বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নির্মাতা আছেন, যাঁদের কাজ শুধু গল্প বলে না, সময়ের ক্ষতও তুলে ধরে। দেশভাগ, উদ্বাস্তু মানুষের হাহাকার, শেকড় হারানোর যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকার লড়াই এসব বিষয়কে সিনেমার ভাষায় অসাধারণভাবে তুলে ধরেছিলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। জীবদ্দশায় তাঁর সিনেমা খুব বেশি দর্শক পায়নি। বাণিজ্যিক সাফল্যও ছিল সীমিত। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর কাজ নতুন করে আবিষ্কার করেছে উপমহাদেশসহ বিশ্বের চলচ্চিত্রাঙ্গন। আজ তিনি বাংলা তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঋত্বিক ঘটকের জন্মদিন। ১৯২৫ সালের এই দিনে ঢাকার জিন্দাবাহার লেনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২০২৫ সালে তাঁর জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি নাট্যকার, লেখক ও চলচ্চিত্রচিন্তক হিসেবেও তিনি রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। চলচ্চিত্রে অনন্য অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। আর তাঁর নির্মিত ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৭৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ গল্পের স্বীকৃতি পান।
ঢাকার শৈশব, দেশভাগের ক্ষত ও শিল্পী হয়ে ওঠা
ঋত্বিক ঘটকের বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক ও মা ইন্দুবালা দেবী। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর জন্মের সাত মিনিট পর পৃথিবীতে আসেন ছোট বোন প্রতীতি দেবী। তাঁদের পরিবারে সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও চিত্রকলার চর্চা ছিল নিয়মিত। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ঋত্বিকের।
কৈশোর থেকেই সাধারণ মানুষের কষ্ট তাঁকে ভাবাত। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় কিছু অভিজ্ঞতা তাঁকে মানসিকভাবে আঘাত করে। পরে তাঁকে ভারতের কানপুরের একটি কারিগরি স্কুলে ভর্তি করা হয়। শিল্পাঞ্চল কানপুরে শ্রমিকদের কঠিন জীবন কাছ থেকে দেখেন তিনি। শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শোষণ ও বঞ্চনা তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। অল্প বয়সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শ্রমিকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেন।
১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে যায়। এরপর দেশভাগ তাঁদের জীবনেও স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে আসে। নিজের জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা তাঁকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।
ঋত্বিকের কাছে দেশভাগ কেবল মানচিত্রের বিভাজন ছিল না। এটি ছিল মানুষের ঘর, পরিচয়, স্মৃতি ও শেকড় হারানোর গল্প। তাই তাঁর সিনেমায় উদ্বাস্তু মানুষের জীবন বারবার ফিরে এসেছে। তিনি শুধু তাদের দুঃখ দেখাননি, দেখিয়েছেন নতুন করে বাঁচার চেষ্টা, স্বপ্ন এবং প্রতিবাদের শক্তিও।
আট চলচ্চিত্রে বদলে দেওয়া সিনেমার ভাষা
৫০ বছরের জীবনে ঋত্বিক ঘটক আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সংখ্যায় কম হলেও প্রতিটি চলচ্চিত্র বাংলা সিনেমার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’। ১৯৫২ সালে নির্মিত হলেও এটি মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালে, তাঁর মৃত্যুর পর। এরপর ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় ‘অযান্ত্রিক’ ও ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’।



‘অযান্ত্রিক’ চলচ্চিত্রে একটি পুরোনো গাড়ি ও তার চালকের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অনন্য গল্প। সাধারণ একটি যন্ত্রকেও কীভাবে জীবন্ত চরিত্রে পরিণত করা যায়, তা দেখিয়েছিলেন ঋত্বিক। অন্যদিকে ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’তে এক কিশোরের চোখে কলকাতা শহরকে তুলে ধরেন তিনি।
১৯৬০ সালে মুক্তি পায় তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘মেঘে ঢাকা তারা’। দেশভাগের পর একটি উদ্বাস্তু পরিবারের বড় মেয়ে নীতার জীবনসংগ্রাম এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়। পরিবারের সবার দায়িত্ব নিতে গিয়ে নিজের স্বপ্ন ও ভালোবাসাকে বিসর্জন দেয় নীতা। তাঁর মুখের সেই বিখ্যাত সংলাপ, ‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই’, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।

