অস্কার-জর্ডান-টিমোথি শ্যালামে
সদ্য শেষ হওয়া ৯৮তম অস্কারে টিমোথি শ্যালামে ও তাঁর সিনেমা মার্টি সুপ্রিম হয়ে উঠেছে এক দুঃখের নাম। তুমুল আলোচনা ও প্রতিযোগিতায় থাকা সত্ত্বেও শ্যালামের জেতা হয়নি অস্কার। এমনকি চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে তাঁর সিনেমা মার্টি সুপ্রিম মোট ৯টি মনোনয়ন পেয়েও একটি বিভাগেও অস্কার জেতেনি। তবু বলা যায় মাইকেল বি. জর্ডান অস্কার জিতলেও টিমোথি শ্যালামে হেরে যায় নি । এদিকে টিমোথি শ্যালামের হারের কারণ হিসেবে অনেকে দেখছেন ব্যালে নাচ নিয়ে মন্তব্য করার কারণেই নাকি শ্যালামে অস্কার হারিয়েছেন। আসলেই কি তাই?
তৃতীয়বারের মতো অস্কার মনোনয়ন পেয়েও এবারও অস্কার জিততে পারেননি টিমোথি শ্যালামে। আর এ নিয়ে একটি আলোচনা সামনে এসেছে যে, “ব্যালে নিয়ে মন্তব্য করার কারণেই শ্যালামে অস্কার হারিয়েছেন।” অথচ সময়রেখা দেখলে বোঝা যায় বিষয়টি তা নয়।

গত সপ্তাহে একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়, যেখানে শ্যালামে ব্যালে ও অপেরাকে এমন শিল্পরূপ বলে মন্তব্য করেন “যেগুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।” সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, যেন তিনি নিজেই নিজের অস্কার সম্ভাবনায় আঘাত করেছেন।
মেট্রোপলিটন অপেরা তাঁর বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়, রয়্যাল ব্যালে এক ধরনের মনোক্ষুণ্নই হয়। আর শনিবার রাতের লাইভ–এর “Weekend Update” অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে রসিকতা করা হয়। বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী মিস্টি কোপল্যান্ড প্রশ্ন তোলেন—তার নাচের ক্যারিয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কীভাবে শ্যালামে তাকে মার্টি সুপ্রিম প্রচারের জন্য অনুরোধ করেন। সব মিলিয়ে তখন মনে হচ্ছিল, সেরা অভিনেতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও শ্যালামে যেন অস্কারের ঠিক আগে নিজের সম্ভাবনাই নষ্ট করে ফেলেছেন। কিন্তু আসলে তা নয় কারণ ভোট ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।
একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস–এর ভোটগ্রহণ
৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস–এর জন্য ভোটগ্রহণ শেষ হয় ৫ মার্চ ২০২৬, বিকাল ৫টা (প্যাসিফিক সময়)। শ্যালামের সেই ভিডিও ক্লিপটি ততটা আলোচনায় আসে ওই দিনের শেষ দিকে, এবং ৬-৭ মার্চের সপ্তাহান্তে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অপেরা হাউসগুলো যখন বিদ্রূপাত্মক ইনস্টাগ্রাম পোস্ট করছে বা ব্যালেট নৃত্যশিল্পীরা টিকটক বানাচ্ছেন-তখন পর্যন্ত একাডেমির ১০,০০০–এর বেশি ভোটার ইতোমধ্যেই তাদের ব্যালট জমা দিয়ে ফেলেছেন। সেগুলো হিসাব করেছে প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারস (পিডব্লিওসি) এবং আইনগতভাবে সিলমোহরও হয়ে গেছে।
যে বিতর্কটি পরে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে-যার মধ্যে ছিল বিভিন্ন রসিক ডিসকাউন্ট কোড (সিয়াটল অপেরা–এর “টিমোথি” প্রোমো কোড বিশেষভাবে আলোচিত) এবং ২০১৯ সালের পুরোনো মন্তব্য আবার সামনে আসা-এসবই এত দেরিতে ঘটেছে যে একটি ভোটও পরিবর্তন করার সুযোগ ছিল না।
তবে শ্যালামের ব্যাপারে একটি বিষয় স্পষ্ট: তিনি সত্যিই এই পুরস্কারটি জেতার জন্য মুখিয়ে ছিলেন।
পুরস্কারকৌশলবিদরা কয়েক সপ্তাহ ধরেই লক্ষ্য করছিলেন যে শ্যালামের প্রচারণা ছিল অত্যন্ত তীব্র। তিনি সর্বত্র উপস্থিত ছিলেন-প্রতিটি লালগালিচা অনুষ্ঠান, প্রতিটি টক শো, প্রতিটি সাক্ষাৎকারে। গত বছরের স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডস–এ একজন সম্পূর্ণ অজানা ছবির জন্য পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি “মহত্ত্বের অনুসন্ধান” নিয়ে কথা বলেন। তখন সেটি অনেকের কাছে আন্তরিক ও খোলামেলা মনে হলেও, দীর্ঘ কয়েক মাসের প্রচারণার পর সেটি অনেকের কাছে কিছুটা ক্লান্তিকর মনে হয়েছে।

টিমোথি শ্যালামের সিনেমাগুলো
অবশ্য তার ক্যারিয়ারের তালিকা সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে শ্যালামে এমন একটি চলচ্চিত্র তালিকা গড়ে তুলেছেন যা অনেকেই তুলনা করেন জেনিফার লরেন্স–এর ২০১০–এর দশকের শুরুতে করা কাজের সঙ্গে।
শ্যালামের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে: Call Me by Your Name, Lady Bird, Beautiful Boy, Little Women, Dune (প্রথম পর্ব), Dune: Part Two (দ্বিতীয় পর্ব), Don’t Look Up, Wonka, A Complete Unknown এবং Marty Supreme.
