মুস্তাফা মনোয়ারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়
রাজধানীর বনানীতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন মুস্তাফা মনোয়ার । দাফনের আগে তার মরদেহ নেওয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেখানে সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে মুস্তাফা মনোয়ার এর শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা ও গার্ড অব অনার
মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এস আই সাইফুল আলমের নেতৃত্বে শিল্পীকে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। বিউগলের করুণ সুরে বিদায় জানানো হয় দেশের এই বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে। এর আগে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে মুস্তাফা মনোয়ার এর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর চারুকলা অনুষদে। সেখানে শ্রদ্ধা জানান সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা।
বিটিভিতে মুস্তাফা মনোয়ারের প্রথম জানাজা
সকালে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণেও তাঁর একটি জানাজার আয়োজন করা হয়। এরপর সকাল ১১টার দিকে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হলে সেখানে মানুষের ঢল নামে। দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত হয়ে প্রিয় শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
দীর্ঘদিন ধরেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। সর্বশেষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে দেওয়া হলেও পরে আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় ৯১ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ, শিক্ষক, সংগীতপ্রেমী, নাট্যপ্রযোজক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তাঁর শিল্পকর্মে মুগ্ধ ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ও। শহীদ মিনারের নকশায় রক্তিম সূর্যের সংযোজন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী মঞ্চায়ন-বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কাজে তিনি রেখে গেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর।
পাপেট, টেলিভিশন ও শিশুতোষ অনুষ্ঠানে অনন্য অবদান
১৯৬০ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আমন্ত্রণে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন মুস্তাফা মনোয়ার। পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সৃষ্টি করেন জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র ‘পারুল’। শিশুদের অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ তাঁর হাত ধরেই যাত্রা শুরু করে। ‘মীনা’ ও ‘সিসিমপুর’-এর মতো জনপ্রিয় প্রকল্পেও পরামর্শক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

সংগ্রামী জীবন থেকে একুশে পদক
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ভাষা আন্দোলনের সময় প্রতিবাদী ছবি এঁকে আলোচনায় আসেন এবং সে কারণে কারাবরণও করতে হয়েছিল। কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি দেশের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে অসামান্য অবদান রাখেন। সেই স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে একুশে পদক, ২০১৮ সালে সুলতান স্বর্ণপদক এবং মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
শোকের ছায়া সংস্কৃতি অঙ্গনে
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিদায়ে বাংলাদেশের শিল্পভুবন হারাল এক বহুমাত্রিক স্রষ্টাকে, যার অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।