেলিভিশন পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার। তিনি ২০১২ সালে ‘উত্তরের সুর’ সিনেমা দিয়ে পরিচালনায় আসেন। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এরপর ২০১৫ সালে শেখ জহুরুল হকের গুণ উপন্যাসের কাহিনি অবলম্বনে কাকলী নির্মাণ করেন ‘নদীজন’। এছাড়া তাঁর আরেকটি সিনেমা ‘ ফ্রম বাংলাদেশ’ মুক্তির অপেক্ষায় আছে।
মৌসুমী

ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম চিত্রনায়িকা মৌসুমী। যিনি ২০০৩ সালে ‘কখনও মেঘ কখনও বৃষ্টি’ দিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ছোটগল্প ‘মেহেরনেগার’ অবলম্বনে ২০০৫ সালে মৌসুমী নির্মাণ করেন মেহের নিগার।
সামিয়া জামান

সংবাদকর্মী থেকে রীতিমতো পরিচালক হয়ে যান সামিয়া জামান। ২০০৬ সালে মুক্তি পায় তার নির্মিত ‘রানী কুঠির বাকি ইতিহাস’। ফেরদৌস, পপি অভিনীত এ চলচ্চিত্রটিও দর্শক গ্রহণযোগ্যতা পায়, পাশাপাশি জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। ২০১৪ সালে সামিয়া জামান নির্মাণ করেন তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘আকাশ কত দূরে’। এ ছাড়া বর্তমানে ‘আজব কারাখানা’ নামের একটি সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় আছে।
তানিয়া আহমেদ

পরিচালক হিসেবে আসিফ আকবরের ‘উড়ো মেঘ’ মিউজিক ভিডিও দিয়ে হাতেখড়ি হলেও ২০১২ সালে ‘দ্য এ টিম’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটক পরিচালনা করে নজরে আসেন। অবশেষে ২০১৭ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসা এমনই হয়’।
চয়নিকা চৌধুরী

বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী। একটা সময় নিয়মিত নাটক-টেলিছবি নির্মাণ করলেও এখন চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ২০২০ সালে তার প্রথম ছবি ‘বিশ্বসুন্দরী’ বেশ দর্শকপ্রিয়তা পায়। ২০২৪ সালে ‘কাগজের বউ’ নামে একটি সিনেমা মুক্তি পায়। বর্তমানে মুক্তির অপেক্ষায় আছে ‘প্রহেলিকা’ সিনেমা।
লিসা গাজী

তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী একজন ব্রিটিশ লেখিকা, নাট্যকার, থিয়েটার পরিচালিকা এবং অভিনেত্রী। তিনি ২০২৩ সালে ‘বাড়ির নাম শাহানা’ নামে একটি নাট্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সিনেমাটি এ বছর বাংলাদেশ থেকে ‘অস্কার’ উৎসবে প্রতিযোগিতা করবে। এছাড়া সম্প্রতি তিনি আরেকটি সিনেমা হাতে নিয়েছেন যার নাম ‘শাস্তি’। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচিত ছোটগল্প ‘শাস্তি’ অবলম্বনে নির্মিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে থাকছেন পরিমনি ও চঞ্চল চৌধুরী।


