Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
Chitralee will take you closer to the world of entertainment.
শনিবার, জুন ৬, ২০২৬

ইন্সিকিউরড বুবলী- শাকিব খান, অপু বিশ্বাস ও ক্ষমতার খেলাঘর

বুবলী শাকিব খান অপু বিশ্বাস
বুবলী শাকিব খান অপু বিশ্বাস

ক্ষমতা ও পুরুষতান্ত্রিকতা

দেশের চিত্রনায়িকা শবনম বুবলী সুখবর দিলেন ভক্তদের। সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন তিনি যার নাম রেখেছেন শার্লিন খান। একটি ফটোকার্ড প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি একইসাথে সন্তানের পিতার পরিচয়কেও সম্মুখে তুলে ধরেছেন। এই সন্তানের পিতার নাম শাকিব খান। দ্য মেগাস্টার অব ঢালীউড। এর ফলেই বুবলী, শাকিব খান ও অপু বিশ্বাস এর সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা উঠেছে।

কিন্তু শবনম বুবলীর দ্বিতীয় সন্তানের মা হওয়ার খবর আরেকটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। নতুন সন্তানের আগমনের আনন্দের পাশাপাশি পুরোনো একটি প্রশ্নও ফিরে এসেছে সামাজিক মাধ্যমে-নেটিজেন মহলে। প্রশ্নটি শাকিব খানকে ঘিরে। নেটিজেনদের প্রশ্ন, যে মানুষ একসময় বলেছিলেন অপু বিশ্বাস ও বুবলী দুজনেই তার ‘অতীত’ সেই মানুষই আজ আবার বুবলীর সন্তানের পিতা হিসেবে উপস্থিত।

অনেকে এটিকে ব্যক্তিগত জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলবেন। কেউ বলবেন ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। কেউ আবার বলবেন ভালোবাসার জটিলতা। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে প্রশ্নটি অন্য। বুবলীর শেয়ার করা ফটোকার্ডে কয়েকটি প্রচ্ছন্ন প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। গভীর উদ্বেগও। ফটোকার্ডে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে বুবলীর নিরাপত্তাহীনতা। সন্তানের পরিচয় সর্বজনগ্রাহ্য করার উদ্যোগ। তখনই প্রশ্ন উঠে এই গল্পে আসলে ক্ষমতা কার হাতে? এবং একই সাথে এই প্রশ্নও উঠে কেন বছরের পর বছর ধরে অপু ও বুবলীকে নিজেদের অবস্থান প্রমাণ করতে হয়েছে, অথচ শাকিব খানকে খুব কমই নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে হয়েছে? “তারা আমার অতীত”-এই বাক্যটি কি শুধুই একটি ব্যক্তিগত মন্তব্য?

বুবলী শাকিব খান অপু বিশ্বাস

২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে শাকিব খান বলেছিলেন, অপু বিশ্বাস ও বুবলী তার অতীত। সম্পর্ক পুনর্গঠনের কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে কী দেখা গেল? অপু বিশ্বাসের সঙ্গে সন্তানের জন্মদিনে একসঙ্গে উপস্থিতি। বুবলীর সঙ্গে বিদেশ সফর। এরপর নতুন সন্তানের আগমন।

প্রশ্নটি ক্ষমতার

এখানে প্রশ্নটি নৈতিক নয়। প্রশ্নটি ক্ষমতার। ফরাসি চিন্তক মিচেল ফুকো বলেছিলেন, ক্ষমতা শুধু মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে না; ক্ষমতা সত্যও উৎপাদন করে। এই ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, সম্পর্কের “সত্য” কে নির্ধারণ করছিলেন? অপু? বুবলী? নাকি শাকিব?

যখন একজন মেগাস্টার বলেন, “তারা আমার অতীত”, তখন সেটি শুধু একটি বক্তব্য নয়; সেটি একটি সামাজিক সত্যে পরিণত হয়। কারণ তার অবস্থানই এমন। কিন্তু পরবর্তী বাস্তবতা দেখায়, সেই সত্য সম্পূর্ণ সত্য ছিল না।

ফুকোর ভাষায়, ক্ষমতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো-ক্ষমতাবান ব্যক্তি বাস্তবতাকে শুধু বর্ণনা করেন না, বাস্তবতার গ্রহণযোগ্য সংস্করণও তৈরি করেন।

তাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- অপু ও বুবলী কি নিজেদের সম্পর্কের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সমান ক্ষমতা পেয়েছিলেন? নাকি সম্পর্কের ভাষা এবং সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত একজন পুরুষের হাতেই ছিল?

