সুচিত্রা সেন
আপনি যদি কখনো সিনেমাও না দেখে থাকেন তবে তারপরও তাঁর নাম শুনে থাকবেন। তিনি বাংলা সিনেমার মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। আজ এই মহানায়িকার জন্মদিন। প্রায় শত বর্ষ আগে জন্ম নেয়া এই নায়িকাকে নিয়ে দর্শক মহলে আজও হয় তুমুল আলোচনা। এই নামটি দর্শক মুখে শুনে শুনে হালের জেনারেশন জেডরাও তাঁর সিনেমা দেখতে বাধ্য হন। এবং তাঁর প্রেমেও পড়ে যান। সম্ভবত যারাই তাঁকে দেখবে এই সময়ে কিংবা ভবিষৎ-এ তাঁদের সবাই এই অভিনেত্রীর অভিনয়, বাচনভঙ্গি, সৌন্দর্য্যের প্রেমে না পড়ে থাকতে পারবে না। আর সেকারণে সুচিত্রা সেনকে অনেকেই তুলনা করেন মেরিলিন মুনরোর সাথে আর তাঁর নীরবতার ভাষার তুলনা দেন ধ্রুপদী সময়কালের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা গ্রেটা গার্বোর সাথে। জন্মদিন উপলক্ষে সুচিত্রা সেনের জীবনী সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক।
সুচিত্রা সেনের জন্ম

১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল, তৎকালীন বৃটিশ বাংলার পাবনায় রুণাময় দাশগুপ্ত ও ইন্দিরা দাশগুপ্তের ঘরে জন্ম নেন এই মহানায়িকা। তিনি ছিলেন নয় ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। জন্মের পরে তাঁর নাম রাখা হয় কৃষ্ণা। কৃষ্ণার পিতামহ জগবন্ধু দাশগুপ্ত আহ্লাদ করে আরেকটি নাম রাখলেন, রমা। পাবনায় বেড়ে ওঠা সেই রমা দাশগুপ্তই একদিন হয়ে উঠেন পুরো বাংলা তথা ভারতবর্ষের অন্যতম প্রভাবশালী নায়িকা সুচিত্রা সেন।
১৯৩৮ সালে মহাকালী পাঠশালায় (বর্তমান পাবনা টাউন গার্লস হাই স্কুল) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেন সুচিত্রা সেন। প্রাথমিক বিদ্যার পর ভর্তি হন পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নাচ-গানে ছিল অগাধ উৎসাহ, করতেন গ্লাস পেইন্টিংও। সুচিত্রা সেনের এই নাচ-গানের উৎসাহের পেছনে ছিল আরেকটি বাড়ির অবদান। তাঁর বাড়ির পাশেই ছিল আরেকটি সংস্কৃতিমনা বাড়ি-যার বাসিন্দা ছিলেন মঞ্জুশ্রী চাকি; যিনি পরবর্তীকালে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠেন।
মঞ্জুশ্রী ও সুচিত্রা ছিলেন সই। মঞ্জুশ্রীদের বাড়ির মস্ত বারান্দায় নাচের সঙ্গে চলত পাড়ার নাটকের মহড়া। তাদের কেশবতী রাজকন্যার নাট্যরূপ বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। রাজকন্যার ভূমিকায় ছিলেন সুচিত্রা সেন, রাজপুত্র মঞ্জুশ্রী চাকি। স্কুলের যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও ছিল সুচিত্রা।
স্কুলের বান্ধবীদের সঙ্গে মঞ্চস্থ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের পেটে খেলে পিঠে সয় এবং বসন্ত নাটক। বাংলা ইংরেজি উভয় ভাষায় আবৃত্তিতে ছিলেন পারদর্শী, স্কুলে আবৃত্তি করেছিলেন টমাস হুডের দ্য সং অফ শার্ট । একবার বাংলার লাটসাহেবের স্ত্রী আসায় তার সম্মানার্থে ঋতুরঙ্গ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়; সেখানেও অভিনয় করেন সুচিত্রা।
পাবনার সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রবিন্দু বনমালী ইনস্টিটিউটেও ছিল তাঁর পদচারণা। বিভিন্ন নাটকে সু্যোগ পেলেই অভিনয় করতেন। বাবার হাত ধরে যেতেন অন্নদা-গোবিন্দ পাঠাগারে, পড়তেন নানান সিরিজের বই। সেই যুগের পাবনায় সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতেন সুচিত্রা, সুযোগ পেলেই সিনেমা দেখতে যেতেন অরোরা টকিজে (বীনাবাণী হল)।

সুচিত্রা সেনের কলকাতাযাত্রা ও সিনেমাযাত্রা
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তাঁরা সপরিবারে এপার বাংলায় চলে আসেন। শিল্পপতি আদিনাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় সুচিত্রার। পরে শ্বশুরমশায়ের আগ্রহেই সিনেমায় নামেন সুচিত্রা।
