সুরের মূর্ছনায় স্মরণ কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীন! কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকায় দুটি স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ছায়ানট ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পৃথক আয়োজনে তাঁর গাওয়া কালজয়ী গান পরিবেশনের পাশাপাশি বাংলা সংগীতে তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্টজনেরা।
ছায়ানট মিলনায়তনে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় শুরু হয় বিশেষ শ্রবণানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, আব্বাসউদ্দীন গ্রামীণ জনপদের সমৃদ্ধ লোকগান শহরের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর গাওয়া গান এখনো মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়।

তিনি আরও বলেন, কাজী নজরুল ইসলামকে ইসলামি গান রচনায় উৎসাহিত করেছিলেন আব্বাসউদ্দীন। সেই ধারাবাহিকতায় নজরুলের লেখা ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে গাওয়া ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’ গানটিও এখনো শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত।
শ্রবণানুষ্ঠানে বিভিন্ন শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের গাওয়া নানা ধারার গান পরিবেশন করেন। প্রিয়ন্তু দেব গেয়েছেন ‘এ কোন মধুর শরাব দিলে’ ও ‘বসিয়া নদীকূলে, এলোচুলে কে উদাসিনী। সুমন মজুমদারের কণ্ঠে শোনা যায় ‘খাতুনে-জান্নাত ফাতেমা জননী’ তোমার আকাশে উঠেছিল চাঁদ’ ও ‘সাধ জাগে মনে পরজীবনে।

শরীফা খাতুন পরিবেশন করেন ‘ফাঁদে পড়িয়া বগা’ এবং আবদুল করিমের ‘ও কি একবার আসিয়া’। বিমান চন্দ্র বিশ্বাস গেয়ে শোনান ‘আমায় এত রাতে ক্যানে ডাক দিলি’, ‘গুরুর পদে প্রেম ভক্তি হল না মন’ ও ‘আমার হাড় কালা করলাম রে’। আবুল কালাম আজাদের পরিবেশনায় ছিল ‘নদীর কূল নাই কিনার নাই রে’, ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘আবো নওদারিটা মরিয়া’।
চন্দনা মজুমদার গেয়েছেন জসীমউদ্দীনের ‘প্রাণ সখী রে’, ‘নদীর নাম সই অঞ্জনা’ ও ‘ওই না মাধবী বনেতে লুকাইছে’। কিরণচন্দ্র রায় পরিবেশন করেন ‘ও পরানের মাঝি’, ‘কোনবা রঙে বাইন্ধাছো ঘরখানি’ ও ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে’।
শিল্পকলা একাডেমিতেও স্মরণানুষ্ঠান
অন্যদিকে, সন্ধ্যা ছয়টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে আব্বাসউদ্দীনকে স্মরণ করে আরেকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সংগীতশিল্পী অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা হারুন-অর-রশিদ।
হারুন-অর-রশিদ বলেন, আব্বাসউদ্দীন সংগীতের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের অনুভূতিকে বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া গানকে জনপ্রিয় করে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানে রেজাউল করিম লিমন পরিবেশন করেন ‘প্রাণ সখীরে, ঐ শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে’ ও ‘পরের অধীনে কইরাছে আমায়’। রাহাত আরা গীতি পরিবেশন করেন নজরুলসংগীত। নশীন লায়লার কণ্ঠে শোনা যায় ‘সে যেন কী করলোরে আমায়’ ও ‘আমায় এত রাত কেন ডাক দিলি প্রাণ কোকিলারে’। সালাউদ্দিন আহমেদ গেয়ে শোনান ‘ভুলে যেও ভুলে যেও’ ও ‘কুঁচবরণ কন্যারে তোর মেঘবরণ কেশ’। নাশিদ কামালও পরিবেশন করেন ‘ও কি গাড়িয়াল ভাই’।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পীদের নিয়ে বহুদিনব্যাপী ভাওয়াইয়া উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাউল ও লালন উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি যাত্রা ও সার্কাসের মতো ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাশিল্প পুনরুজ্জীবিত করার কথাও জানান।
শেষ পর্বে আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমির শিল্পীরা সম্মিলিতভাবে পরিবেশন করেন ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ও ‘বাওকুমটা বাতাস যেমন ঘুরিয়া ঘুরিয়া মরে’। দুই আয়োজনেই গান আর আলোচনায় বারবার উঠে আসে তাঁর গানের বৈচিত্র্য, লোকজ ঐতিহ্য এবং বাংলা সংগীতে আব্বাসউদ্দীনের অনন্য অবদানের কথা।