বুবলী কিংবা অপুর নিরাপত্তাহীনতার উৎস কি?

২০২২ সালে একটি হিরের নাকফুল আর পুরোনো একটি ছবিকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে কাদা ছোড়াছুড়িতে মেতে উঠেছিলেন অপু বিশ্বাস ও শবনম বুবলী। শোনা যায়, বুবলী নাকি শাকিব খানের কাছ থেকে একটি হিরের নাকফুল নিয়েছিলেন। আর তা ভালোভাবে নেন নি অপু বিশ্বাস। ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি পোস্ট দেন দুজনেই। আবার এও শোনা যায়, অতীতের ভুল বুঝতে পেরে অপু বিশ্বাস আবার শাকিব খানের জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। সন্তান জয়ের কারণে অপু বিশ্বাস যাওয়া-আসা করতেন শাকিব খানের গুলশানের বাসায়। এ খবর আবার বুবলীর কানে পৌঁছালে তা আবার বুবলী ভালোভাবে নেননি। এরপরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং সংবাদমাধ্যমে বুবলীকে প্রায়ই “নিরাপত্তাহীন” নারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

অপু বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে প্রতিক্রিয়া। নিজের অবস্থানকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা। এসবকেই ব্যক্তিগত ঈর্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান এখানে আরেকটি প্রশ্ন তোলে। যদি একজন নারীর অবস্থান যদি সম্পূর্ণ নিরাপদ হয়, তাহলে কি তাকে বারবার নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে হয়? ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বদ্যিয়্যুর সিম্বলিক ক্যাপিটাল বা প্রতীকী পুঁজির ধারণা মতে সমাজে মর্যাদা শুধু অর্থ দিয়ে তৈরি হয় না। প্রতীক দিয়েও তৈরি হয়। একটি আংটি। একটি নাকফুল। একটি ছবি। একটি পারিবারিক উপস্থিতি। একটি প্রকাশ্য স্বীকৃতি। এসবই প্রতীকী পুঁজি। হিরের নাকফুল বিতর্ককে যদি বুর্দিয়ুর আলোকে পড়ি, তাহলে এটি কোনো অলঙ্কারের গল্প নয়। এটি স্বীকৃতির গল্প। এটি মর্যাদার গল্প। এটি “আমার অবস্থান কোথায়” সেই প্রশ্নের গল্প।

বুবলী হয়তো কেবল একটি নাকফুল প্রদর্শন করছিলেন না; তিনি হয়তো নিজের সামাজিক অবস্থান দৃশ্যমান করতে চাইছিলেন। আর সেই প্রতীকী পুঁজির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন অপু বিশ্বাস যা একইসাথে তারও নিরাপত্তাহীনতাকে সামনে নিয়ে আসে। আর সেটি যদি সত্য হয়, তাহলে স্বীকৃতির নিরাপত্তাহীনতা কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়। এটি ক্ষমতার অসম বণ্টনের প্রকাশ।   

কেন অপু ও বুবলী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন?

এই পুরো গল্পে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, জনপরিসরে প্রায় সবসময় দ্বন্দ্বটি দেখা হয়েছে অপু বনাম বুবলী হিসেবে। অপু কী বললেন? বুবলী কী উত্তর দিলেন? কে কার বিরুদ্ধে পোস্ট দিলেন? কে কার জায়গা নিলেন? কিন্তু খুব কম সময়ই প্রশ্ন উঠেছে- কেন দুই নারীকে একই পুরুষকে কেন্দ্র করে নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে হলো? এখানেই নারীবাদী চিন্তক বেল হুকস এর বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছিলেন, পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলোর একটি হলো নারীদের একে অপরের প্রতিযোগীতে পরিণত করা। কারণ যখন নারীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, তখন ক্ষমতার কেন্দ্র অদৃশ্য হয়ে যায়। অপু ও বুবলীকে আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছিল?

