কোরীয় সিরিজ, তুর্কি নাটক ও ভারতীয় সিনেমা আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে নিজেদের সংস্কৃতি তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের ওটিটি শিল্পেও সেই সম্ভাবনা আছে। ‘তাকদীর’, ‘মহানগর’ ও ‘কারাগার’ এর মতো সিরিজ ইতিমধ্যে দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে। ‘তাকদীর’ আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে, আর ‘কারাগার’ নিয়ে প্রশংসামূলক পর্যালোচনা প্রকাশ করেছে ভারতের দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। এসব উদাহরণ আমাকে আশাবাদী করে। তবে দেশীয় সাফল্যকে বিশ্ববাজারে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে হলে আমাদের সামনে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
‘তাকদীর’, ‘মহানগর’ ও ‘কারাগার’ কী অর্জন করেছে?
বাংলাদেশের ওটিটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ‘তাকদীর’-এর কথা প্রথমেই আসে। সৈয়দ আহমেদ শাওকীর পরিচালনায় সিরিজটি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে হইচইয়ে মুক্তি পায়। চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত একজন ফ্রিজার ভ্যানচালকের জীবনে একটি লাশকে ঘিরে তৈরি হয় রহস্য ও অপরাধের গল্প।
২০২১ সালে ‘তাকদীর’ Promax India Awards-এ ‘Best Regional Web Series of the Year’ বিভাগে গোল্ড পুরস্কার জেতে। প্রতিযোগিতায় ছিল ZEE5 Global, ALTBalaji, Hotstar ও Voot-এর কনটেন্ট। আমার বিবেচনায়, এটি বাংলাদেশের ওটিটি শিল্পের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্জন।

এরপর আলোচনায় আসে ‘মহানগর’। আশফাক নিপুণ পরিচালিত এই ক্রাইম থ্রিলারের গল্প ঢাকার একটি থানাকে কেন্দ্র করে। মোশাররফ করিমের অভিনীত ওসি হারুন চরিত্রটি দর্শকের মধ্যে পরিচিতি পায়। হইচইয়ের ২০২১ সালের পুরস্কারে ‘মহানগর’ বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজের স্বীকৃতি পায়। এটি দেখায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তৈরি একটি গল্প দেশীয় দর্শকের মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
‘কারাগার’-এর ক্ষেত্রেও রহস্যনির্ভর গল্প দর্শকের আগ্রহ তৈরি করে। সৈয়দ আহমেদ শাওকীর পরিচালনায় চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত সিরিজটিতে একটি বন্ধ কারাকক্ষে রহস্যময় বন্দির উপস্থিতি দিয়ে কাহিনি শুরু হয়। ২০২২ সালে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া প্রথম সিজনকে ৫-এর মধ্যে ৪ রেটিং দেয় এবং অভিনয় ও নির্মাণের প্রশংসা করে।

এই তিনটি উদাহরণ থেকে আমি দুটি বিষয় দেখি। প্রথমত, বাংলাদেশের নির্মাতারা স্থানীয় প্রেক্ষাপটে আকর্ষণীয় গল্প তৈরি করতে পারছেন। দ্বিতীয়ত, অন্তত কিছু কাজ দেশের বাইরেও নজর কেড়েছে। তবে একটি পুরস্কার, একটি ইতিবাচক পর্যালোচনা কিংবা আঞ্চলিক জনপ্রিয়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্থায়ী অবস্থান তৈরি হয়েছে, এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
কোরিয়া ও তুরস্কের সাফল্য থেকে কী শেখা যায়?
দক্ষিণ কোরিয়ার ‘স্কুইড গেম’ আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিংয়ের শক্তি বুঝতে সাহায্য করে। ঋণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও টিকে থাকার লড়াই নিয়ে তৈরি সিরিজটি ২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। ওয়্যার্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিরিজটি বিশ্বের ৯০টি দেশের নেটফ্লিক্স র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে উঠেছিল।

