নজরুল জন্মজয়ন্তীতে দেশব্যাপী আয়োজন
কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী আজ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কবিতা কোটি তরুণের রক্তে জ্বালায় স্ফুলিঙ্গ। উপন্যাস, নাটক, সঙ্গীত আর দর্শনেও নজরুলের অনবদ্য উপস্থিতি বর্ণাঢ্য করেছে বাংলা সাহিত্যকে। নজরুল একাধারে কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্র অভিনেতা। শিল্পকলার নানা শাখায় ছিল তার অবাধ স্বচ্ছন্দ বিচরণ। কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়েছে।

এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুল’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনে শ্রেণি-পেশার মানুষ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা চলছে রাজধানীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে। ২২ মে শুরু হওয়া এ আয়োজন চলবে আগামী ২৪ মে পর্যন্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ কর্মসূচি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন বিভাগ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা, সংগীতানুষ্ঠান ও আবৃত্তির আয়োজন করেছে। কবির সাহিত্য ও সংগীত নিয়ে তরুণদের আগ্রহও চোখে পড়েছে।

শৈশব থেকেই সংগ্রামী জীবন
ছোটবেলাতেই পিতৃহারা হন নজরুল। গ্রামের মক্তবেই তার শিক্ষাজীবনের শুরু। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অল্প বয়সেই তাকে কাজ করতে হয়েছে। কখনও শিক্ষকতা, কখনও মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
অভাবের মধ্যেও সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ কমেনি। পরবর্তীতে লেটো দলে যোগ দিয়ে গান ও কবিতা লেখার প্রতিভা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাৎক্ষণিক গান ও কবিতা রচনার দক্ষতায় দ্রুত পরিচিতি পান তরুণ নজরুল।

বিদ্রোহী কবিতায় কেঁপেছিল ব্রিটিশ শাসন
১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’। এই কবিতা তাকে এনে দেয় ‘বিদ্রোহী কবি’ উপাধি। তার লেখায় উঠে আসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও মানুষের মুক্তির আহ্বান।
ব্রিটিশবিরোধী লেখালেখির কারণে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয় তাকে। তবুও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম থামাননি তিনি। তার সাহসী লেখনী স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল।
সাহিত্য ও সংগীতে অনন্য অবদান
নজরুল ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতায় সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘প্রলয়োল্লাস’ ও ‘মৃত্যুক্ষুধা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সংগীতেও ছিল তার অসাধারণ অবদান। চার হাজারের বেশি গান রচনা করেছেন তিনি। ইসলামী গান, গজল, শ্যামাসংগীত ও দেশাত্মবোধক গানে নিজস্ব ধারা তৈরি করেন নজরুল। সংগীতজ্ঞদের মতে, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ করেন জাতীয় কবি।

সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে সক্রিয় নজরুল
সৈনিক জীবন শেষে নজরুল সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। তিনি ‘ধূমকেতু’, ‘লাঙ্গল’, ‘গণবাণী’ ও ‘নবযুগ’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। তার লেখায় সাধারণ মানুষের অধিকার ও সাম্যের কথা উঠে আসত।
কমরেড মুজাফফর আহমদের সঙ্গে পরিচয়ের পর রাজনৈতিকভাবেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সমাজে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার পক্ষে ছিলেন নজরুল। তার সাহিত্যেও সেই চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি
১৯৪২ সালে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন নজরুল। স্বাধীনতার পর অসুস্থ কবিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। পরে তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তবে তার সাহিত্য, সংগীত ও চেতনা এখনও বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত।