Tuesday, November 3, 2026

জন্মদিনে ফিরে দেখা মৌসুমী – ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ থেকে ‘দেবদাস’, তিন দশকের পথচলা

ভারতীয় ছবির ছায়ায় বাংলাদেশি ৪ সিনেমা

November 2, 2026
রজনীকান্ত কেন সুপার স্টার ?

রজনীকান্ত কেন সুপার স্টার ? 

October 26, 2026

অমিতাভ বচ্চন – যে গল্প কখনো বলা হয়নি

October 16, 2026

আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা নায়িকা কে ?

October 12, 2026

সালমান শাহ কেন এত অল্প সময়ে কিংবদন্তি হয়ে গেলেন?

October 2, 2026

বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় নব্বইয়ের দশকে যে কয়েকজন অভিনেত্রী নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মৌসুমী। রোমান্টিক গল্প থেকে পারিবারিক, সামাজিক বাস্তবতা কিংবা চ্যালেঞ্জিং চরিত্র বিভিন্ন ধরনের অভিনয়ে দর্শকের মন জয় করেছেন তিনি। কখনো সালমান শাহর সঙ্গে রোমান্টিক জুটি, কখনো মান্নার বিপরীতে শক্তিশালী চরিত্র, আবার কখনো ‘দেবদাস’ এর চন্দ্রমুখী হয়ে নিজের অভিনয় ক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন।

‘প্রিয়দর্শিনী’ নামে পরিচিত এই অভিনেত্রীর পুরো নাম আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী। ১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেকের পর থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও পরিচালনাতেও রেখেছেন নিজের ছাপ। আজ ৩ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবন, চলচ্চিত্রে পথচলা এবং অর্জনের গল্প।

মডেলিং থেকে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ

১৯৭৩ সালের ৩ নভেম্বর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন মৌসুমী। বাবা নজমুজ্জামান মনি ও মা শামীম আক্তার জাহানের তিন মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই গান, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। পড়াশোনার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির জগতে নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

১৯৯০ সালে ‘আনন্দ বিচিত্রা ফটো সুন্দরী’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে বিনোদনজগতে তাঁর পরিচিতি বাড়ে। এরপর বিভিন্ন বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেন। ধীরে ধীরে টেলিভিশনের পর্দা থেকে চলচ্চিত্রে আসার সুযোগ তৈরি হয়।

১৯৯৩ সালে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় মৌসুমীর। এতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন প্রয়াত অভিনেতা সালমান শাহ। দুজনের প্রথম সিনেমাই দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। নতুন এই জুটি অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

এরপর ‘অন্তরে অন্তরে’ ও ‘দেনমোহর’ এর মতো সিনেমায় আবারও একসঙ্গে অভিনয় করেন তাঁরা। পর্দায় তাঁদের রসায়ন দর্শকের কাছে বিশেষ আবেদন তৈরি করে। সালমান শাহর সঙ্গে মৌসুমীর জুটিকে এখনো নব্বইয়ের দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় জুটি হিসেবে মনে করা হয়।

তবে মৌসুমীর সাফল্য কেবল একটি জুটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মান্না, ওমর সানী, রিয়াজ, ফেরদৌস আহমেদ ও ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো অভিনেতাদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালের ‘আম্মাজান’ সিনেমায় মান্নার বিপরীতে তাঁর অভিনয় দর্শকের প্রশংসা পায়। অন্যদিকে, ‘খায়রুন সুন্দরী’ সিনেমায় ফেরদৌসের সঙ্গে তাঁর অভিনয় গ্রামীণ দর্শকের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মোল্লা বাড়ির বউ’ সিনেমায় রিয়াজ ও শাবনূরের সঙ্গে অভিনয় করে আরেকটি ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে তুলে ধরেন মৌসুমী। বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি সামাজিক গল্পেও তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিল চোখে পড়ার মতো।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে আড়াই শতাধিক সিনেমায় কাজ করেছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে যেমন রয়েছে প্রেম ও আবেগ, তেমনি রয়েছে পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সমাজের নানা বাস্তবতা।