কলকাতায় যাওয়ার পর ১৯৫২ সালে শেষ কোথায় ছবির মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয় যদিও ছবিটি পরে আর মুক্তি পায়নি। এই ছবিতে পরিচালক ছিলেন সুকুমার দাশগুপ্ত এবং নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন সমর রায়। সেই থেকে শুরু তাঁর সিনেযাত্রা। এরপর ১৯৫৩ সালে সাত নম্বর কয়েদী সিনেমায় অভিনয় করেন যা তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। এই সিনেমায় অরুণা নামে অভিনয় করেছিলেন তিনি। একই বছর তিনি জীবনে প্রথম উত্তম কুমারের সাথে সাড়ে চুয়াত্তর সিনেমায় রমলা নামে অভিনয় করেন। এরপর থেকে কেবলই পথচলা আর বিখ্যাত হয়ে উঠা।
সেই বছরেই তিনি দেবকী বসু পরিচালিত ‘শ্রীচৈতন্য’ ছায়াছবিতে বিষ্ণুপ্রিয়ার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। ১৯৫৪ সালে সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘ওরা থাকে ওধারে’,সতীশ দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘মরণের পারে’,নরেশ মিত্র পরিচালিত ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’, অগ্রদূত পরিচালিত ‘অগ্নিপরীক্ষা’, অজয় কর পরিচালিত ‘গৃহপ্রবেশ’ প্রভৃতি ছায়াছবিতে উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘বলয়গ্রাস’ ছায়াছবিতে মণিমালার ভূমিকায় অভিনয় করেন সুচিত্রা। এরপর ১৯৫৫-তে সুধাংশু মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘সাঁঝের প্রদী’প’ ছায়াছবিতে রাজুর ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি উত্তমকুমারের বিপরীতে।
দেবদাসে সুচিত্রা সেন
অনেকগুলো টানা সিনেমা করার পর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস “দেবদাস” অবলম্বনে নির্মিত প্রথম হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন সুচিত্রা সেন। সিনেমায় তাঁর বিপরীতে ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা দিলীপ কুমার। এই ছবিতে পার্বতী চরিত্রে স্মরণীয় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান সুচিত্রা সেন।

এভাবেই ক্রমান্বয়ে অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেন এই কালজয়ী অভিনেত্রী। তাঁর সাথে জুটি হওয়া উত্তম কুমারের সাথে করেছেন বেশিরভাগ সিনেমা। আর এই জুটি হয়ে উঠেছেন বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সফল ও চিরস্মরণীয় জুটি। তাঁরা একসঙ্গে প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘সবার উপরে’, ‘পাপমোচন’, ‘শিল্পী’, ‘সাগরিকা’, ‘পথে হল দেরি’, ‘হারানো সুর’, ‘গৃহদাহ’, ‘প্রিয় বান্ধবী’ ইত্যাদি।
গায়িকা সুচিত্রা
গানের জগতেও সুচিত্রা সেনের পদচারণা ছিলো। তাঁর গাওয়া গান নিয়ে গ্রামোফোন রেকর্ড বেরিয়েছিল মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে। গানের নাম- ‘আমার নতুন গানের নিমন্ত্রণে’ ও ‘বনে নয় আজ মনে হয়’। ১৯৫৯ সালের জুলাই মাসে এই রেকর্ড প্রকাশিত হয়।
অভিনেত্রীর বিশ্বজয়
সুচিত্রা ১৯৬৩ সালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে করেন সিনেমা ‘সাত পাকে বাঁধা’। এই ছবির জন্য ১৯৬৩ সালে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সিলভার প্রাইজ ফর বেস্ট অ্যাকট্রেস’ পুরস্কারে সম্মানিত হন যা ছিলো প্রথম বাঙালি কোন অভিনেত্রীর বিশ্বজয়।
