জুবিন গর্গ- রাহুল এবং একটি গান
বেশ কয়েক মাস আগে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন পশ্চিমবঙ্গের নক্ষত্রসম তারকা জুবিন গার্গ। তাঁর বিদায়ে পুরো পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলো। এবার মর্মান্তিকভাবে বিদায় নিলেন তাঁর গানের নায়ক, তাঁর গাওয়া ‘পিয়া রে’ গানে বিখ্যাত হয়ে উঠা অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে অবাক করা বিষয় হচ্ছে রাহুল ও জুবিন গর্গ দুজনেই বিদায় নিয়েছেন সমুদ্রের পানিতে। জুবিন গর্গ ও রাহুল- একই গানে বাঁধা দুই তারকার একই ট্র্যাজেডিক মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে একটি গানকে যে গান দুখীদের, আর এই গানের দুই শিল্পীও দিয়ে গেলো অসম দুঃখ। তাঁদের এই বিদায়ে নতুন করে আলোচনায় ২০০৮ সালের একটি গান ‘পিয়া রে’।

রাহুলের ও জুবিনের ট্র্যাজেডিক মৃত্যু
২৯ মার্চ রবিবার পশ্চিমবঙ্গ-ওড়িশা সীমান্তের তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং করতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে মারা গেছেন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। দিঘার তালসারি সৈকতে শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রে তলিয়ে যান তিনি। জানা গেছে, ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। শুটিং চলাকালে কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে এক ইয়ট পার্টিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মারা যান জুবিন গর্গ। তিনি সেখানে নর্থ ইস্ট ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। শুরুতে তাঁর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও ২৫ মার্চ সিঙ্গাপুর পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে আদালত তাঁর মৃত্যুকে ‘দুর্ঘটনা’ বলেই নিশ্চিত করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন এবং লাইফ জ্যাকেট পরেননি। যদিও এ বিষয়ে আসাম পুলিশ তাদের নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
যেখানে দুঃখ মেশে

এই দুই শিল্পীর মৃত্যুর মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও ঘটনাপ্রবাহে রয়েছে এক অদ্ভুত মিল—দুজনকেই কেড়ে নিয়েছে পানি আর সমুদ্র। এই সমাপতনই নতুন করে আলোচনায় এনেছে তাঁদের একসঙ্গে তৈরি করা স্মরণীয় কাজ ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর ‘পিয়া রে’ গানটি।
২০০৮ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। ছবির গানটি বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমায় এক নতুন আবেগ ও বিরহী প্রেমের ঝড় তুলেছিলো। বড় বড় তারকাদের বাইরে গিয়ে একটি সরল প্রেমের গল্প জয় করে নেয় দর্শক হৃদয়। মফস্বলের এক সাধারণ তরুণ ‘কৃষ্ণ’ চরিত্রে অভিনয় করেন রাহুল। সিনেমায় রাহুলের সংযত অভিনয়, তরুণ ও নিম্নবিত্ত প্রেমিকের চোখের ভাষা ও স্বাভাবিক উপস্থিতি দর্শকের কাছে চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলে।
সিনেমার গল্পের সাথে জুবিন গার্গের গান, গানের কথা আর কণ্ঠ গানটিকে করে তোলে বিরহের এক মনুমেন্ট। গানটি দুর্গাপূজার মণ্ডপ থেকে চায়ের দোকান, কৈশোরের প্রেম কিংবা নিম্নবর্গের শ্রমিকদের কাজের অবসরে প্রিয়জনের কথা মনে পড়লে এই গান তাঁদের বিরহী হৃদয়কে আরো মধুর করে তুলতো।

বলিউডে ‘ইয়া আলি’ গানের মাধ্যমে পরিচিতি পেলেও বাংলা দর্শকের কাছে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান ‘পিয়া রে’ গানটি দিয়েই। এই গানটির কথা লিখেছেন প্রিয় চট্টোপাধ্যায়, সুর ও সংগীতায়োজন করেছেন জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। আর সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন রাজ চক্রবর্তী।
জুবিনকে নিয়ে রাহুল
সেই গানের গায়ক জুবিনের অকাল মৃত্যুর পর একাধিক সাক্ষাৎকারে রাহুল তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পিয়া রে’ গানটি তাঁদের পরিচিতি এনে দেয় এবং দীর্ঘ সময় দর্শকের কাছে তাঁদের একসঙ্গে স্মরণীয় করে রাখে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও দর্শকের অনুরোধে গানটি গাইতে হতো তাঁকে।
পরে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাহুল জানান, গানটির শুটিংয়ের সময় তাঁরা জানতেন না এটি এত বড় জনপ্রিয়তা পাবে। পরবর্তী সময়ে গানটি যুক্ত হওয়ার পর ছবির আবেগ আরও গভীর হয় এবং দর্শকের মধ্যে আলাদা প্রভাব ফেলে।
সময়ের সঙ্গে বাংলা সিনেমার ধারা বদলেছে, এসেছে নতুন প্রজন্ম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। তবু ‘পিয়া রে’ গানটি এখনো সমানভাবে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে আছে। এই গানের মাধ্যমেই অনেক দর্শক আজও রাহুল-জুবিন জুটিকে মনে রাখেন।
একই গান একই ভাগ্য
তবে এটি বেশ কাকতালীয় ও মানতে না পারা মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবেই উল্লেখ রয়ে যাবে টালীউড ও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে। একটি গান যেখানে কণ্ঠশিল্পী ও অভিনয়শিল্পীকে বেঁধেছিলো এক সুতোয়, একই করে তুলেছিলো জনপ্রিয়, সেই শিল্পীজুটির দুজনেই মারা গেলেন পানিতে-সমুদ্রের কোলে!
জুবিন গর্গের মৃত্যু শোক শেষ না হতেই অভিনয়শিল্পী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অকালপ্রয়াণ এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনলো টলীউড ইন্ডাস্ট্রিতে যে দুঃখ তাঁদের ভক্তরা মেনে নিতে পারবে না কখনোই।



