বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় নায়ক বদলেছে, বদলেছে সময় ও দর্শকের রুচি। কিন্তু কিছু কণ্ঠ থেকে গেছে মানুষের হৃদয়ে। প্রেম, বিরহ, জীবনবোধ কিংবা মাটির টান সব অনুভূতিকে গানে ধারণ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল অ্যান্ড্রু কিশোর এর। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের গানে তাঁর কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল দর্শকের আবেগের অংশ। তাই তিনি শুধু একজন সংগীতশিল্পী নন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অধ্যায়।
আজ ৪ নভেম্বর, এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৫৫ সালের এই দিনে রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া অ্যান্ড্রু কিশোর ২০২০ সালের ৬ জুলাই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তবে তাঁর গাওয়া গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। মৃত্যুর পর ২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক পাওয়ার মধ্য দিয়ে সংগীতে তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি আরও একবার প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাজশাহী থেকে প্লেব্যাকের জগৎ
অ্যান্ড্রু কিশোর কুমার বাড়ৈ ছিলেন তাঁর পুরো নাম। বাবা ক্ষিতীশ চন্দ্র বাড়ৈ ও মা মিনু বাড়ৈর সন্তান তিনি। সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় ছোটবেলাতেই। মা ভারতীয় সংগীতশিল্পী কিশোর কুমারের ভক্ত ছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখেই ছেলের নাম রাখা হয় কিশোর।
রাজশাহীতে বেড়ে ওঠা অ্যান্ড্রু কিশোরের সংগীতশিক্ষার শুরু অল্প বয়সে। তিনি রাজশাহী বেতারের প্রধান সংগীত পরিচালক আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছে গান শেখেন। সংগীতের প্রতি গভীর আগ্রহ থাকলেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন সমানতালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে গান। ১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রের ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গান দিয়ে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন তিনি। সেই যাত্রা একসময় তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংগীতের শীর্ষে।
১৯৭৯ সালে ‘প্রতিজ্ঞা’ চলচ্চিত্রের ‘এক চোর যায় চলে’ গানটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ হয়ে ওঠে জনপ্রিয়তার বড় অংশ। নায়ক ও পর্দার চরিত্রের সঙ্গে কণ্ঠের আবেগ মিশিয়ে দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।
রোমান্টিক গান থেকে শুরু করে বিরহ, লোকজ সুর, জীবনমুখী গান কিংবা আধ্যাত্মিক আবহ বিভিন্ন ধরনের গানে স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বাইরেও হিন্দি ও উর্দু সিনেমায় গান গেয়েছেন। ভারতের প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মনের সুরেও কণ্ঠ দিয়েছেন। পাশাপাশি ‘মায়ের কান্না’ নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও নাটক নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
যে গানে মিশে আছে মানুষের জীবন
অ্যান্ড্রু কিশোরের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁর গান। চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে মিশে থাকা এসব গান অনেক সময় সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। চার দশকের বেশি সময়ের কর্মজীবনে তিনি ১৫ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়।
‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ গানে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও মানুষের অসহায়তার কথা উঠে এসেছে। ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’ বিরহ ও আত্মত্যাগের আবেগকে গভীরভাবে ধারণ করেছে। আবার ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’ গানটি জীবনের হিসাব, প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ গানে ছিল ভক্তি ও আত্মসমর্পণের সুর। ‘বেদের মেয়ে জোছনা আমায় কথা দিয়েছে’ হয়ে উঠেছিল বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত গান। অন্যদিকে ‘পড়ে না চোখের পলক’ ও ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’ প্রেমের গানে তাঁর কণ্ঠের কোমলতা ও আবেগকে তুলে ধরে।

‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন’ গানটি বাবা ও সন্তানের সম্পর্কের আবেগকে স্পর্শ করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতা এসব গানে খুঁজে পেয়েছেন নিজেদের গল্প। এ কারণেই অ্যান্ড্রু কিশোরের কণ্ঠ শুধু চলচ্চিত্রের দৃশ্যের সঙ্গে আটকে থাকেনি; তা জায়গা করে নিয়েছে মানুষের স্মৃতি, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত অনুভূতিতে।
তাঁর গায়কির বিশেষত্ব ছিল আবেগকে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা। গানের কথার সঙ্গে কণ্ঠের ওঠানামা, উচ্চারণ এবং সুরের প্রকাশ মিলিয়ে তিনি পর্দার চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেন। দর্শক অনেক সময় নায়কের মুখের চেয়ে গানের কণ্ঠের সঙ্গে বেশি আবেগের সম্পর্ক অনুভব করতেন। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘প্লেব্যাক সম্রাট’।
পুরস্কার, শেষ অধ্যায় ও অমর উত্তরাধিকার
সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অ্যান্ড্রু কিশোর আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর সম্মান পেয়েছেন। ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘সারেন্ডার’, ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘কবুল’, ‘আজ গায়ে হলুদ’, ‘সাজঘর’ ও ‘কি জাদু করিলা’ চলচ্চিত্রের জন্য পাওয়া পুরস্কারগুলো তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন। এ ছাড়া তিনি পাঁচবার বাচসাস পুরস্কার এবং দুবার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার লাভ করেন।
২০২৪ সালে মরণোত্তর একুশে পদক পান এই শিল্পী। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তাঁর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তবে তাঁর প্রাপ্তি শুধু পুরস্কারের তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়। অসংখ্য জনপ্রিয় গান, চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অবদান এবং শ্রোতাদের ভালোবাসাই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।

জীবনের শেষদিকে কঠিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়তে হয় তাঁকে। ২০১৯ সালে তাঁর নন-হজকিন লিম্ফোমা ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান তিনি এবং কয়েক মাস চিকিৎসা ও কেমোথেরাপি নেন। ২০২০ সালের জুনে রাজশাহীতে ফিরে আসেন। এরপর ৬ জুলাই, ৬৪ বছর বয়সে সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী ইশিতা বিশ্বাস এবং দুই সন্তানকে রেখে গেছেন এই শিল্পী। তাঁর চলে যাওয়ায় বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীতাঙ্গনে তৈরি হয় এক অপূরণীয় শূন্যতা। কিন্তু একজন শিল্পীর জীবন শেষ হলেও তাঁর সৃষ্টির জীবন থেমে থাকে না।
আজ জন্মদিনে অ্যান্ড্রু কিশোরকে ফিরে দেখার অর্থ শুধু তাঁর জনপ্রিয় গানগুলো মনে করা নয়; বরং বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কয়েক দশকের আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে নতুন করে অনুভব করা। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গান আজও নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছায়, পুরোনো শ্রোতাকে ফিরিয়ে নেয় ফেলে আসা দিনে।
সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ধরন বদলাবে, নতুন কণ্ঠ আসবে। তবু ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’ কিংবা ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’র মতো গান বাংলা গানের ভুবনে বেঁচে থাকবে। আর সেই গানের ভেতর দিয়েই অ্যান্ড্রু কিশোর বেঁচে থাকবেন শ্রোতাদের হৃদয়ে একজন শিল্পী হিসেবে, এক অনন্য কণ্ঠ হিসেবে, বাংলা চলচ্চিত্রের চিরস্মরণীয় ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ হিসেবে।









