‘চলচ্চিত্রের উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত’, এই প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। তাঁর মন্তব্য, “সরকার ঘুমিয়ে থাকলেই সিনেমার উন্নতি হবে।” বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সংকট নিয়ে আলোচনায় দেওয়া এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারি সহায়তা, নীতিমালা ও নির্মাতাদের স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর রাজধানীর চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি) বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘আমাদের চলচ্চিত্রে সংকট, করণীয় ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনার। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, পরিবেশক, প্রদর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের দীর্ঘদিনের সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করাই ছিল এ আয়োজনের উদ্দেশ্য।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা হেলাল খান। উপস্থিত ছিলেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহীন কবির টুটুল, নির্মাতা কাজী হায়াৎ, ছটকু আহমেদ, শাহ আলম কিরণ, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, সালাহউদ্দিন লাভলু, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, হিমেল আশরাফ, শাহরিয়ার নাজিম জয়, প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল, আরশাদ আদনানসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকে।
কেন এই আলোচনা?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানসম্মত চিত্রনাট্যের অভাব, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, প্রেক্ষাগৃহের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং চলচ্চিত্রের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুধু ভালো সিনেমা নির্মাণ নয়, বরং প্রযোজনা থেকে শুরু করে প্রদর্শন ও বিপণন পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন সেমিনারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।
সেই প্রেক্ষাপটে সরকারি নীতিমালা, অনুদান, অবকাঠামো এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উঠে আসে। নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীও চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য উন্নয়ন, সরকারি অর্থায়নের কাঠামো এবং নির্মাণ অবকাঠামো আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
সরকারি অনুদান নিয়ে অমিতাভ রেজার প্রস্তাব
চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে নিজের প্রস্তাব তুলে ধরেন অমিতাভ রেজা। তাঁর মতে, অনুদানের অর্থ একবারে দেওয়ার পরিবর্তে চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।
প্রথম পর্যায়ে চিত্রনাট্য উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। এরপর প্রযোজনার জন্য অর্থায়ন এবং সবশেষে পোস্ট-প্রোডাকশনের জন্য তহবিল দেওয়ার কথা বলেন। এতে চিত্রনাট্যের মান উন্নয়ন এবং অর্থের পরিকল্পিত ব্যবহারে সহায়তা মিলতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) অবকাঠামো আধুনিকায়ন, ঢাকার বাইরে পাঁচটি বিভাগীয় শহরে স্টুডিও স্থাপন এবং চিত্রনাট্য উন্নয়নে স্ক্রিপ্ট ল্যাব গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেন এই নির্মাতা।
তাঁর এসব প্রস্তাব চলচ্চিত্রের বিকাশে সরকারি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। একই সঙ্গে সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া যেন নির্মাণের মান ও সৃজনশীলতার বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেয়।
সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন কেন?
‘সরকার ঘুমিয়ে থাকলেই সিনেমার উন্নতি হবে’ কথাটির তাৎপর্য বুঝতে চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্র একটি সৃজনশীল মাধ্যম। এখানে নির্মাতার গল্প বলার ধরন, বিষয় নির্বাচন ও শিল্পভাবনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে নীতিমালা প্রণয়ন বা অর্থায়নের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা শিল্পের বিকাশে সহায়তা করবে, কিন্তু সৃজনশীলতার পথে অপ্রয়োজনীয় বাধা তৈরি করবে না।
অমিতাভ রেজার বক্তব্যকে সেই বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা যায়। তবে তাঁর এই নির্দিষ্ট মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরকারি সহায়তার সব ধরনের বিরোধিতা করেছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। সেমিনারে তাঁর দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব বরং চলচ্চিত্রের উন্নয়নে সরকারি অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহায়তার কার্যকর ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরে।
চলচ্চিত্রের সংকট কাটাতে আরও যেসব প্রস্তাব
সেমিনারে অন্য বক্তারাও শিল্পটির উন্নয়নে বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন কবিরপুরে ফিল্ম সিটির জন্য বরাদ্দ থাকা জমি চলচ্চিত্রের কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রতিনিধিদল গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
নির্মাতা মতিন রহমান বলেন, চলচ্চিত্রশিল্পে সৃজনশীল পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। শুধু বড় বাজেটের সিনেমা নয়, স্বল্প ও মাঝারি বাজেটের চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগও তৈরি করতে হবে। তাঁর মতে, কেবল অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না; প্রযোজনা, পরিবেশনা ও প্রদর্শনসহ পুরো ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।
প্রযোজক আরশাদ আদনান চলচ্চিত্রে করপোরেট বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, বিনিয়োগ ও করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণে আরও আগ্রহী হতে পারে। পাশাপাশি প্রযোজক ও প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এবং আয়ের উৎস বাড়ানোর কথা বলেন। প্রযোজক ও প্রদর্শকদের মধ্যে আয় ভাগাভাগির ন্যায্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
অন্যদিকে, নির্মাতা ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় মনে করেন, একজন তারকার ওপর নির্ভর করে পুরো চলচ্চিত্রশিল্পকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। নতুন শিল্পী তৈরি, দর্শকের রুচি বোঝা এবং মানসম্মত সিনেমা নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু দেশীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরেন। আর চলচ্চিত্র সাংবাদিক সৈকত সালাউদ্দিন বক্স অফিসের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা
সেমিনারের আলোচনায় চলচ্চিত্রের প্রচার ও দর্শক তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। নির্মাতা কাজী হায়াৎ ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ সিনেমার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, ছবিটি মুক্তির পর প্রথম দিকে দর্শক সাড়া কম থাকলেও সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি সমালোচনা দর্শকের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল। পরে ছবিটি আবার মুক্তি দেওয়া হয়।
এ অভিজ্ঞতা থেকে চলচ্চিত্রের প্রচারে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। তবে গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকার জন্য চলচ্চিত্রের মান, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের গঠনমূলক যোগাযোগও জরুরি।
সামনে কী?
সেমিনারে উঠে আসা প্রস্তাবগুলো দেখায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সংকট কোনো একটি সমস্যায় সীমাবদ্ধ নয়। মানসম্মত চিত্রনাট্য, দক্ষ নির্মাতা ও শিল্পী তৈরি, স্বচ্ছ বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো, কার্যকর প্রদর্শনব্যবস্থা এবং নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ; সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। অমিতাভ রেজার মন্তব্য সেই আলোচনায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে, তাঁর নিজের প্রস্তাবগুলো সরকারি সহায়তাকে আরও কার্যকর করার বিষয়টিও তুলে ধরে। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য সরকার, নির্মাতা, প্রযোজক, প্রদর্শক ও গণমাধ্যমের মধ্যে সহযোগিতা কতটা কার্যকর হয়, তার ও









