দীর্ঘ পাঁচ বছর পর চলচ্চিত্রের গানে ফিরলেন সংগীত শিল্পী আগুন। নব্বইয়ের দশকে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ দিয়ে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে প্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ অভিনীত বেশ কয়েকটি সিনেমার জনপ্রিয় গানে তার কণ্ঠ আজও শ্রোতাদের মনে গেঁথে আছেন সংগীত শিল্পী আগুন।

চলচ্চিত্রের গানে আগুন সর্বশেষ কণ্ঠ দিয়েছিলেন ২০২১ সালে ‘শত্রু’ সিনেমায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ বছর। এই সময়ে চলচ্চিত্রের গানে নিয়মিত দেখা যায়নি তাকে। তবে গান থেকে পুরোপুরি দূরে ছিলেন না সংগীত শিল্পী আগুন। এবার বিরতি ভেঙে আবারও প্লেব্যাকের জগতে ফিরেছেন তিনি।
‘স্বপ্নের নায়িকা’র টাইটেল গানে আগুন
সম্প্রতি নির্মাতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর ‘স্বপ্নের নায়িকা’ সিনেমার টাইটেল গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সংগীত শিল্পী আগুন। গানটির কথা লিখেছেন নিশাত তাসনিম ও সরয়ার হোসেন। সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন আনোয়ার শিকদার টিটন। গানটিতে আগুনের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠ দিয়েছেন তানজিনা রুমা।
গানটি প্রসঙ্গে সংগীত পরিচালক আনোয়ার শিকদার টিটন জানান, দেশের চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের অন্যতম গায়ক আগুন। গানটি তৈরির সময় থেকেই তার কথা মাথায় ছিল। পরে সুর ও সংগীতের কাজ শেষ করে আগুনের কাছে গানটি পাঠানো হয়। গানটি তার পছন্দ হয়। এরপর আনন্দ নিয়েই রেকর্ডিংয়ে অংশ নেন তিনি।
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে শুরু
চলচ্চিত্রের গানে আগুনের যাত্রা শুরু হয় সালমান শাহ ও মৌসুমী অভিনীত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। প্রথম সিনেমার গানেই শ্রোতাদের নজর কাড়েন তিনি। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় প্লেব্যাক করেছেন। নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠের কারণে খুব অল্প সময়েই চলচ্চিত্রের গানে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন এই শিল্পী।
চলচ্চিত্রের গানে সাফল্যের দীর্ঘ তালিকা
আগুনের কণ্ঠে জনপ্রিয় সিনেমার গানের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ‘দোলা’, ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘বিক্ষোভ’, ‘দেনমোহর’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘জীবন সংসার’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ও ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ সিনেমার গান শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। এ ছাড়া ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘বিচার হবে’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘আম্মাজান’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘হাছন রাজা’, ‘১ টাকার বউ’ ও ‘আমার আছে জল’সহ আরও অনেক সিনেমায় তার কণ্ঠ শোনা গেছে।
বিশেষ করে সালমান শাহর লিপে আগুনের গাওয়া গানগুলো নব্বইয়ের দশকের শ্রোতাদের কাছে আলাদা জায়গা তৈরি করে। ‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে’, ‘এখন তো সময় ভালোবাসার’, ‘জ্বলে পুড়ে মরার মাঝে যদি কোনো সুখ থাকে’ এবং ‘বৃষ্টিরে বৃষ্টি আয় না ঝরে’সহ বেশ কিছু গান এখনো শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। সালমান শাহর পর্দার উপস্থিতির সঙ্গে আগুনের কণ্ঠের এই সংযোগ বাংলা চলচ্চিত্রের গানের ইতিহাসে আলাদা একটি অধ্যায় হয়ে আছে।
তবে শুধু চলচ্চিত্রের গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না আগুনের ক্যারিয়ার। একক শিল্পী হিসেবেও তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। তার একক অ্যালবামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কী যে কান্না পেয়েছিল’, ‘কতো দুঃখে আছি’, ‘এই শহরে’, ‘আগের মতো নেই’ ও ‘সানাই’। এসব অ্যালবামের গানেও নিজের স্বতন্ত্র গায়কির পরিচয় দিয়েছেন তিনি।

১৯৭১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জন্মগ্রহণ করেন আগুন। নিজের জন্ম নিয়ে বরাবরই গর্ব করেন তিনি। তার পুরো নাম খান আসিফুর রহমান। সংগীতাঙ্গনে অবশ্য ‘আগুন’ নামেই পরিচিত তিনি।
সংগীতশিল্পী আগুনের জন্মও হয়েছে সংস্কৃতিচর্চায় সমৃদ্ধ একটি পরিবারে। তার বাবা ছিলেন কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ ও চলচ্চিত্রকার খান আতাউর রহমান। অভিনয়, গান, সুর, গীত রচনা, চিত্রনাট্য ও নির্মাণ বহু ক্ষেত্রে তার অবদান রয়েছে। আগুনের মা ছিলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পীডু নিলুফার ইয়াসমিন। কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন তার আপন খালা। ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীত ও সংস্কৃতির পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
রাজধানীর উদয়ন স্কুলে পড়ার সময়ই গানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন আগুন। তখন নিজের জীবনের প্রথম গান লেখেন এবং সুরও করেন। গানটির কথায় উঠে এসেছিল সাধারণ মানুষের জীবন ও সংগ্রামের গল্প। তবে গানটি কখনো প্রকাশিত হয়নি। ভবিষ্যতে সেটি প্রকাশ করার ইচ্ছা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাবার দেওয়া গিটারেই নতুন যাত্রা
গানের প্রতি ছেলের আগ্রহ দেখে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা খান আতাউর রহমান তাকে একটি গিটার কিনে দেন। সেই গিটার নিয়ে ভাই ওয়াহিদের কাছে শেখার জন্য ছুটে যান আগুন। পরে চার বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সাডেন’ নামে একটি ব্যান্ড। সেখান থেকেই সংগীতের জগতে তার আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চলচ্চিত্রের গানেই সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছেন আগুন। তবে গানের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন তিনি। বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছেন এই শিল্পী। হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন তিনি। সেখানে চিত্রশিল্পীর চরিত্রে দেখা যায় তাকে।
সব মিলিয়ে সংগীত শিল্পী আগুনের ক্যারিয়ার বাংলা গানের ভুবনে দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। নব্বইয়ের দশকে যে কণ্ঠ চলচ্চিত্রের গানে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল, দীর্ঘ বিরতির পর সেই কণ্ঠ আবারও ফিরেছে বড় পর্দার গানে। ‘স্বপ্নের নায়িকা’ সিনেমার টাইটেল গান দিয়ে নতুন করে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে যাচ্ছেন তিনি।
নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও তার কণ্ঠকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ পাবেন। এখন দেখার বিষয়, ‘স্বপ্নের নায়িকা’র গান দিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর আগুনের সেই চেনা কণ্ঠ কতটা নতুন করে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।