অভিনয়, পরিচালনা ও পুরস্কারে সমৃদ্ধ অর্জন

মৌসুমীর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ২০০১ সালের ‘মেঘলা আকাশ’। নার্গিস আক্তার পরিচালিত এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য প্রথমবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এরপর ২০১৩ সালে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘দেবদাস’ সিনেমায় চন্দ্রমুখী চরিত্রে অভিনয় করে দ্বিতীয়বার এই সম্মান অর্জন করেন। ২০১৪ সালে মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘তারকাঁটা’ সিনেমার জন্য তৃতীয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন তাঁর অভিনয়জীবনের বড় স্বীকৃতি। এ ছাড়া ‘গোলাপী এখন বিলাতে’, ‘প্রজাপতি’ ও ‘এক কাপ চা’ এর মতো সিনেমার জন্যও পেয়েছেন দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা। বিশেষ করে ‘মাতৃত্ব’, ‘একজন সঙ্গে ছিল’ এবং ‘খায়রুন সুন্দরী’ সিনেমায় ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন তিনি।

অভিনয়ের বাইরে নির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন মৌসুমী। ২০০৩ সালে ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালনায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ‘মেহের নিগার’ নির্মাণ করেন। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কপোতাক্ষ চলচ্চিত্র’ এর মাধ্যমে প্রযোজনার কাজেও যুক্ত হন। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনেও নিজের সৃজনশীলতা তুলে ধরেছেন এই অভিনেত্রী।

শুধু চলচ্চিত্র নয়, সামাজিক কাজেও রয়েছে তাঁর ভূমিকা। ২০১৩ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দায়িত্ব পান মৌসুমী। ২০২০ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বে থেকে শিশু অধিকার, শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, জন্মনিবন্ধন এবং শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেন। নারী ও শিশুদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেন মৌসুমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।

ব্যক্তিজীবনে ১৯৯৬ সালে অভিনেতা ওমর সানীকে বিয়ে করেন মৌসুমী। পর্দার পরিচয় থেকে শুরু হওয়া তাঁদের সম্পর্ক পরে বাস্তব জীবনেও গড়ায়। তাঁদের সংসারে রয়েছে দুই সন্তান ছেলে ফারদিন এহসান স্বাধীন ও মেয়ে ফাইজা। দীর্ঘদিনের এই দম্পতি ঢালিউডের পরিচিত তারকা দম্পতিদের একজন।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌসুমীর জীবনে এসেছে নতুন পরিবর্তন। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এরপর থেকে বেশির ভাগ সময় সেখানেই কাটছে তাঁর। গত ১৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার খবর জানান এই অভিনেত্রী। প্রায় তিন বছরের অপেক্ষার পর পাওয়া এই অনুমতি তাঁর যাতায়াতের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।

দেশের চলচ্চিত্র থেকে দূরে থাকলেও অভিনয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি মৌসুমী। ২০২৬ সালে মুক্তি পেয়েছে তাঁর অভিনীত ‘কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ’। পাশাপাশি নতুন কাজ নিয়েও আগ্রহ রয়েছে তাঁর।

নব্বইয়ের দশকে যে অভিনেত্রী সালমান শাহর সঙ্গে পর্দায় প্রেমের গল্প দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে তিনি নিজেকে নানা চরিত্রে প্রমাণ করেছেন। কখনো বাণিজ্যিক সিনেমার নায়িকা, কখনো শক্তিশালী গল্পের অভিনেত্রী, আবার কখনো নির্মাতা ও সমাজকর্মী, প্রতিটি পরিচয়েই রয়েছে তাঁর আলাদা অর্জন।

আজ জন্মদিনে মৌসুমীকে ঘিরে দর্শকের স্মৃতিতে ফিরে আসে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘আম্মাজান’ কিংবা ‘দেবদাস’ এর মতো সিনেমা। সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের ধরন বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মৌসুমীর নাম ও তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো এখনো বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে।

Share

Read more

Local News