আমার কাছে এই সাফল্যের বড় শিক্ষা হলো, গল্পের স্থানীয় পরিচয় বজায় রেখেও আন্তর্জাতিক দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা যায়। ‘স্কুইড গেম’ কোরীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে তৈরি হলেও এর কেন্দ্রীয় সংকট অন্য দেশের দর্শকের কাছেও বোধগম্য হয়েছে।
তুরস্কের ঐতিহাসিক নাটকও দেশটির ইতিহাস, পোশাক, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিকে বিদেশি দর্শকের কাছে পরিচিত করেছে। একইভাবে ভারতীয় সিনেমা দীর্ঘদিন ধরে ভাষা ও দেশের সীমানা পেরিয়ে দর্শক পেয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও এই পথ খোলা। ঢাকার জীবন, প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক বৈষম্য কিংবা গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তন নিয়ে তৈরি গল্প বিদেশি দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে। তবে অন্য দেশের সাফল্যের সূত্র হুবহু অনুসরণ না করে নিজেদের বাস্তবতা থেকেই গল্প তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ওটিটির সামনে বড় সুযোগ কোথায়?
বাংলাদেশের গল্পের উপাদান আমাদের চারপাশেই রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, নদীকেন্দ্রিক জীবন, নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের সংকট এবং বদলে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক, এসব বিষয় থেকে নতুন ধরনের সিরিজ তৈরি করা সম্ভব।
আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে সব সময় বড় বাজেটের প্রয়োজন হয় না। ভালো চিত্রনাট্য, বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়, দক্ষ সম্পাদনা এবং গল্প বলার স্বতন্ত্র ধরন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ‘তাকদীর’ ও ‘মহানগর’-এর মতো সিরিজ নিয়ে দর্শকের আগ্রহ সেই সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
তবে এখানে একটি বাস্তব সমস্যা আছে। বাংলাদেশের দর্শক কোনো সিরিজ সম্পর্কে জানলেও বিদেশি দর্শক সেটির খবর নাও পেতে পারেন। আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে হলে কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি প্রচারণা ও পরিবেশনার পরিকল্পনাও করতে হবে।
আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে কী দরকার?
আমার মতে, প্রথম কাজ হওয়া উচিত গল্প ও নির্মাণের মান ধরে রাখা। পরিচিত অভিনেতা কিংবা আকর্ষণীয় ট্রেলার দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু দুর্বল চিত্রনাট্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য পাওয়া কঠিন।
দ্বিতীয়ত, ভাষার বাধা কমাতে হবে। মানসম্মত ইংরেজি সাবটাইটেল বিদেশি দর্শকের জন্য বাংলা সিরিজ দেখা সহজ করতে পারে। নির্দিষ্ট বাজারের সম্ভাবনা বিবেচনা করে অন্য ভাষার সাবটাইটেল বা ডাবিংও করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পরিবেশনার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। বিদেশি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, পরিবেশক ও চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি কপিরাইট, প্রদর্শনের অধিকার এবং প্রযোজনার অর্থ ফেরত পাওয়ার পরিকল্পনাও স্পষ্ট থাকা দরকার।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশে বাংলা কনটেন্টের প্রাথমিক দর্শক হতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বড় বাজার তৈরি করতে হলে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই, এমন দর্শকের কাছেও পৌঁছাতে হবে। এ জন্য প্রচারণা, ভাষান্তর ও সঠিক প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ওটিটি কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের ওটিটি শিল্পে সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে নিয়মিত সাফল্যে রূপ দেওয়ার কাজ এখনো বাকি। ‘তাকদীর’-এর আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং ‘কারাগার’-এর বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রশংসা দেখায়, বাংলাদেশের কনটেন্ট দেশের বাইরেও স্বীকৃতি পেতে পারে। ‘মহানগর’-এর দর্শকপ্রিয়তা আবার দেশীয় বাজারে শক্তিশালী গল্পের চাহিদার প্রমাণ দেয়।

তবে বিশ্ববাজারে অবস্থান তৈরি করতে কয়েকটি আলোচিত সিরিজ যথেষ্ট নয়। দরকার ধারাবাহিক মানের কনটেন্ট, দক্ষ নির্মাতা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশনার ব্যবস্থা।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের ওটিটির সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো স্থানীয় সাফল্যকে আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমাদের গল্পের নিজস্বতা রয়েছে। সেই গল্পকে ভালোভাবে নির্মাণ করে সঠিক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারলে বাংলাদেশের সিরিজও আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও জায়গা করে নিতে পারে।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার , দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড , দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া