তিনি কাজ করেছেন -লুকা গুয়াদাগ্নিনো, গ্রেটা গারউইগ, দেনি ভিলনুভ, ওয়েস অ্যান্ডারসন, অ্যাডাম ম্যাককে এবং জশ সাফডির মতো বিশিষ্ট তারকাদের সঙ্গে। স্বাধীন নাটক থেকে বড় বাজেটের সায়েন্স ফিকশন, মিউজিক্যাল ও বায়োপিক-সব ক্ষেত্রেই তিনি তার অভিনয় বৈচিত্র্য প্রমাণ করেছেন।
তবে কেউ যখন ৩০ বছর বয়সে এসে ইতোমধ্যেই দুইবার অস্কার মনোনয়ন পেয়ে যায় এবং তৃতীয়বার ট্রফির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন এই দৃশ্যমান উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভোটারদের অনুপ্রাণিতও করতে পারে, আবার বিরক্তও করতে পারে। লরেন্স তার দ্বিতীয় মনোনয়নে ২২ বছর বয়সে অস্কার জিতেছিলেন, আর তখন শিল্পজগত তার তরুণ উদ্যমকে উদযাপন করেছিল।শ্যালামের একই উদ্যম নিয়ে এসেছেন আট বছর বেশি বয়সে কিন্তু সেই আকর্ষণ যেন কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে।
জর্ডানের কাছে টিমোথি শ্যালামের হারের শুরু
আসলে শ্যালামের অস্কারের পথে ফাটল ধরতে শুরু করেছিল অনেক আগেই। বাফটা অ্যাওয়ার্ডস–এ তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে যান রবার্ট আরামায়োর কাছে। এরপর আসে ১ মার্চের বড় ঘটনা- এক্টর অ্যাওয়ার্ডস-এ হঠাৎ করে জয়ের মাধ্যমে সামনে চলে আসেন মাইকেল বি. জর্ডান, যা ভোট শেষ হওয়ার চার দিন আগেই ঘটে।

জর্ডানের সিনার্স–এ অভিনয়-যেখানে তিনি যমজ দুই ভাইয়ের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছেন-পুরো পুরস্কার মৌসুম জুড়েই ছিল ব্যাপক আলোচনায়। ছবিটি মোট ১৬টি অস্কার মনোনয়ন পায়। ফলে জর্ডান শুধু নিজের অভিনয়ের জন্যই প্রচারণা চালাননি; তিনি এমন একটি ছবির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন যেটিকে একাডেমি বহু বিভাগেই স্বীকৃতি দিয়েছিল।
এক্টর অ্যাওয়ার্ডস–এ জর্ডানের আবেগঘন জয়-যেখানে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছে এবং ভোটারদের সামনে স্পষ্ট এক নতুন ফেভারিট তুলে ধরেছে তখনই। আগে যার নাম ছিল স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডস, সেই এক্টর অ্যাওয়ার্ডস–এ অংশগ্রহণকারী অভিনেতারাই একাডেমির সবচেয়ে বড় ভোটার গোষ্ঠী। একাডেমির ১০,০০০ সদস্যের মধ্যে প্রায় ১,৩০০ জনই অভিনেতা-তাই তাদের সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক।
শিকাগো সান-টাইমস–এর চলচ্চিত্র সমালোচক রিচার্ড রোপর, ভোট শেষ হওয়ার পর তার পূর্বাভাস প্রকাশ করে লিখেছিলেন—জর্ডানের অভিনেতা অ্যাওয়ার্ডস জয়টি ঠিক সঠিক সময়ে এসেছে। তার ভাষায়, “প্রায় ১০,০০০ ভোটারের অনেকেই শেষ এক–দুই দিনে ভোট দেন। প্রযোজক গিল্ড অ্যাওয়ার্ডস এবং এক্টর অ্যাওয়ার্ডস থেকে তৈরি হওয়া গতি ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।”
ভোটের জরিপ
এর প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক এবং পরিমাপযোগ্য। ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বাজার কালশি–তে শ্যালামের জয়ের সম্ভাবনা এক্টর অ্যাওয়ার্ডস এর পর ৬৮% থেকে নেমে ৫১%–এ চলে আসে। অন্যদিকে জর্ডান ১২% থেকে বেড়ে ৩৪%–এ পৌঁছে যান। ৬–৭ মার্চের সপ্তাহান্তে ব্যালেট বিতর্ক যখন শুরু হয়, তখন চ্যালামেটের সম্ভাবনা আরও কমে যায়-কিন্তু ততক্ষণে ভোট দেওয়া শেষ।