বুবলী শাকিব খান অপু বিশ্বাস
বুবলী শাকিব খান অপু বিশ্বাস কোলাজ ছবি

নাকি এমন একটি সামাজিক কাঠামো তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছিল, যেখানে একজন পুরুষের স্বীকৃতিই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ? কেন অপু ও বুবলীর পরিচয় বারবার শাকিবের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে? এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। অপু বিশ্বাস নিজে একজন তারকা। বুবলীও নিজস্ব ক্যারিয়ার তৈরি করেছেন।

কিন্তু জনপরিসরে তাদের পরিচয়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ কী? তাদের অভিনয়? তাদের শিল্পীসত্তা? নাকি শাকিব খানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক? নারীবাদী তত্ত্ব আমাদের বলে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীকে প্রায়ই তার নিজের পরিচয়ে দেখা হয় না।

তাকে দেখা হয় কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। ফলে অপু হয়ে ওঠেন “শাকিবের প্রথম স্ত্রী”। বুবলী হয়ে ওঠেন “শাকিবের দ্বিতীয় স্ত্রী”। তাদের নিজস্ব সত্তা, সাফল্য কিংবা শিল্পী পরিচয় অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়। এটাই পিতৃতন্ত্রের সূক্ষ্ম রূপ। এখানে নারীর অস্তিত্ব মুছে যায় না। কিন্তু তার পরিচয়কে পুরুষের পরিচয়ের অধীনস্থ করে ফেলা হয়।

গল্পের প্রকৃত কেন্দ্র কে?

তাহলে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আসলে কোথায়? ডাবল স্ট্যান্ডার্ড শুধু বক্তব্য ও বাস্তবতার অমিল নয়। ডাবল স্ট্যান্ডার্ড হলো সামাজিক বিচারেও। যখন একজন পুরুষের একাধিক সম্পর্ক থাকে, তখন তাকে বলা হয় জটিল মানুষ। যখন একজন নারী একই ধরনের সম্পর্কগত জটিলতার মধ্যে থাকেন, তখন তাকে বলা হয় অস্থির, আবেগপ্রবণ কিংবা ইন্সিকিউরড। যখন একজন পুরুষ সম্পর্কের সংজ্ঞা পরিবর্তন করেন, তখন সেটি “জীবনের বাস্তবতা”। যখন একজন নারী অবস্থান বদলান, তখন সেটি “নাটক”। এই দ্বৈত মানদণ্ডই পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

তাহলে এই গল্পের প্রকৃত কেন্দ্র কে? সম্ভবত অপু নন। বুবলীও নন। এমনকি শাকিব খানও নন। প্রকৃত কেন্দ্র হলো ক্ষমতা। কার হাতে সম্পর্কের ভাষা ছিল? কার হাতে সামাজিক স্বীকৃতি ছিল? কার বক্তব্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে? কারা নিজেদের অবস্থান বারবার প্রমাণ করতে বাধ্য হয়েছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, ঘটনাটি কেবল তিনজন তারকার ব্যক্তিগত জীবন নয়। এটি বাংলাদেশের তারকাসংস্কৃতির আয়না। এটি পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার আয়না। এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি এমন এক সমাজের আয়না, যেখানে একজন পুরুষকে কেন্দ্র করে দুই নারীর অবস্থান নিয়ে জাতীয় আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়।

তাই শেষ প্রশ্নটি হয়তো হওয়া উচিত- বুবলী কি সত্যিই ইন্সিকিউরড ছিলেন? নাকি আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে নারীর নিরাপত্তাহীনতাকে ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, অথচ সেই নিরাপত্তাহীনতা উৎপাদনকারী ক্ষমতার কাঠামোকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়?

+ posts
Share this article
Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read next

নতুন জীবনে দীপ্তি চৌধুরী, বিয়ে করলেন ঢাবি শিক্ষককে

দীপ্তি চৌধুরীর জীবনের নতুন অধ্যায় বিয়ে করেছেন  আলোচিত  উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী। তার স্বামীর নাম মুশতাক ইবনে…
দীপ্তি চৌধুরী ও মুশতাক

এক মাস আগেই কন্যা সন্তানের মা হয়েছেন শবনম বুবলী

মা হলেন বুবলী ঢালিউড অভিনেত্রী চিত্রনায়িকা শবনম বুবলী সুখবর দিলেন ভক্তদের। সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টের মাধ্যমে…
শবনম বুবলী

গুরুতর অসুস্থ অভিনেতা আব্দুল হান্নান শেলী

আব্দুল হান্নান শেলী বাংলাদেশের ছোট পর্দার পরিচিত অভিনেতা আব্দুল হান্নান শেলী দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থতায়…
অভিনেতা আব্দুল হান্নান শেলী

সৃজিতের ‘এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’ সিনেমার প্রথম ঝলক প্রকাশ

এম্পেরর বনাম শরৎচন্দ্র নির্মাতা সৃজিত মুখার্জি তার বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র ‘এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’র প্রথম…
এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র
0
Share