বিতর্ক ও বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে এই অভিনেত্রীকে। গুলজার পরিচালিত সুচিত্রা সেনের হিন্দি সিনেমা ‘আন্ধি’ গুজরাটে মুক্তির পর ২০ সপ্তাহ নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া থাকার কারণে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গুজরাটের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয় ছবিটি। তবে এই সিনেমার জন্য ফিল্মফেয়ারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি এবং তার স্বামী চরিত্রে অভিনয় করা সঞ্জীব কুমার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার জিতেছিলেন।
দ্বৈত চরিত্র
দ্বৈত চরিত্রেও অভিনয় করেছেন এই মহানায়িকা। ‘উত্তর ফাল্গুনী’ ছবিতে যৌনকর্মী পান্নাবাই ও তাঁর কন্যা আইনজীবী সুপর্ণার দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন সুচিত্রা সেন।
সুচিত্রা সেন ৫২টি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেছেন, পাশাপাশি ৭টি হিন্দি সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননা দেয়।
সুচিত্রা সেনই একমাত্র ভারতীয় অভিনয়শিল্পী, যিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারটি পেয়েছিলেন তিনি। পুরস্কারটি পাওয়ার জন্য নিয়ম অনুযায়ী নয়াদিল্লিতে যেতে হতো তাঁকে। কিন্তু তিনি জনসমক্ষে আসতে চাননি বলে এই পুরস্কারটি গ্রহণ করেন নি।
কেন জনসম্মুখে আসতে চাইতেন না?
১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ছবিতে অভিনয়ের পর সুচিত্রা সেন আমৃত্যু স্বেচ্ছাবন্দীত্ব গ্রহণ করেন। তিনি অভিনয় ছাড়ার কথা প্রথম জানিয়েছিলেন নিজের মেক আপ আর্টিস্ট মহম্মদ হাসান জামানকে। এই স্বেচ্ছাবন্দীত্বের কারণেই তিনি ২০০৫ সালে দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েও জনসমক্ষে আসতে হবে বলে এই পুরস্কার নিতে যাননি।
বাইরে বের হলে মানুষ তাঁকে চিনে ফেলবে, সে কারণে দিনেও বের হতেন না। তবে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে পরিচিতজনেরা বাসায় দেখা করতে আসতেন। বাসায় তিনি যেভাবে থাকতেন, অনেকটা সেভাবেই দেখা করতেন। বাড়তি সাজগোজ তাঁর থাকত না। তবে এসময় তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন। তবে ঠিক কি কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি তা আজও অজানা।
২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করে। তবে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কোন জাতীয় পুরস্কার পাননি।
সুচিত্রা সেনের সিনেমাগুলো
সুচিত্রা সেন মোট ৬১টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচিত্রগুলো হলো- সাত নম্বর কয়েদী, কাজরী, ওরা থাকে ওধারে, মরণের পরে, গৃহপ্রবেশ, অগ্নিপরীক্ষা, দেবদাস, সাজঘর, শাপমোচন, সাঁঝের প্রদীপ, সবার উপরে, সাগরিকা, জীবন তৃষ্ণা, চাওয়া পাওয়া, সাত পাকে বাঁধা, সপ্তনদী, হারানো সুর, দ্বীপ জ্বেলে যাই, গৃহদাহ, দত্তা, পথে হলো দেরি, চন্দ্রনাথ, শ্রাবণ সন্ধ্যা, প্রণয় পাশা, আঁধি, প্রিয় বান্ধবী, দেবী চৌধুরানী, হার মানা হার, আলো আমার আলো, ফরিয়াদ, নবরাগ, মেঘ কালো, কমললতা, মমতা, সন্ধ্যাদীপের শিখা, উত্তর ফাল্গুনী, বিপাশা, সরহদ, মোম্বাই কা বাবু, স্মৃতিটুকু থাক, হসপিটাল, ইন্দ্রাণী, সূর্যতোড়ণ, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, চম্পাকলি, মুসাফির, আমার বৌ, শিল্পী, ত্রিযামা, একটি রাত, শুভরাত্রি, ভালোবাসা, মেজবৌ, বলয়গ্রাস, অন্নপূর্ণার মন্দির, সদানন্দের মেলা, ঢুলি, অ্যাটম বম্ব, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য ইত্যাদি।
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮২ বছর বয়সে সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়। মারা যাওয়ার তিন সপ্তাহ আগে ফুসফুসে সংক্রমণের জন্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুতে সেসময় নেমে এসেছিলো শোকের ছায়া।