শেষ পর্যন্ত ১৫ মার্চ, ডলবি থিয়েটার–এ সেরা অভিনেতার খাম খুলেছিলেন অ্যাড্রিয়েন ব্রোডি। আর ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকরা দাঁড়িয়ে করতালি দেন-মাইকেল বি. জর্ডানের নামে।
এই জয় নির্ধারিত হয়েছে তার অসাধারণ অভিনয়, প্রচারণার কৌশল, শিল্প–রাজনীতি এবং ভোটারদের সেই মুহূর্তের অনুভূতির জটিল সমন্বয়ে।
মঞ্চে ওঠার আগে সহঅভিনেতা ও মায়ের সঙ্গে উদযাপন করতে দেখা যায় জর্ডানকে। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, “ঈশ্বর মহান। মা, কী খবর? তোমরা জানো আমি আমার মাকে কতটা ভালোবাসি।” তিনি উল্লেখ করেন তার বাবা ঘানা থেকে অনুষ্ঠানে এসেছেন, সঙ্গে ছিলেন তার ভাই ও বোন। পরিচালক রায়ান কুগলার–কে তিনি সহযোগী ও বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তার আগে অস্কারজয়ী কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতাদের-সিডনি পয়টিয়ার, ডেনজেল ওয়াশিংটন, হ্যালি বেরি, জেমি ফক্স এবং ফরেস্ট হুইটেকার—স্মরণ করেন।
সিনার্স ছবিতে স্মোক এবং স্ট্যাক নামে যমজ দুই ভাইয়ের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এটি ছিল জর্ডানের প্রথম অস্কার-এবং তার প্রথম মনোনয়নেই এই জয়। একই সঙ্গে এটি অস্কার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা, যেখানে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে কেউ সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতলেন।
সবশেষে বলা যায়, শ্যালামের অস্কার হারানোর পেছনে কাজ করেছে একাধিক কারণ: বাফটা–তে আরামায়োর জয়, এক্টর অ্যাওয়ার্ডস–এ জর্ডানের জয়, তার নিজের প্রচারণার তীব্রতা এবং আরেকটি বড় প্রশ্ন-লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর দিকে কিছু ভোট চলে যাওয়া।
শ্যালামে কি আসলেই হেরে গেছেন?

এখন একটি বড় প্রশ্ন সবার মনে জর্ডান অস্কার জিতলেও টিমোথি শ্যালামে কি আসলেই হেরে গেছেন? অনেকেই মনে করেন- না, তিনি হারেননি। কারণ জর্ডানের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতা কাঙ্ক্ষিত ছিলো। শ্যালামে হেরে গেছেন জর্ডানের অসম্ভব দারুণ অভিনয়ের কাছে শুধু। অনেকে তাঁর অস্কার নিয়ে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর উদাহরণ ও টেনে এনেছেন। লিওকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে অস্কারের জন্য। আল পাচিনো অস্কার পাওয়ার আগে ৭ বার মনোনীত হয়েছিলেন। এমনকি এবারের অস্কারে ‘ওয়েপনস’ সিনেমার জন্য পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন ৭৫ বছর বয়সী অভিনেত্রী অ্যামি ম্যাডিগান। তিনি তাঁর প্রথম অস্কার মনোনয়নের ৪০ বছর পর এবার ২০২৬ এ এসে এই পুরস্কার পান। টোয়াইস ইন লাইফটাইম–এর জন্য ১৯৮৬ সালে প্রথম মনোনয়ন পান তিনি। অতএব শ্যালামের হারানোর কিছু নেই। জর্ডান অস্কার জিতলেও টিমোথি শ্যালামে হেরে যায়নি। শ্যালামের জয়ের যাত্রা কেবল শুরু হয়েছে।