এরপর ১৯৬১ সালে নির্মাণ করেন ‘কোমল গান্ধার’ এবং ১৯৬২ সালে ‘সুবর্ণরেখা’। এই তিনটি চলচ্চিত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’ , একসঙ্গে তাঁর দেশভাগভিত্তিক বিখ্যাত ট্রিলজি হিসেবে পরিচিত। এসব ছবিতে উদ্বাস্তু মানুষের জীবন, হারানো জন্মভূমির স্মৃতি এবং বিভক্ত সমাজের সংকট উঠে এসেছে।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে এসে নির্মাণ করেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই চলচ্চিত্রে তিতাস নদীকে ঘিরে বসবাসকারী মালো সম্প্রদায়ের জীবন, সংস্কৃতি, সুখ-দুঃখ ও সংগ্রাম তুলে ধরেন তিনি। এতে অভিনয় করেন প্রবীর মিত্র, রোজী সামাদ, কবরী, গোলাম মুস্তাফা ও আবুল হায়াত।

ছবিটি সম্পর্কে ঋত্বিক নিজেই বলেছিলেন, “তিতাস” পূর্ব বাংলার একটা খণ্ড জীবন, এটি একটি সৎ লেখা।’ তাঁর ভাষায়, এই গল্পে ছিল নাটকীয়তা, অসাধারণ ঘটনা ও মধুর সংগীত। পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনকে পর্দায় তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা থেকেই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন তিনি।
তাঁর পরিচালিত শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। এতে তিনি নিজেই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তিনি প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। পুনের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটেও শিক্ষকতা এবং অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঋত্বিকের সিনেমার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিজস্ব ভাষা। লোকসংগীত, শাস্ত্রীয় সংগীত, পুরাণ, মেলোড্রামা ও শক্তিশালী দৃশ্যের ব্যবহার দিয়ে তিনি প্রচলিত চলচ্চিত্র নির্মাণের ধরন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ক্যামেরা, লেন্স, শব্দ ও অভিনয়ের ব্যবহারে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদেরও প্রভাবিত করেছে।
জীবদ্দশায় অবহেলা, মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি
ঋত্বিক ঘটকের জীবনের একটি বড় বাস্তবতা ছিল তাঁর কাজের স্বীকৃতি না পাওয়া। জীবদ্দশায় তাঁর অধিকাংশ চলচ্চিত্র বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। বড় চলচ্চিত্র উৎসবেও তেমন আমন্ত্রণ পাননি। তবে তাঁর প্রতিভা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের দক্ষতা সমসাময়িক অনেক নির্মাতার কাছেই ছিল প্রশংসিত।
চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় এক লেখায় ঋত্বিককে বিরল প্রতিভার অধিকারী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর আবেগের গভীরতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে ভারতীয় সিনেমার বিরল সম্পদ বলেও অভিহিত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র গবেষক, নির্মাতা ও সমালোচকেরা তাঁর কাজ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেন।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ও সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের এক জরিপে বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্রের তালিকায় ছবিটি প্রথম স্থান অর্জন করে।
ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর প্রায় পাঁচ দশক পরও তাঁর চলচ্চিত্রের আবেদন কমেনি। বরং দেশভাগ, বাস্তুচ্যুতি, পরিচয় ও মানবিক সংকট নিয়ে তাঁর নির্মিত সিনেমাগুলো নতুন সময়েও প্রাসঙ্গিক।
জন্ম ঢাকায়, শেকড় পূর্ব বাংলায়, আর চলচ্চিত্রের বড় একটি অধ্যায় কলকাতায় ঋত্বিক ঘটকের জীবন যেন দুই বাংলার ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি নিজে একবার বলেছিলেন, ‘আমি মারা যাবার পর সবাই আমাকে বুঝবে।’ সময়ের দিকে তাকালে কথাটির সত্যতা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জন্মদিনে ঋত্বিক ঘটককে স্মরণ করা মানে কেবল একজন চলচ্চিত্রকারকে স্মরণ করা নয়; বরং তাঁর সিনেমায় ধারণ করা মানুষের হারানো ঘর, বেদনা, স্বপ্ন ও প্রতিবাদের ইতিহাসকে নতুন করে দেখা। জীবদ্দশায় যে স্বীকৃতি তাঁর প্রাপ্য ছিল, তা হয়তো পুরোপুরি পাননি। কিন্তু তাঁর আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রই প্রমাণ করে, একজন নির্মাতার সৃষ্টির শক্তি সময় ও সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে কত দূর যেতে পারে।









